অপরাধে জড়াচ্ছে রোহিঙ্গারা স্থানীয়রা চিন্তিত

39

যুগবার্তা ডেস্ক: কক্সবাজার থেকে উখিয়া আসতে হাতের বাঁ দিকে কুতুপালংয়ের অনিবন্ধিত শরণার্থী শিবির। প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে এখানে। সবাই ঘুপচি ঘরে থাকে। দিনের বেলায়ও আলো ঢোকে না। বাংলাদেশে এসে অপহরণের শিকার হয়ে এই শিবিরেই আটকে ছিলেন দুই রোহিঙ্গা তরুণ কামাল হোসেন ও সাবের আলম।
৫ জুন বালুখালি পানবাজার এলাকায় কথা হচ্ছিল তাঁদের সঙ্গে। মাস পাঁচেক আগে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে এসেছেন। কামালের বাড়ি ছিল রাখাইনের মংডু থানার বলিরবাজার এলাকায়। গত ২৬ মে কামাল হোসেন কুতুপালং থেকে বালুখালিতে আসছিলেন। চারজন লোক তাঁকে থামতে ইশারা করলে তিনি দাঁড়িয়ে যান। পরে তারা কামালকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। পরদিন সকালে তিনি নিজেকে কুতুপালং ক্যাম্পের একটি ঝুপড়ি ঘরে আবিষ্কার করেন। কামাল হোসেন কথা বলতে বলতেই গায়ের জামা খুলে ফেলেন। পিঠে, হাতের কবজিতে, হাতের ওপরের অংশে, পায়ে গভীর ক্ষত। তিনি বলেন, ওরা গলায় ছুরি ধরে বাড়িতে ফোন করাত। ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন। ওই ঘটনায় উখিয়া থানায় এজাহার করেছিলেন কামালের বড় ভাই।
সাবের আলমকেও ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হয়েছে। তিনি বাংলাদেশে এসেছেন মিয়ানারের রাখাইন রাজ্যের ঢেঁকিবুনিয়া থেকে। অপহরণকারীদের চিনতে পেরেছিলেন কি না, জানতে চাইলে সাবের আলম বলেন, তাঁরা রোহিঙ্গা। গায়ে ‘চিতারা-বিতারা’ পোশাক, পায়ে বুট জুতা ছিল।
অপহরণের এই ঘটনা টেকনাফ ও উখিয়ার বাঙালি ও রোহিঙ্গা শরণার্থী দুই পক্ষকেই আতঙ্কিত করেছে। অনেকের কাছেই অনিবন্ধিত শরণার্থী শিবিরগুলো এখন অনিরাপদ। রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অস্বস্তির কারণ। এখন পর্যন্ত নিবন্ধিত শিবির বলতে টেকনাফের নোয়াপাড়া ও কুতুপালং। অন্যগুলোয় সে অর্থে পুলিশি নজরদারি নেই।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান সংযুক্তা সাহানি বলেন, অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোয় সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশের ক্ষেত্রে সরকার সম্প্রতি কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কিছুদিন আগে দুজন বিদেশি নাগরিক কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে শরণার্থী শিবিরে অর্থ সাহায্য দিতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হন। পরে পুলিশি সহযোগিতায় তাঁদের উদ্ধার করা হয়।
ক্যাম্পগুলোয় যেকোনো সময় খারাপ কিছু ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কা বিভিন্ন মহলের। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনেও এ কথা বলা হয়েছে।
এ নিয়ে কথা হচ্ছিল লেদা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি দুদু মিয়ার সঙ্গে। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বুচিদং থানার কিংটন পাড়া থেকে ২০০৩ সালে এসেছেন। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক পাস করে চট্টগ্রামে পল্লিচিকিৎসকের কোর্স করেছেন। ক্যাম্পে সবাই ‘ডাক্তার সাহেব’ বলে জানে। এই প্রতিবেদকের সামনেই এক তরুণকে শুইয়ে টিটেনাস ইনজেকশন দিচ্ছেলেন। গোটা বিশেক রোহিঙ্গা তরুণ সেই দৃশ্য দেখার জন্য তখন ডিসপেনসারিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। সবারই গায়ে জামা আছে, কারও কারও চুল কায়দা করে কাটা।
দুদু মিয়া বলেন, ‘এই যে এত মানুষ দেখছেন, কেউ কোনো লেখাপড়া বা হাতের কাজ জানে না। এরা শুধু জানে ইয়াবা খাওয়া, ইয়াবা বেচা, জুয়া খেলা, মারামারি। এরা জন্মের পর থেকে শুধু দা দেখছে, কিরিচ দেখছে।’ তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে। কিন্তু রোহিঙ্গারা লেখাপড়া বা আয়রোজগার করতে পারে, এমন কোনো উদ্যোগ কেউ নিচ্ছে না।
কক্সবাজার, উখিয়া, টেকনাফে বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তাঁরা শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত নন। তাঁদের ক্ষোভ আছে আরও নানা বিষয়ে। এখন পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় রোহিঙ্গা শরণার্থীর সংখ্যা কত, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কিছু জানা যাচ্ছে না। ধারণা করা হয়, এই সংখ্যা ৫ থেকে ৬ লাখ। কক্সবাজারের বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ২৬ লাখ। প্রায় ৫ ভাগের ১ ভাগ শরণার্থী নিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিবেদন বলছে, আগে টেকনাফের নোয়াপাড়া ও উখিয়ার কুতুপালংয়ে শরণার্থী শিবির থাকলেও এখন কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, চকরিয়া, মহেশখালী, রামু, উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালি, টেকনাফের লেদা ও পেকুয়া; অর্থাৎ সব কটি উপজেলায় রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়েছে। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ৩০ হাজারের ওপর রোহিঙ্গা রয়েছে। কক্সবাজার ও বান্দরবানে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৬০৯ জন রোহিঙ্গা আছে।
টেকনাফের লেদা, উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালিতে কমপক্ষে ৫০টি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবারে সন্তানসংখ্যা ৫ থেকে ১০।
দুদু মিয়ার সঙ্গে যখন তাঁর ওষুধের দোকানের সামনে বসে কথা হচ্ছিল, তখন কয়েকজন বয়স্ক লোকও ছিলেন। রোহিঙ্গা পরিবারগুলোয় সদস্যসংখ্যা এত বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, নিজেই ১০ সন্তানের জনক। তাঁর যুক্তি হলো, রাখাইন রাজ্যে কয়েক বছর পরপর রোহিঙ্গা নিধন করা হয়, সে জন্য অনেকে বেশি সন্তান নেন। তা ছাড়া সন্তানই শক্তি। এ প্রসঙ্গে আলোচনার সময় আশপাশের লোকজন বিরক্ত হচ্ছিলেন।
উখিয়া বাজারে কথা হচ্ছিল আইনজীবী জহির আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, বাঙালিদের এখন রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কাজ পেতে হচ্ছে। যেখানে একজন বাঙালি লবণচাষি দিনে ৬০০ টাকা মজুরি পেতেন, এখন সেই কাজ একজন রোহিঙ্গা শ্রমিক ১৫০ টাকায় করছেন।
স্থানীয় যুবদল নেতা ও ব্যবসায়ী আহসানউল্লাহ বলেন, রোহিঙ্গাদের মধ্যে দরিদ্র যাঁরা, তাঁরা দরিদ্র বাঙালিদের কাজ কেড়ে নিচ্ছেন। যাঁরা একটু অবস্থাপন্ন, তাঁরা ক্যাম্পের বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকছেন। ছেলেমেয়েদের ভালো স্কুলে পড়াচ্ছেন। বাংলাদেশিদের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছেন।
স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সম্প্রতি বালুখালির কাশেমিয়া উচ্চবিদ্যালয়ের অভিভাবকেরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কাছে অভিযোগ করেছেন যে অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটার তালিকায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নাম ছিল। ভোটার তালিকায়ও রোহিঙ্গারা ঢুকে পড়ছেন। কেউবা পাসপোর্ট নিচ্ছেন।
কোথাও কোথাও রোহিঙ্গা শরণার্থী ও বাঙালিরা বিরোধে জড়াচ্ছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় মাস চারেক আগে বন পাহারা দিচ্ছিলেন খায়রুল বশর। বনটি বালুখালি পানবাজারের কাছে। কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থীকে গাছ কেটে নিয়ে যেতে দেখে বাধা দেন তিনি। তারা খায়রুল বশরকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রেখে চলে যায়। তাঁর একটি হাত এখন অকেজো। খায়রুল বলেন, চিকিৎসার পর উঠে দাঁড়াতে পারলেও কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
অনিবন্ধিত শিবিরগুলোয় শরণার্থীরা যেমন সমস্যায় পড়েছে, তেমনি আশপাশের মানুষও সমস্যায় আছে বলে জানান স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুরুল আবছার। বললেন, পুরো এলাকায়ই এখন অরাজকতা।
জানতে চাইলে কক্সবাজার জেলার জেলা প্রশাসক আলী হোসেন বলেন, যত দিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের বিষয়টা চূড়ান্ত না হচ্ছে, এ ধরনের কিছু সমস্যা থাকবে। তা ছাড়া রোহিঙ্গা শরণার্থীদের চিহ্নিত করা গেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো কাজটি করছে। আশা করা যায়, খুব দ্রুত জরিপ শেষ হবে।-প্রথম আলো