অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাং : বাড়ছে খুনাখুনি

ডেস্ক রিপোর্ট: অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাং দিনদিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিদিনই পাড়া-মহল্লায় গ্রুপে গ্রুপে সংঘাত-সংঘর্ষ লেগেই আছে। গ্রুপগুলোর মধ্যে অভ্যন্তরীণ বিরোধও কম নয়। এমনকি এদের হাতে মাদক ও অস্ত্রের ঝনঝনানিও কম নয়। চাঁদাবাজিতে বড়দেরও টপকে যাচ্ছে এরা। তবে সবকিছু ছাপিয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়-কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ভয়াবহ খুনাখুনির ঘটনাও ঘটছে।

গত দুইদিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও ভাটারায় গ্যাংয়ের আধিপত্যের বলি হয়েছে হোসেন ও শান্ত নামের দুই কিশোর। এর আগে ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে অনেকগুলো।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে বেশ কয়েকজন কিশোর অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এক্ষেত্রে প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ বেশি জরুরি। সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাই যথেষ্ট নয়, চূড়ান্ত দাওয়াই হচ্ছে অভিভাবকদের সচেতনতা।

খোদ পুলিশের হিসাবেই রাজধানীতে ৭৮টি গ্যাংয়ে প্রায় ২ হাজার সদস্য রয়েছে। এদের অর্ধশতাধিক শেল্টারদাতার তালিকাও করেছে পুলিশ। কিন্তু কাগজে-কলমের পরিসংখ্যান ছাড়া উল্লেখযোগ্য অ্যাকশন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এ সুযোগে বেপরোয়া গ্যাং শুধুই বিস্তৃত হচ্ছে। ছড়িয়ে পড়ছে পাড়া-মহল্লায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্যাং কালচার রুখতে হলে আইনি কঠোরতার পাশাপাশি পারিবারিক শিক্ষা এবং সন্তানের প্রতি তীক্ষ্ণ নজরদারি খুবই প্রয়োজন। এখানে ব্যর্থ হলে শুধু কিশোর নয়, এই কিশোররা বড় হয়ে কুখ্যাত সন্ত্রাসীর খাতায় নাম লেখাবে, এরা পরিণত হবে সমাজের বিষফোড়ায়।

এ ব্যাপারে পুলিশের সাবেক আইজি নূর মোহাম্মদ রোববার বলেন, ‘কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের বিকল্প নেই। পুলিশকে অবশ্যই পাড়া-মহল্লায় টহল বাড়াতে হবে। এলাকা ধরে ধরে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে নজরদারি বাড়াতে হবে। শুধু তালিকা করলেই চলবে না। তালিকা ধরে তাদের আইনের আওতায় এনে সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার থেকে সন্তানের প্রতি নজরদারি বাড়াতে হবে। স্কুলে শিক্ষকদের এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে। এভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারলে একসময় কিশোর গ্যাং সমাজের জন্য ভয়াবহ বিপদের বার্তা বয়ে আনবে।’ তিনি মনে করেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাড়া-মহল্লায় অ্যাকটিভ পুলিশিংয়ের বিকল্প নেই।

যোগাযোগ করা হলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত কমিশনার হাফিজ আক্তার বলেন, ‘সামাজিক অস্থিরতা এবং পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের প্রভাবে গ্যাং কালচারের উত্থান ঘটছে। আমাদের কাছে যে তালিকা আছে, এর চেয়েও পাড়া-মহল্লায় গ্যাংয়ের সংখ্যা আরও বেড়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ পুলিশ কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’ তিনি জানান, ‘কোন পাড়ায় কে কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত, সেই তালিকা পুলিশের কাছে রয়েছে। তাদেরকে নজরদারিতে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে কোনো অপরাধ সংঘটিত না করলে কাউকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘শুধু আইনের আওতায় আনলেই গ্যাংপ্রথা নিয়ন্ত্রণে আসবে না। একজনকে ধরে সংশোধনাগারে পাঠালাম, সে বেরিয়ে এসে আবার একই অপরাধে জড়াবে। তাই এ বিষয়ে বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে গ্যাংপ্রথা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, ‘মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই বেশি কিশোর গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে। অভিভাবকদের দুর্বল তত্ত্বাবধায়নের কারণে কিশোররা অপরাধের দিকে ঝুঁকছে। রাষ্ট্র কিংবা পুলিশ কেউই কোনো কিছু করতে পারবে না। কিশোর অপরাধ দমনের চূড়ান্ত দাওয়াই অভিভাবকদের সচেতনতা ও নজরদারি। প্রত্যেক মা-বাবাকে সন্তান সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে, কোথায় সময় কাটাচ্ছে-এসব বিষয়ে মা-বাবাকে খেয়াল রাখতে হবে। অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলেই তাকে কাউন্সেলিং করতে হবে। মা-বাবার তীক্ষ্ণ নজরদারি দরকার।’ তিনি বলেন, ‘দিনে একবার হলেও পরিবারের সবাই এক টেবিলে বসে খাবার খেতে হবে। এতে ভাবের আদান-প্রদান হয়। সন্তানদের চাহিদা সম্পর্কে জানার সুযোগ হয়।’ তার মতে, মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই বেশি গ্যাংয়ে জড়াচ্ছে।

জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা খুনখারাবি থেকে শুরু করে মাদক, ছিনতাইসহ অন্তত ৮ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করছে। এরা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে উদ্ভট ধরনের বিভিন্ন নামে গ্রুপ তৈরি করে সংঘবদ্ধ হচ্ছে। ২০১৬ সালে উত্তরার আদনান কবির হত্যার পর এই ‘গ্যাং কালচারের’ বিষয়টি সামনে এলেও দিনদিন এর ব্যাপ্তি বেড়েছে। ১৫-১৭ বছর বয়সি প্রতিটি গ্রুপে সদস্যসংখ্যা ১৫-১৭ জন। তবে ১৮-২৪ বছর বয়সি গ্রুপও রয়েছে। মোহাম্মদপুর ও রায়েরবাজার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা, ছিনতাইসহ নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছিল এলেক্স ইমন ও ডাইল্যা হৃদয় গ্রুপ। দুই গ্রুপের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মারামারি লেগেই ছিল। এদের গ্যাংয়ের সদস্যদের কেউ গাড়ির হেলপার কিংবা চালক, কেউ কোনো গ্যারেজের মিস্ত্রি কিংবা ছোটখাটো শ্রমজীবী।

পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মুজিব আহম্মদ পাটোয়ারি বলেন, ‘এ দুই কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ তৎপরতা শুরু করে। এলেক্স ইমনসহ চারজনকে গ্রেফতার করা হয়। এদিকে এক গ্রুপ অন্য গ্রুপকে সন্দেহের চোখে দেখত। এলেক্স ইমন গ্রুপের সদস্য হোসেন। ডাইল্যা হৃদয় গ্রুপের সন্দেহ ছিল হোসেন তাদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দিতে পারে। এ সন্দেহ থেকে শুক্রবার সকালে রায়েরবাজার এলাকায় তাকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করে ডাইল্যা হৃদয় গ্রুপের সদস্যরা। চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার ভোরে হোসেন মারা যায়। তিনি বলেন, মোহাম্মদপুর এলাকায় কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশ তৎপর রয়েছে।’

এদিকে ভাটারার নূরেরচালায় শনিবার রাতে ছুরিকাঘাতে নিহত শান্তর লাশের ময়নাতদন্ত রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সম্পন্ন হয়েছে। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শান্ত নিজেও একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। ঘটনার দুইদিন আগে ইমন নামের এক কিশোরের সঙ্গে তার বন্ধুদের ঝগড়া হয়। তারা ইমনকে মারধর করে। এ ঘটনার জেরেই ইমন ও তার লোকজন শনিবার রাতে নুরেরচালা মসজিদের সামনে শান্তকে পেয়ে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। এ ধরনের খুনাখুনির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।-যুগান্তর