অনুগল্প: মেঘ বাদলের দিনে

পলাশ কলি হোসেন শোভা: টুং করে শব্দ হতেই ফোনের দিকে তাকায় আদনান। মেসেজ এসেছে লিজার। নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। সারারাত লেখা লিখি ভোরে ইকটু ঘুমিয়ে নিয়েছে। এখন যেতে হবে একটা টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে। যেতে ইচ্ছে করছে না কেমন অলসতা পেয়ে বসছে। মেসেজও ওপেন করেনি। এমন কত মেসেজ আর ধরা যায়?

পোশাকি নাম আদনান আদি। কবি ও আটিস্ট।সুন্দর কবিতা লিখে ছবি আকে। ছবির একজিবিশন কয়েকটা হয়ে গেছে। মানুষ পছন্দ করে সংগ্রহ ও করছে। আর কবিতা?
তার বিশাল এক ভক্ত কূল রয়েছে দেশজুড়ে । তবে ওসব নিয়ে তার কোন হেডেক নেই। তার ভাবনা জুড়ে থাকে দেশের মানুষ । কবিতায় থাকে দ্রোহ। প্রেম বুকের ভেতর থাকলেও বিশ্বাসে নেই।কারন প্রেম টাকে আকড়ে ধরেও এক সময় তা মিলিয়ে যায় পরিস্থিতি নামক যাতাকলে।

নাহ আজ আর বের হবো না। ফোন বাজতেই ওপাশ থেকে মায়ের কথা শোনা গেলো,
বাবা তুই কেমন আছিস? খাইছিস কিছু?
হ , খাইছি তুমি কি খাইলা? শরীল কেমুন এখন? মায়ের সাথে এভাবেই মায়ের ভাষায় কথা বলে আদি। এতে খুব কাছে আছে মা, তাই মনে হয়।
বাবা রে শরীল তো আর ভালো থাহে না। ডাক্তার দেখামু তার কোন সুবিধা নাই।

আব্বারে কও আইজ বিকালে হারান ডাক্তার রে দেখাইতে। আমি বিকাশ কইরা দিতাছি আম্মা চিন্তা কইরো না।
বাজানরে তুই একবার আয়। মনটা দেহার লাইগা পুড়ে।
আম্মা সামনের অগ্রানে আসমু। রাখি ঠিকমত খাইয়ো।
মা, আদির পৃথিবীতে এই একজন ছাড়া আর কেউ নেই। ছিলো আরেকজন মারিয়া মারমা।
সেই কবেকার কথা দুজন দুজনার ছিলো, আনন্দ ছিলো, ঘর ছিলো, অলিখিত সংসারও ছিলো কিন্তু সুখ ছিলো না।

হঠাৎ মনে হলো লিজা কি লিখেছে?
ওওহ মাই গড! বারোটা বেজে গেছে। এখুনি বের হতে হবে। নইলে এসে পরবে। ওমনি দরজার কাছে দাড়ানো লিজা কে দেখতে পায় আদি। ইশ্! ধরা খেয়ে গেলো সে। এই মেয়েটা কচ্ছপের মত কামড়ে ধরে আছে সরছেই না। কতবার বলেছে ওর এসব পছন্দ না। এভাবে যখন তখন আসা অসহ্য। তাছাড়া লিজার সাথে প্রেম তো দূরের কথা ভালো বন্ধুত্বও গড়ে উঠেনি। অথচ.. …
কি, আমাকে দেখে চমকে উঠলে কেন? আর কেউ কি আসার কথা?
তোমারও তো আসার কথা না, আমি তো বলিনি আসতে তাহলে?

আদি এত সুন্দর মেঘ করেছে , তোমার বাসা ছাড়া মেঘ বৃষ্টি কিছুই উপভোগ করা যায় না। বলতে পারো ভোগ করতেই এসেছি।
বিছানায় এসে পা তুলে বসে পড়ে লিজা

আসলেই আদির এই বাসাটা শহরের ভেতরে হলেও মনে হয় গ্রামের সব কিছু অনুভব করা যায়। অনেক গুলো সেমি পাকা ঘর। সামনে বড় একটা উঠোন আর চার পাশে গাছ গাছলি তে ভরা। কয়েক বছর ধরেই শহরের কোলাহল ছেড়ে এখানে থাকছে।একা থাকার জন্য ভাবনার জন্য বা কবিতা লেখার জন্য অসাধারণ পরিবেশ। বন্ধু রা একবার এলে আবার চলে আসে। আর বৃষ্টি এলে? ঝুম বৃষ্টি তে উঠোনটাকে মনে হয় সমুদ্র আর টিনের চালায় বৃষ্টি র শব্দ এক অন্য রকম অনুভূতি আনে আদির মনে।
তোমার জন্য নিজে রান্না করে খাবার এনেছি তোমাকে খাইয়ে দিবো।

এই সারছে প্রেমের সব সবক তো এই মেয়ের মুখস্থ!! মনে মনে ভাবে আদি।
রিং বেজেই চলেছে। তোমার ফোন বাজে আদি।
ওওহ, বলেই ফোনের স্কীনে নাম দেখে বুঝতে পারে কপালে এখন শনি ভর করছে।
কিরে এতক্ষণ লাগে ফোন ধরতে? কি করিস?
কিছু না বল্, কি বলবি?
খুব তাড়া মনে হয়? ঘরে কে আছে?
কে আছে আমারে জিগাস কেন?আইসা দেইখা যা।
এরপর ওপাশ থেকে যা বললো,শুনে হা, হু ঠিক আছে বলে ফোন রাখলো।
কে ফোন দিসে?

তোমার দরকার আছে? মিতি দিসে, হইছে?
হয় নাই।এই মেয়েটা তোমার পিছ ছাড়ে না ক্যান? সারাক্ষণ লাইগা থাকে সুপার গ্লু একটা
লিজা মিতি আমার ভালবাসা প্রেম কিছুই না ও আমার আত্না। তোমার সাথে কতদিনের পরিচয়?
চার মাস
আর মিতি আমার গত নয় বছরের বন্ধু আমার আত্না। তুমি জানো না মারিয়া চলে যাবার পর আমি নিজেকে সব কিছু থেকে গুটিয়ে নেই। যে জীবন যাপন করতাম তা থেকে টেনে বের করে আনে আমাকে। স্বপ্ন দেখায়, কবিতা লেখায় নতুন করে বাঁচতে শেখায়।
তোমরা বিয়ে করো না কেন?

বিয়েতে আমি বিশ্বাসী নই। আর এটাই মিতি মেনে নিয়েছে। সব কিছুর উপরে মিতি।
আমি? আমি কেউ না?
আমিতো কখনো বলিনি তোমাকে তুমি কেউ, বন্ধু হয়ে এসেছো আর সবার মত তাই থাকো ব্যাস
আদির ঘরে ততক্ষণে বৃষ্টির ঝাপটা আসছে। দরজা টা বন্ধ ও করতে পারছে না লিজা ঘরে আছে তাই ।শীল পড়তে শুরু করতেই টিনের চালে ঝুপঝাপ শব্দ হচ্ছে । কি মনে হতেই আদি শীল কুড়াতে উঠোনে নেমে পরে। পশ্চিমের ঘর থেকে আপা চিল্লাচ্ছে আদি ভাই ভিজয়েন না জ্বর আইবো।।

বাড়ির মালিক ফাতু আপা অনেক ভালবাসে নিজের মায়ের পেটের ভাই এর মতন।
আদি শীল খাচ্ছে কুড়াচ্ছে। লিজাও নামার জন্য শাড়ির আচল কোমড়ে গুঁজে নিচ্ছে
লিজা তুমি ভিজো না নেমো না প্লিজ।
কে শোনে কার কথা। দুজনে ইচ্ছে মত শ্রাবণের বৃষ্টি তে ভিজে একাকার হচ্ছে ।
এই ফাঁকে মিতি কে কল দিয়ে ফাতু আপা কমেন্ট্রি করছিলো।

আবারও মিতির কল,
আদি কি করিস?
কম্পিউটারে কাজ করি
লিজা কই? আছে বিছানায়।
ও তোর লুঙ্গি পড়ছে কেন? তারউপর শরীর বের হয়ে আছে। তুই দেখছোস?
আরে ও তো দেখাইতেই আইছে। আমি তো ওরে পিছন দিয়ে বসছি। আপা বলছে তোরে? এই আপাটা না সব বলে দেয় এইঘরে কে আসে কি হয় সব। তুই আপারে চা দিতে বলছিস কেন?
আরে চা খাবো তাই বলছি
ও মেয়ে যে এই অবস্থা তুই জানিস না আপা দেখলে আমারে বলবে।
জানি, বললে কি হবে? তুই আমারে চিনোস না?
বিদায় কর। নইলো আমি ওরে ধরতাছি।
আরে ভাত তরকারি আনছে। খেয়ে বিদায় দিচ্ছি ।

ওই ছোচা এখন বিদায় কর্।নইলে কিন্তু আমি মা কে কল দিবো
তুই না ভালো, আমারআত্না আমার কচু ফুল মা কে বলিস না বিদায় দিচ্ছি। ওই মিতি ওর শাড়ি তো ভিজা কেমনে কি?
আচ্ছা তাহলে থাক্। পরে বিদাই করিস।
লিজা যা ভেবে এসেছিলো তা পূরণ হয়নি। আদিকে আজ সে যেভাবেই হোক ভালবাসার কথা বলবো। ভালোবাসবে। কিন্তু আদি তো এদিকে ফিরছেই না।
আদি গতরাতে নাকি কবিতা লিখছো? কি লিখছো বলোতো?
লিখেছি মিতি কে নিয়ে শোনো,।
প্রিয়তম চোখ
কবে তুই আকাশ হলি?
মেঘ পোড়া নয়নমনি
আষাঢ়ে ভাসালে ফুলের কলি……

বাহ্! সুন্দর তো। আমাকে নিয়ে লিখবা একটা কবিতা?
লিখতে পারি। কবিরা মন চাইলেই লিখে। আমারও মন চাইলে লিখবো।
তুমি আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো আদি।
লিজা শাড়ি শুকিয়েছে মনে হয়। আমি বেরুবো, রেডি হও। আমি বাইরে আছি।

আবারও ফোন
গেছে?
নাহ
কি? কি করে?
শাড়ি পড়ে
তুই কই?

আরে দারোগা আমি দরজায় দাড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছি। বিশ্বাস না হলে আপারে কল দে। আপা আমাকে দেখছে।
মনে মনে হাসে মিতি। বিড়বিড় করে বলে,
আমি জানি তো তুই কেমন। কতটা ভালো। তোরে এমন প্যারার উপর রাখতে আমার বেশ লাগে কারন আমি যে তোকে……………..

লেখক : অধ‍্যাপক (অব) মীরপুর গার্লস আইডিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা।