অনুভবে আছো বাবা অনুভূতির মাঝে!

152

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীন: বহুল ব্যবহৃত Family শব্দটি নিয়ে কেউ কি কোনদিন ভেবেছেন? অবশ্য ভাবার কথাও না। কেননা আমরা সবাই এর অর্থ জানি। খুব সোজা অর্থ; পরিবার। সবার এই সহজ জানাকে একপাশে রেখে চলুন এবার একটু অন্যভাবে ভাবি। লক্ষ্য করুন, শব্দটির শুরুতেই FAM আছে। তাই না? ধরে নিলাম এর মানে Father and Mother, এবং শেষে আছে ILY; এর মানে যদি করি I Love You তাহলে কেমন হয়? আসল অর্থ যেমনই হোক, এমনি বিশ্লেষনে বলাই যায় Family শব্দটির শুরুতে আছে বাবা-মা আর শেষ হয়েছে তাদের ভালবেসে।

অথচ বাস্তব জীবনে ঘটে এর ঠিক উল্টো। বাস্তবে Family বিষয়টি বাবা-মা দিয়ে শুরু হলেও সাধারণত তাঁরা ভালবাসা পান না; উল্টো সারা জীবন তাঁরা সন্তানদেরকে ভালবেসেই যান। এটাই যেন বাবা-মার কঠিন নিয়তি। এই বাবা-মা একজন মানুষের জীবনে প্রচন্ড রকমের গুরুত্বপূর্ণ বলেই পরিবার প্রথাটি সমাজে স্বীকৃতি পেয়েছে। দুঃখজনক হলো, সমাজ স্বীকৃতি দিলেও সন্তানরা স্বীকৃতি দিতে কুন্ঠাবোধ করে। বোধ করে স্ত্রী সন্তান নিয়ে আনন্দময় জীবনের বাড়তি ঝামেলা হিসেবে; সংসারের অতিরিক্ত বোঝা হিসেবে।

কিন্তু বাবা-মা তা কখনোই বোধ করে না। বরং তাঁরা তাঁদের জীবনের সব আনন্দ আর সুখ বিলিয়ে দেয় সন্তানের সুখের জন্যে। এক্ষেত্রে মা তো আছেনই। তবে বাবার ত্যাগী ভূমিকা বিশেষভাবে প্রনিধানযোগ্য। শত কষ্টের মধ্যেও সংসারের প্রতিটি মানুষের একটু ভাল থাকার জন্য সাংঘাতিক গাধার খাটুনি খাটেন। নিজের জন্যে সবচেয়ে কৃপন বাবাও স্ত্রী-সন্তানের বেলায় বেহিসাবী। একা খেতে গেলে সবচেয়ে সস্তা হোটেল খোঁজেন, কিংবা না খেয়েই কাটিয়ে দেন। একা কোথাও গেলে বাসে চড়েন; রিক্সার রাস্তা হেঁটে যান। যদিও মুখের আদর দিতে বাবারা কিছুটা পিছিয়ে। ভালবাসি শব্দটা বেশিরভাগ বাবারাই বলতে জানেন না; করতে জানেন। তাঁদের সকল কাজের মাঝে ভালবাসার প্রমান রাখেন। সব বাবারাই রাখেন।

বাবা হলো ক্রেডিট কার্ড, যা দিয়ে পৃথিবীর অনেক সুখ কেনা যায়। সন্তান এই কার্ডটি দিয়ে তার অনেক ইচ্ছাই পূরণ করে। অনেক আগের কথা। হাইস্কুল শেষ করে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ভর্তি হয়েছি। একটা বড় বড় ভাব এসেছে আমার মনের মধ্যে। এখন অনেক কিছুই একা একা পারি। নতুন ক্লাশ; তাই নতুন বই কিনতে হবে। মাথায় বুদ্ধি আসলো; কুবুদ্ধি। লাগবে ৫০০, বাড়িয়ে বললাম ৬০০ টাকা। বাকীটা আমার। কষ্ট হলেও আব্বা দিয়ে দিলেন। কিছুদিন গ্যাপ দিলাম; এবার মাসের শেষ। সংসারের খরচ চালাতেই হিমশিম খাচ্ছেন আব্বা। আবারো দাবী, ‘আব্বা ২০০ টাকা লাগবে।’ কেন, বলে মলিন মুখে তাকাতেন। বলতাম, ‘পিকনিকে যাবো। কলেজের সবাই যাবে।’ ‘আচ্ছা দেবো নে। কাল দিলে হবে?’ বলে আমায় নিশ্চিন্ত করতেন। যদিও তিনি নিশ্চিত ছিলেন না মাসের বাকী দিনগুলো চলবে কিভাবে?

আমাদের পাঁচ ভাইয়ের সংসার। সবাইকে একসাথে পড়ালেখা করাতে যেয়ে আব্বার নাভিশ্বাস উঠতো। মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে আমি। আমাদের এত চাহিদা থাকতে নেই। তবুও তৈরী হয়ে যায়। আর এই সব চাহিদা পূরণ করেছেন একা আমার এই বাবা। হিসেব মেলাতে পারতেন না মাঝে মাঝে। তাই কৃচ্ছতা করতেন নিজের বেলায়। সাত সকালে ট্রেনে চড়ে কমলাপুর স্টেশনে নেমে রিক্সা তো ভাল, বাসেও চড়তেন না। প্রায় ৪০ মিনিট পায়ে হেঁটে হেঁটে সেগুনবাগিচায় রোজ অফিস করতেন।

ঈদের সময় যত কষ্টই হোক, কম আর বেশী, নতুন কাপড়চোপড় কেনাকাটা হতো। তবে এখনকার মত আগেভাগে নয়। রোজার শুরুতে নয়, একেবারে শেষের দিকে। হুড়াহুড়ি করে কেনা হতো। সবারটাই কেনা হতো; শুধু আব্বারটা ছাড়া। মা ছাড়া এটা কারো চোখেই পড়তো না। আমরা ব্যস্ত থাকতাম নতুন জামা কাপড় কোথায় রাখবো, কেমন করে পরবো এসব নিয়ে। মা খুব করে আব্বাকে বলতো কেনার জন্যে। কিন্তু আব্বা নিতেন না। বলতেন, ‘আমার তো আছে; এইতো সেদিন কিনলাম। এইটা দিয়ে চলে যাবে।’ বড় ভাইয়ারা একটু বড় হয়েছেন। তাই একটু দামী লুঙ্গী চাইতেন। আব্বা কিনেও দিতেন। কিন্তু নিজে কোনদিন নতুন দামী লুঙ্গি পড়তে পারেননি। ভাইয়াদের নতুন কিনে দিয়ে সবসময় তাদেরই পূরানোটা পরা শুরু করতেন! মনে হয় আব্বার জন্মই হয়েছিল আমাদের পরা পূরানো লুঙ্গি পরার জন্যেই!

এতকিছুর পরও আমরা সন্তানেরা বাবাকে সেইভাবে মূল্যায়ন করতে পারিনি সব সময়। কদাচিৎ হলেও মাঝে মধ্যে খারাপ ব্যবহার করে ফেলতাম আব্বার সাথে। তার কাজের ভুল ধরতাম। বুঝতাম না, এসব কত বড় বেয়াদবী; কতবড় বটবৃক্ষ হয়ে তিনি আমাদের ছায়া দিয়ে রেখেছেন। জানতেও চাইতাম না, নিজের সকল সুখ বিসর্জন দিয়ে তিনি কিভােেব আমাদের সুখের সন্ধান করে গেছেন! নিজের দিকে তাকাবার সময় পাননি। তাই ২১ বছর আগে সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ প্রবাসে বসে অকালেই তাঁর চিরতরে চলে যাবার সংবাদ পেলাম হঠাৎ। মধ্যবিত্ত ঘরের বাবারা বোধ হয় এমনই হয়। সবার সুখের ব্যবস্থা করতে করতে নিজে নিঃশেষ হয়ে কাউকে না বলে কয়ে এমনি করেই হুট করে চলে যান!

সংবাদটির জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। সবেমাত্র আমি উচ্চতর পড়াশুনার জন্যে বিদেশ গিয়েছি। মাথার উপর বিশাল আকাশ যেন ভেঙ্গে পড়লো। সেদিন থেকে বুঝতে শুরু করলাম বাবা নামের বিশাল বটবৃক্ষটি আমার জীবনে কী ছিল। পরতে পরতে অনুভব করতে লাগলাম জীবনে আব্বার ভূমিকা কত বিরাট। জন্ম দেয়ার পেছন থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত মা এবং বাবা দুজনেই যার যার জায়গায় সাংঘাতিক রকমের গুরুত্বপূর্ণ এবং অতীব প্রয়োজনীয় দুটি চরিত্র। যাদের একজনের অনুপস্থিতি সংসারের পূর্ণতা নষ্ট করে দেয়; সন্তানকে এতিম করে দেয়। মা বাবা হলো দিয়াশলাইয়ের মত। একটি দিয়াশলাই বাক্সের গায়ে লাগানো বারুদ আর ভিতরে থাকা কাঠি যেমন উভয় উভয়ের উপর নির্ভর করে। তেমনি বাবা-মাও কেউ কারো থেকে কম নয়। উভয়ে উভয়ের পরিপূরক।

ছেলেবেলার কথা। সবার ছোট ছিলাম বলে আদর আহ্লাদ একটু বেশীই পেয়েছি। পিঠ একটুচুলকাচ্ছে, গা মেজমেজ করে পা হাল্কা চাবাচ্ছে, অমনি আব্বার কাছে ছুটে যেতাম। বড় হয়েও গিয়েছি। আব্বা বিছানায় পাশে শুয়ে পিঠ ঘুুরিয়ে আস্তে আস্তে চুলকিয়ে দিতেন। দু’হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চেপে চেপে আমার পা টিপে দিতেন। কি যে দারুন অনুভূতি আসতো! কষ্ট কমে যেত আমার। তারপরও দিতেন; অনেকক্ষন দিতেন! কখনো অল্প একটু দিয়েই থেমে যেতেন না। সারা পিঠময় অবিরাম ঘুরতো আব্বার স্নেহের হাত। এরপর কিছুক্ষন আব্বাকে দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতাম। সাদা ধবধবে আব্বার ঠান্ডা বড় পেটের সাথে আমার ছোট্ট পেটটি লাগিয়ে রাখতাম দীর্ঘক্ষণ।

সেই আব্বা নেই আজ ২১ বছর! এখন আমার শোনিম আছে। ও রোজ রাতে ঘুমোবার আগে আমার কোলের কাছে আসবেই। আমাকে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরে শোবে, খুনসুটি করবে। চুমু দিয়ে আদর করবে কিছুক্ষণ। এরপর অবিকল আমার মত করেই ওর পিঠটি ঘুরিয়ে বলবে চুলকিয়ে দিতে। ঠিক তখনই ওর দাদাভাইয়ের কথা খুব করে মনে হয়। আমি সাধ্যমত চেষ্টা করি। তবে ওর দাদার মত করে অনেকক্ষণ পারিনা। হাত থেমে যায়। চুলকানি থামিয়ে শোনিমকে জড়িয়ে ধরে থাকি। আমিও বাবা হয়েছি কিন্তু আমার আব্বার মত করে বাবা হতে পারিনি!

কেবল যে শোনিমকে জড়িয়ে ধরে থাকি তা নয়। সারা গায়ে নাক লাগিয়ে ওর গায়ের গন্ধ নেই। মিষ্টিলাগা শিশুসুলভ গন্ধে আমার নাক ভরে যায়। আমি ওর সারা শরীরের আনাচে কানাচে আরো বেশী করে গন্ধ নেবার চেষ্টা করি। শোনিম জানে না অদ্ভুত সুন্দর ওর গায়ের গন্ধের মাঝে সব সময় আমি স্নেহমাখা, আদরদেয়া আরো একজনের গায়ের গন্ধ খুঁজে বেড়াই। কাজটি খুব চুপিচুপি করি। বুক, পিঠসহ সারা গায়ের গন্ধ নেই! শোনিম জন্মাবার পর থেকে আজ অবধি কাজটি আমি করেই যাচ্ছি। কিন্তু কোথায়ও সেই কাঙ্খিত গন্ধটি পাইনি।

শুধু আমার শোনিম কেন, আমি নিশ্চিত জানি, বিশাল এই পৃথিবীর কারো গায়েই আমার হারিয়ে যাওয়া বাবার মধুময় গন্ধটি আর কোনদিনই পাবো না!! বাবাদের গায়ের গন্ধ বাবা ছাড়া আর কারো গায়ে যে থাকে না!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা