অপেক্ষায় থাকলাম সেই দিনের!

78

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ বাংলা ভাষার অনেক শব্দের মাঝে খেতাবও একটি শব্দ। মানুষের কর্মের উপর বিবেচনা করে বিশেষ নামে আখ্যায়িত করাকেই উপাধি বা খেতাব বলে। প্রাচীনকাল থেকেই খেতাবের প্রচলন শুরু হয়েছে মানব সমাজে। বাংলা নববর্ষে পাড়ায় পাড়ায় খেতাব দেবার প্রচলন ছিল এই তো কিছুদিন আগেও বাঙালী সমাজে। সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকতো কার ভাগ্যে কী জোটে। তবে খেতাব দেবার কর্মটি হতো অতি গোপনে। প্রচন্ড মেধা খাটিয়ে কারা এসব করতো তা মোটামুটি সাধারণ্যে অপ্রকাশিতই থাকতো। আনন্দ করার অংশ হিসেবেই এসব করা হতো তখন। এখন ওসব আর নেই বললেই চলে।
তবে আনুষ্ঠানিকভাবে না হলেও স্বভাবজাত কারনেই বাঙালী নিজেদের অজান্তেই কাউকে খেতাব বা উপাধি দেবার প্রক্রিয়া থেকে সরে আসতে পারেনি। এখনও অহরহই খেতাব দেয়াটা চলছেই। তবে এসবই হয় অনানুষ্ঠানিকভাবে। প্রথমে দু’একজনের মুখের দুষ্টামিতে খেতাবটি বের হয়। এরপর আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পরে সর্বত্র। সমাজের কাউকে সহজেই চেনার সুবিধার্থে হাটে-মাঠে কিংবা ঘাটে, নামের আগে বা পরে, খেতাব দিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত রকমের অদ্ভুত সে সব খেতাব।
যেমন গালকাটা কামাল। অথচ তার নাম ছিল কামাল আহমেদ। বিশেষ এই সন্ত্রাসীর ফাঁসি হয়েছিল এরশাদ জমানায়। ছোটবেলায় একজনকে চিনতাম ঘাড়বেকা কামাল হিসেবে। দারুন ফুটবল খেলতো। তার পায়ে বল আসা মানেই গোলের সম্ভাবনা। সাংঘাতিক জনপ্রিয় ছিল। বল পায়ে আসলেই ঘাড়টি বাঁকিয়ে বাঁকিয়ে দৌঁড়াতো বলে নাম হয়েছিল ঘাড়বেকা কামাল। সন্ত্রাসী মুরগী মিলনের নাম সবাই জানে। একজনের নাম প্রবাসী করিম রেখেছে, একই পাড়ায় আরো একজন করিম আছে বলে। ছোটবেলায় আমার জুনিয়র একজনকে সবাই ডাকতো খাটো শাহীন। ও আমার চেয়ে সাইজে খাটো ছিল বলেই এমনি উপাধি জুটেছিল ওর নামের সাথে। এসবই মানুষকে চেনার সুবিধার্থে। সত্যি বলতে এসব উপাধি ঐ মানুষটির সাথে মানিয়ে যায় এবং আস্তে আস্তে সমাজ ওটা গ্রহনও করে। সবচেয়ে অবাক লাগে, যাকে খেতাব দেয়া হয় সে নিজেও এটা মেনে নেয়।
ভারত উপমহাদেশে খেতাব দেয়াটা চালু করে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী। মানুষে মানুষে শ্রেণীবৈষম্য তৈরী করে নিজেদের ফায়দা লোটার তাগিদে তারা এই অপকর্মটি চালু করে। খেতাব দিয়ে ইংরেজপ্রেমী সমাজপতিদের নিজেদের তল্পীবাহক করে তথাকথিত জাতে তোলার কাজটি করতো। ইংরেজরা টার্গেট করতো রাজা বা জমিদারদের। রায় বাহাদুর বা চৌধুরী জাতীয় খেতাব তারা দিয়ে গেছে অপশাসনের শেষদিন পর্যন্ত। পাশাপাশি নায়েব, তালুকদার, সিকদার, সরদার কিংবা সরকার খেতাব ছিল সাধারণের জন্যে।আমরা বুঝে হোক কিংবা না বুঝে হোক আজো নামের সাথে সে সব খেতাব ধারন করে রেখেছি তথাকথিত বংশ বা গোত্র নামের আড়ালে।
তবে এর বাইরে মানুষের মন থেকে খেতাব পেয়ে চির স্মরণীয় হয়ে আছেন এমন অনেক বিশ্ববরেন্য ব্যক্তিত্বও আছেন। নেতাজী খেতাব পেয়েছিলেন সুভাষ বসু; মহাত্মা খেতাব গান্ধীজির নামের সাথে মিশে থাকবে আজীবন। তুরস্কের কামাল পাশা আজো আতাতুর্ক বা তুর্কীবীর নামেই পরিচিত। রবি ঠাকুরের নামের আগে কবিগুরু, নজরুলের আগে বিদ্রোহী কবি খেতাবটি প্রতিদিন ব্যবহার হচ্ছে। এসব খেতাবের আড়ালে তাদের আসল নামটি হারিয়ে যেতে বসেছে।
ব্যক্তিত্ব আর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে একজন রাজনীতিবিদ খেতাব পেয়েছিলেন। আজো তার খেতাব দিয়েই মানুষ তাকে চেনে শেরে বাংলা বলে। শের এ বাংলা মানে বাংলার বাঘ। এ কে এম ফজলুল হক নামের চেয়ে শেরে বাংলা নামটি অনেক বেশী সমাদৃত বাংলার মানুষের কাছে। নতুন প্রজন্ম হয়ত তাঁর আসল নামটি জানেও না। তেমনি জানে না আবদুল হামিদ খানকে। তাকে জানে মজলুম জননেতা ভাষানী নামেই। এব্যাপারে মহান নেতা জাতির পিতার নাম সর্বাগ্রে। তাকে বিশ্ববাসীও চেনে বঙ্গবন্ধু নামে। এই খেতাবের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে তার আসল নাম শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গ শব্দটি দিয়ে একটা যুক্ত শব্দের খেতাব নামের সাথে ধারন করতে পারাটা একটা দূর্লভ এবং বিশাল সম্মানের ব্যাপার।
জিয়াউর রহমানের নামের সাথে কোন খেতাব নেই। রাজনৈতিক পরিচয়বিহীন কেউ উর্দি ছেড়ে হঠাৎ করে ক্ষমতায় এলে তাঁদের খেতাব মেলে না। তবে
তিনি আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে জনপ্রিয়তার কারনে হয়ত পেয়ে যেতেন। তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া দেশনেত্রী হিসাবে পপুলার এবং জননেত্রী বললে আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই বুঝি। তবে এক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম এরশাদ; হঠাৎ করে ক্ষমতায় আসা এই মানুষটিকে সবে জানতে শুরু করলো জনতা। আস্তে আস্তে তাঁর চারপাশে রাজনৈতিকফেউ জুটতে শুরু করলো। তারাই একবার তাঁকে একখানা খেতাব দিয়ে দিল। বঙ্গবন্ধুর সাথে মিলিয়ে তাঁকে পল্লীবন্ধু খেতাব দিল। বিটিভি তখন পল্লীবন্ধু শব্দটি প্রচারে মরিয়া। কিন্তু শত চেষ্টা করেও পাবলিককে খাওয়াতে পারল না।
ইদানীং ফল উল্টো হয়েছে। খেতাবটি নিয়ে মিডিয়া মাঝে মাঝে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করে। গেল নির্বাচনে বার বার পল্টি খাবার কারনে মিডিয়া তার খেতাব পাল্টে দেয়। পল্লীবন্ধু থেকে পল্টিবন্ধু খেতাব পান তিনি। তাঁর বলা কথার উপর কারো কোন আস্থা নেই। সকালে যা বলেন, বিকেলে তা পাল্টে ফেলেন। একটি বিশেষ বদ অভ্যাস রাজনীতিতে তাঁকে সবচেয়ে হাল্কা করে দিয়েছে। এছাড়া খেতাব থেকে ফেউ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত পাওয়ারাও বাদ যাননি। এদের মধ্যে অন্যতম বেশী কথা বলে বেহুদা নাজমুল, চিনি চুরির মামলায় চিনি জাফর, সরকারী দূত ব্যরিস্টার মওদুদ। বর্তমানে বাড়ী নিয়ে মামলা খেয়ে বড়ই অস্থির তিনি। তার সবচেয়ে বড় বদ অভ্যাস হলো রাতের আধারে দল পাল্টানো। বলা যায় না কবে হঠাৎ এবার ভোল পাল্টান।
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের সিদ্দিকী; তার অনেক খেতাব। একদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা, অন্যদিকে তিনি বঙ্গবীর। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত। আবার তিনি রাজনীতিবিদ এবং ঝানু ব্যবসায়ীও বটে। মোটকথা সব খেতাবই তার আছে। এত খেতাবের ভার বহন করা তো আর এত সহজ নয়। তাই খেতাব সমূহ এখন একটু এদিক সেদিক হচ্ছে। সোনার বাংলা কনস্ট্রাকশন নামে তার একটি বানিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আছে। মিডিয়ায় এসেছে,তিনি অনেকগুলো সরকারী ব্রীজের কাজ নিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক ব্রীজই পুরোপুরি শেষ না করেও টাকা উত্তোলন করেছেন। এসব পত্রিকার কথা। সে সব কারণে তাকে এখন বীরউত্তম না বলে বিরোধীপক্ষ টিপ্পনী কেটে ব্রীজউত্তমও বলে। অবশ্য এসবে কান দেবার তাঁর সময় নেই। তিনি ব্যস্ত রাজনীতির সবক নিয়ে। পত্রিকার কলামে, মাঠের বয়ানে নিয়মিত তিনি জাতি এবং সরকারকে নীতিকথা সবক দিয়ে যাচ্ছেন। কেবল দেন না অসম্পূর্ণ ব্রীজগুলোর ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা।
সময়সাময়িক কালের খেতাবধারীগন খেতাবের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে খুব একটা সচেতন বলে মনে হয় না। এসব দেখে আমার লজ্জা হয়; খুব লজ্জা হয়। তবে একদিন আমারও লজ্জাবোধ ছিল না। ভার্সিটিতে পড়ার সময়কার কথা; টগবগে যুবক আমি। ঢাকার শহর তখন এতটা উন্নত ছিল না। কোন একদিন চলার পথে ঢাকার গাবতলীতে ব্যস্ত রাস্তার ধারেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। এমনি এমনি তো আর কেউ রাস্তার ধারে দাঁড়ায় না! প্রকৃতি বেটাইমে ডাকলে তার ডাকে সাড়া দিতে দাঁড়াতেই হয়। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি আর নিজেকে কিছুটা আড়াল করে কর্মটি সেরে নিচ্ছি।
কর্মটি সারছিলাম বালির স্তুপের উপর। শরীর নির্গত দূষিত জল পড়ার কারণে ক্রমান্বয়ে বালি সরে সরে পরিস্কার হচ্ছিল। এক পর্যায়ে হঠাৎ চোখ গেল; বালি সরে একটা ছোট সাইনবোর্ড বেরিয়ে এলো। ওখানে লেখা, এখানে প্রস্রাব করিবেন না; করিলে ১০০ বার কান ধরে উঠবস করানো হবে। আমার তো আক্কেলগুরুম অবস্থা। তাড়াহুড়া করে কাজ শেষ না করেই পালাবার পথ খুঁজছি। এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। অকস্মাৎ কেউ একজন পেছন থেকে জামার কলারে ধরে পাশের অফিস ঘরে নিয়ে গেল!
আমি পালাতে পারিনি সেদিন; বাধ্য হয়েছিলাম বদ অভ্যাস ত্যাগে। কিন্তু আমাদের দেশের তথাকথিত দায়িত্বশীল মানুষগন তাদের বদ অভ্যাস কবে ত্যাগ করবেন তা আমরা কেউই জানিনা। আমাদের রাষ্ট্র তথা সমাজে ভন্ডামি করার জায়গা নেই; গেম খেলার সুযোগ নেই। কিন্তু বেশরমের মত বেরসিক কিছু কিছু মানুষ খেলেই চলেছেন। তারা পারছেন, কারণ তাদের নামের আগে খেতাব আছে। তাদের ধরার কেউ নেই; তাদের পালাবার দরকার হয় না। আমরা অপেক্ষায় থাকলাম সেই দিনের- যেদিন তারা পালাবারও পথ পাবেন না!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা