Home মতামত অফলাইনে ঝরছে ঘাম, যাচ্ছে কষ্টের বেলা! অনলাইনের বাংলাদেশে পন্ডিতদের মেলা!!

অফলাইনে ঝরছে ঘাম, যাচ্ছে কষ্টের বেলা! অনলাইনের বাংলাদেশে পন্ডিতদের মেলা!!

38

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন:

মাঝেমাঝে ভাবি, নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে দেশটি স্বাধীন না হয়ে, নয় বছরে হলে কেমন হতো? একটা অদ্ভুত ভাবনা আমার, তাই না! তবে কার চোখে কেমন হতো জানি না। আমি নিশ্চিত, এটা হলে স্বাধীনতার সঠিক মূল্য বোঝা বাংলাদেশ প্রেমীদের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি হতো। প্রচন্ড সংখ্যক পাকীপ্রেমীরা সংখ্যায় সংখ্যালঘু থাকতো। সাথে ভারতপ্রেমীরাও। মজার ব্যাপার হলো, অনলাইনে ভারতপ্রেমীরা নেই বললেই চলে; আছে শুধু পাকীপ্রেমীরা। নামে বেনামে চৌদ্দগুষ্ঠি মিলেই আছে।
এরা সবাই বাংলাদেশের একই হকিকতে বিশ্বাসী একটি জনগোষ্ঠী। নামে বেনামে এরা যত দল উপদলে বিভক্ত থাকুক, একটি বিশেষ জায়গায় সবাই এক। মৃত্যু পরবর্তী বঙ্গবন্ধু আর জিয়ার অবস্থান নিয়ে এরা সবাই এক। এরা খুবই নিশ্চিত হয়ে বিশ্বাস করেছে, বঙ্গবন্ধু নিহত আর জিয়াউর রহমান শহীদ হয়েছেন। যদিও তাদের একজনও না ধর্মযুদ্ধে নিহত হয়েছেন, না মুক্তিযুদ্ধে। তাঁরা দু’জনেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতে যেয়েই নিহত হয়েছেন। তাহলে একই যাত্রায় দু’জনার মূল্যায়ন দুই ভাবে হয় কেমন করে?
সেনা অফিসারদের আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে সিনা উঁচু করে দাঁড়ানো বঙ্গবন্ধু বুকে গুলি খেয়েছেন। আর দরজা খুলে ঘাতক দেখে দৌঁড়ে পালাতে যেয়ে পিঠে গুলি খেয়েছিলেন জিয়া। তফাৎটা কেবল বুকে আর পিঠে গুলি খাওয়ার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বুকে গুলি খেয়ে নিহত রাষ্ট্রপতি আর জিয়া পিঠে গুলি খেয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি- এটা হয় কেমনে?
জাস্ট নোংরা রাজনীতি আছে বলেই এমনটা হয়। এই রাজনীতিটাই পাকীপ্রেমীরা দেদারছে করে। এই সব পাকীপ্রেমীদের পাত্তাই থাকতো না, যদি যুদ্ধে জয় পেতে নয় বছর লাগতো। পাত্তা থাকতো, না অনলাইনে; না অফ লাইনে। অনলাইনে দেশবিরোধী এই একটিভিস্টদের সংখ্যা সর্বসাকুল্যে কমবেশি ৩০ লাখ হবে। এরাই বেশি সংখ্যক পেজ চালায়। আবার এরাই ঘুরেফিরে সব পেজ এ কমেন্ট করে। একটিভ থাকে। তবে এমনভাবে একটিভ থাকে, দেখলে মনে হয় পুরো বাঙালীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারাই।
সংখ্যায় মোট জনসংখ্যার ২ শতাংশেরও কম ওরা। যা গোনার মধ্যেই পড়ে না। তবুও তারা ফাঁপর দেয়। ফাঁপর দেয়াই তাদের কাজ। আর তো কোন কাজ নেই। হোটেল, হোস্টেল সব তাদের জন্যে ফ্রি। ফ্রি থাকে, ফ্রি খায়। ফ্রি’র নানা ধরণ আছে দেশে। সেটা বাবার, কিংবা সিস্টেমের। এইসব সিস্টেমই ওদেরকে বসিয়ে বসিয়ে খাওয়ায়। নিশ্চিন্তে রাখে। তাই ভবিষ্যত নিয়ে কোন ভাবনা করতে হয় না তাদের।
সকল সময় নির্ভাবনায় খায় দায়, আর মোবাইল নিয়ে কুটুর কুটুর করে। সময়ে অসময়ে এখানে ওখানে ঘুরে বেড়ায়। আর সারাক্ষণ থাকে লাইভে থাকার মুডে। কঠিন এবং জটিল সেসব লাইভ। যখন তখন, যেখানে সেখানে অনলাইনে লাইভ। লাইভের জন্যে নিরিবিলি জায়গা বিশেষ করে খোলা ছাদ এদের খুব পছন্দ। খোলা একটা ছাদ পেলেই একহাতে মোবাইলটি নিয়ে প্যাঁচাল শুরু করে, সুপ্রিয় দর্শক মন্ডলী! আপনারা দেইখতিছেন নাইল্লা খেতের লগের বাড়ীর ছাদের উপর থাইক্যা “ছিল্লা ফালামু” টিভির নিয়মিত লাইভ অয়োজন ……..
ভাষা জ্ঞানের বালাই নেই; উচ্চারণে তো নেইই। আধা শুদ্ধ, আধা অশুদ্ধ উচ্চারণে বলা শুরু করে। অমনি শুরু হয় এদের ভিউয়ার্সদের আগমন। পাঁচটা মিনিটও লাগে না। এদের ভিউয়ার্স এরই মধ্যে পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজারে গড়ায়। ভিউয়ার্সরা কথাবার্তা খুব একটা শোনে বলেও মনে হয় না। শোনার আগেই কমেন্টস দেয়া শুরু করে। আর দেয় শেয়ার। তথাকথিত পন্ডিততুল্য উপস্থাপকের বারংবার অনুরোধের কারণেই শেয়ার দেয়।
এরা শেয়ার দিতে কাউকে কেয়ার করে না। কোন্ ধরনের কনটেন্ট শেয়ার দিচ্ছে; মিথ্যে নাকি গুজব, সত্য নাকি আজব; কোন কিছুই ভাবে না। শেয়ার দিতে হবে তাই দেয়। ওয়াজ নাকি আওয়াজ, ধাপ্পাবাজি নাকি চাপাবাজি; ভাবার সময় নেই। ধর্ম এবং রাজনীতির কনটেন্ট পেলে আর দেরী নেই। দেখার বিষয় শুধু একটি। সর্বসাকুল্যে এটি সরকার বিরোধী কি না। সরকার বিরোধী হলে আর কথা নেই। লাইক আর শেয়ার দিয়ে ভাইরাল করে ফেলে।
তবে এই লাইনের সত্যিকারের পন্ডিতদের দল এমন করে না। এরা শেয়ারও করে না, ভাইরালও করে না। এরা ভাইরাল হয়। এদেরকে ভাইরাল করার জন্যেই আছে তাদের স্বপক্ষীও পাকীপ্রেমী সেই একটিভিস্টদের দল। পন্ডিতদের দল এমন কিছু বলে এবং করে যেন নিজেরা ভাইরাল হয়। একটা লাইভ শেষ করতে পারে না। অমনি নেট দুনিয়া ছেঁয়ে যায় এদের ভিডিও তে। আর কেঁপে ওঠে সেই দুনিয়া। এভাবেই এদের দাপটে কাঁপে পুরো অনলাইন। কাঁপে দেশ; আমার আপনার সোনার বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতি পূর্ণ দেশ। এখানে প্রচুর মানুষ দিন আনে দিন খায়। করোনা ভাইরাসের শুরুতে পাকীরা প্রচন্ড রকমের লাফিয়েছে। বিশ্রীসব সমালোচনা দিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিল, বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষ না খেয়ে মারা যাবে। করোনা ও অনাহারে রাস্তায় লাশ পড়ে থাকবে। আল্লাহর অশেষ রহমত তেমন হয়নি। করোনার ১৪ মাসে একজন লোকও না খেয়ে মারা যায়নি।
মারা যাবে কেন? বাংলাদেশ কি এখন আর সেই তলাবিহীন ঝুড়ির দেশ আছে? বাংলাদেশ প্রচন্ডভাবে বদলেছে। ভারতকে কোভিড আর শ্রীলঙ্কাকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রদর্শনী শুরু করেছে বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কাকে ২০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ দিতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশ। এই সহায়তার ফলে কলম্বো তার পাহাড়সম ঋণ সংকট অনেকটাই উৎরে যেতে পারবে।
করোনা সঙ্কট মোকাবেলায় ভারতকে সহায়তা করা ৪০টি দেশের একটি বাংলাদেশ। অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানকেও আর্থিক সহায়তা করতে পারে বাংলাদেশ। ২০ বছর আগে এটা ভাবা অসম্ভব ছিলো, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের প্রায় দ্বিগুণ হবে। অর্ধশতাব্দী আগে, তুলনায় অনেক বেশি ধনী আর শক্তিশালী পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়েছিলো বাংলাদেশ। পাকিস্তানের মার্কিন বন্ধুরা বারবার বলেছেন, এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে। তলাহীন ঝুড়ির তকমা বহুদিন বাংলাদেশকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে।
সেই বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এক বছরে ৯ শতাংশ বেড়ে এখন ২ হাজার ২২৭ ডলার। আর পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৫৪৩ ডলার। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে ৭০ শতাংশ ধনী ছিলো আর আজ বাংলাদেশ ৪৫ শতাংশ বেশি ধনী। পাকিস্তানি অর্থনীতিবীদরাই বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ঢাকার কাছে আর্থিক সহায়তা নিতে পারে ইসলামাবাদ।
আইএমএফ ভবিষ্যতবাণী করেছিল, এ বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে ১১ ডলার বেশি হবে। এটা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে এখন ২৮০ ডলার বেশি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতসহ বাকীদের পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এখন সবচেয়ে এগিয়ে। তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আরো এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের এই এগিয়ে যাওয়া অনলাইনের এইসব তথাকথিত পন্ডিতদের চোখে পড়ে না। পড়লেও এড়িয়ে যায় অথবা চোখ বন্ধ করে রাখে। না এসব দেখতে তাদের ভাল লাগে, না প্রচার করতে। তাদের প্রচারের প্রধান বিষয় ধর্ম। তাদের মনগড়া ধর্ম। মিথ্যের বেসাতী মাখিয়ে তাদের একটাই প্রচার, গেল ধর্ম গেল রে! নিজেদের মোবাইলে পর্ণ নিয়ে ঘোরা এইসব পন্ডিতেরা ইউটিউব ফাটিয়ে ফেলে ধর্ম প্রেমে।
ধর্মের পাশাপাশি সরকারের কর্ম নিয়েও তাদের বিস্তর নজরদারী। কর্ম বলতে কুকর্ম। সরকারের সর্বোচ্চ মহলের কুকর্মের হদিছ না পেয়ে তারা সরকারি নিম্ন মহলের কুকর্মের সন্ধানে ব্যস্ত। কোনমতে একটা ধরা পড়লেই অনলাইনে ঝড় নামে; সত্য মিথ্যে মাখিয়ে ঝড়ের মিছিল। তবে মিছিলে মিথ্যের আশ্রয় এত বেশি নিয়ে ফেলে যে, কুকর্মের সত্যটুকুও তখন গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। মিথ্যের ঢোল বাজাবার কারণে জাতি সত্যটুকুকেও এক সময় মিথ্যে ভাবতে শুরু করে।
পাকীপ্রেমীদের কাজই হলো সত্য ঘটনার অবলম্বনে মিথ্যের প্রচার করে জাতিকে ফাঁকি দেয়া। পাক আমলে পাকীরা যত না ফাঁকি দিয়েছে, বাংলাদেশ আমলে পাকীপ্রেমীরা এর চেয়ে ঢের বেশি ফাঁকি দিচ্ছে। ফাঁকি দিচ্ছে পুরো জাতিকে। আর কাঁপিয়ে দিচ্ছে নেট দুনিয়া। কিন্তু এভাবে কি চলতে পারে! পারে না। সময় হয়েছে উল্টো ৭১ এর মত ওদেরকে কাঁপিয়ে দেয়ার। রাম কাঁপন। যেন কাঁপনে মুক্ত হয় পুরো বাংলাদেশ; বঙ্গবন্ধুর কাঙ্খিত স্বপ্নের বাংলাদেশ।