অনুগল্প: অসীমের মাঝে হারাই সকাল সাঝে

মো: হাবিবুল্লাহ: আমাদের মাথার উপরে মহাশুন্য তার মাঝে ঝুলে আছে একটি অসীম নীল আকাশ, তার নীচে বিশাল একখন্ড নিরেট মাটির ভুখন্ড। ভুখন্ডের কোলে এক বিশাল লবনাক্ত পানির সমুদ্র ঢেউ খেলে চলেছে। কোথাও কালের সাক্ষী হয়ে দৈত্যের মত দাঁড়িয়ে আছে বিরাট উঁচু উঁচু আকাশ ছোঁয়া পর্বতমালা। খোলা আকাশে দিনের বেলায় সুর্য পৃথিবীকে রৌদ্রোজ্জ্বল করছে ও রাতের বেলায় জোছ্‌না রুপালী আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে চাঁদ , অসংখ্য ছোটবড় তারকারাজী শোভা বর্ধন করছে আকাশে । প্রতিদিন সেগুলো দুর থেকে শুধু দেখেই যাই। এ নক্ষত্রগুলো স্পর্শ করার সাধ্য আমাদের নেই । এটুকু চিন্তা করলে বুঝতে পারি পৃথিবীতে যে আকর্ষণের মোহ আমাদের টানে, সেগুলো একটিও আমাদের আয়ত্তে নেই। পৃথিবীর কাছে আমাদের কি মূল্য আছে? তাহলে আমরা অকারণ শিশুরমত বায়না ধরে মিছে মায়ায় পৃথিবীকে আঁকড়ে ধরে আছি। পৃথিবীর কাছে আমার অভিমান…।

মাঝে মাঝে নিজের মনকে প্রশ্ন করি, পৃথিবীতে এমন কি বস্তু আছে? আমার একান্ত নিজের বলে দাবী করতে পারি। না হয় আমরা কিসের মোহে, কিসের আকর্ষণে, দীর্ঘদিন পৃথিবীর আলো বাতাস ভোগ করতে চাই? ইচ্ছে করলেই কি নিরোগ সুস্থ্যদেহ নিয়ে দীর্ঘদিন বাঁচতে পারবো ? ইচ্ছে করলেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ চলে যেতে পারবো ? কোনটাই পারবো না। তাহলে পৃথিবীর কোন বস্তুই যদি আমারই না হবে তাহলে পৃথিবীর মায়ায় প্রলুব্ধ হয়ে কি লাভ ? শুধু নিজের জীবনটাকে একান্ত নিজের বলে দাবী করলেও আমাদের দেহের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আমরা করতে পারিনা। নিয়ন্ত্রণ যেহেতু করতে পারিনা, তাই এ দেহের মালিকও আমরা নই।

বাস্তবে একটু গভীরে চিন্তা করলেই বুঝতে পারি এখানে আমার বলে কিছুই নেই। যদি আমার কিছু ভাবতে যাই তখন মনে হয় আমি জ্ঞানশুন্য । মনের মধ্যে একটি বিশ্বাসই স্থাপন করতে হবে এই যে, একমাত্র মহান আল্লাহপাক সবকিছুর মালিক । তাঁর ইচ্ছাতে পৃথিবীতে এসেছি একদিন তাঁর হুকুমেই পৃথিবীর রঙ্গিণ মনোলোভা নাট্যমঞ্চ থেকে প্রস্থান করতে হবে।

পৃথিবী আমাকে এমন একটি গন্ডির মধ্যে এমনভাবে আবদ্ধ রেখেছে, যেনো আমি একজন কয়েদী ! ইচ্ছে করলেই এ গ্রহ ছেড়ে অন্য গ্রহে ছুটে যেতে পারিনা! সত্যি আমরা মানুষ কত অসহায়। কতটা নিঃস্ব! এটা ভাবলে নিজেকে অতি ক্ষুদ্র প্রাণী একটা পিপঁড়ের চেয়েও নিজেকে ক্ষুদ্র মনে হয়। আর তখনই দাম্ভিকতা মন থেকে ছুটে পালায়। মনের মধ্যে হুস ফিরে আসে, নিজেকে প্রশ্ন করি আমি কে? আমি কি করছি, কি করা উচিৎ,আমি কি উদ্দেশ্য নিয়ে বেঁচে আছি, কত দিনইবা বাঁচবো। এটি মনে করলে আমি পৃথিবীর মধ্যে একটি ছোট পাথর কণার মত একটা প্রাণী ছাড়া আর কিছুই নই ?

চন্দ্রকে যদি বলি আজ রাতে জোছ্‌নার আলো ছড়িয়ে দাও, নিষ্ফল আবেদন, চাঁদ তার সময়মত আলো ছড়ায়। সুর্যকে যদি বাপধন ডেকে বলি আজকের দিনে তোমার তেজটা একটু কোমল কর বা বাড়িয়ে দাও, না সে চিরন্তন তার আপন নিয়মেই চলে। সৌরজগতের নক্ষত্রগুলো আমাদের কথা শুনবে কেন, রাতে ওদের উজ্জ্বল রুপালী আলো ছড়িয়ে রাতের আধাঁর দরিভুত করার ক্ষমতা আছে, ওদের মত আমাদের কি ক্ষমতা আছে ? জানি আমাদের একবিন্দুও সে ক্ষমতা নেই। তবু আমাদের মনে যেনো গর্ব অহংকারের শেষ নেই। সমুদ্রকে যদি বলি তোমার ঢেউ বন্ধ করে শান্ত থাকো, আমরা নিশ্চিত সমুদ্র সেটি কর্ণপাত করবেনা। বুঝতে পারছি এত বিশাল পৃথিবীর বুকে আমাদের অস্তিত্ব কতটুকু জুড়ে আছে।

এই পৃথিবীর আমাকে তার কতটকু প্রয়োজন ? এত বড় পৃথিবীতে একজন ব্যক্তি হিসেবে বেঁচে থাকলাম বা মরে গেলাম এর কোন প্রভাব পড়ে না পৃথিবীর কাছে । যুগে যুগে কত বড় বড় দার্শনিক,গবেষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, ক্ষমতাবান, বীর রাজা বাদশা মৃত্যু বরণ করে পৃথিবী থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে, পৃথিবীর কি কোন ঘাটতি হয়েছে? পৃথিবীটা প্রকৃতিগতভাবে তাঁর আপন নিয়েমেই নিজ ভারসাম্য রক্ষা করে চলছে । মৃত্যুর সাথে সাথেই নতুন প্রজন্ম তৈরী হচ্ছে। আমরা মানুষ বরং পৃথিবীর অপুরণীয় ক্ষতি করে চলছি। বিজ্ঞানের আর্শীবাদে পৃথিবীটাকে নিমিষে বিনাসের পরিকল্পনায় নতুন নতুন আবিস্কারে মত্ত । কোন কিছু সৃষ্টি যত কঠিন তার চেয়ে বিনাস করা খুবই সহজ। আমরা মানুষ মনে হয় স্বভাগতভাবেই বিনাসে শান্তি লাভ করি।

মানুষ জাতি হিসেবে আমরা পরস্পরের কল্যাণ সাধন করা, সুন্দর সভ্য সমাজ গঠন করে সামাজিক জীব হিসেবে সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করা, প্রকৃতির প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিনষ্ট না করা। এর বিপরীত কিছু করলেই সেটি মানবতা বিবর্জিত হয়ে যায়। তাই আমাদের সত্যানুসরণ করা, নৈতিকতা, মানসিকতার উন্নয়ন করা সেই সাথে মানবতাকে মহাশক্তিতে পরিণত করা, মানুষ হিসেবে মনুষত্ববোধ, ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করাটাই জ্ঞানির কাজ মনে করি।

সহায় সম্পত্তি স্থাবর অস্তাবর সবকিছু নিজের ভাবছি। এগুলো সাময়িক ভোগের অধিকার ছাড়া আর কিছু নয়। এ পৃথিবীতে আমাদের আগমন প্রস্থান আমাদের ইচ্ছায় যেহেতু হয় না,সৃষ্টার ইচ্ছায় হয়। বেঁধে দেয়াসৃষ্টার নির্ধারিত প্রকৃতির নিয়মেই সব হচ্ছে ও হবে। তাই পৃথিবীতে কতদিন থাকবো বা থাকবো না এ ইচ্ছা অনিইচ্ছার কোন মূল্য নেই। কারণ এ ক্ষমতা আল্লাহপাক মানুষকে দেয়নি। যদি একবার মনযোগসহকারে নিরবে নিভৃতে ভাবি, উত্তর পেয়ে যাবো।

এদিক ভাবলে আসলে আমাদের কিছুই নেই। ধরায় এসেছি শুন্য হাতে, নির্দিষ্ট সময়ে চলে যেতেই হবে শুন্য হাতে! মৃত্যুর পরে সাথে শুধু একখন্ড সাদা কাপড় গায়ে জড়িয়ে নিয়ে যাবো ! থাকার জায়গা হিসেবে কবরের জায়গাটিও ফিতা দিয়ে মেপে মেপে খোঁড়া হবে। এক ইঞ্চি বড় ছোট করার সুযোগ নেই। এত ভুসম্পত্তির মালিক হয়েও মৃত্যুর পর কবরটা একইঞ্চি বড় করা হবে না ! কেন হবে না এ প্রশ্নটা আমাদের হৃদয়ে সহজে জাগ্রত হয়না। কারণ আমরা পৃথিবীর মায়ায় পড়ে আছি। এটা জেনেও কি পৃথিবীর মোহ আমাকে টানবে? যুগে যুগে পৃথিবীতে মানুষ আসছে এবং প্রত্যাবর্তন হচ্ছে। নিশ্চই এর উদ্দেশ্য আছে। মানুষ জ্ঞানবান হওয়ার পরেই পৃথিবীর সকল সৃষ্টি রহস্য নিয়ে যে যত বেশী ভাববো, গবেষণা করবো আমরা তত বেশী আমাদের স্রষ্টাকে চিনতে পারবো ।

আমরা সকলেই জানি, পৃথিবীটা আমাদের প্রকৃত ঠিকানা নয়। এটি একটি নাট্যমঞ্চ। ক্ষণিকের অবস্থানের জন্য এ মঞ্চে আসা এবং চিরজীবন থাকার জায়গা নয়। বাস্তবেও আমরা তাই দেখছি । ধর্মীয়ভাবেও উপদেশ আছে মানুষকে ভালবেসে যাওয়া, মানব কল্যাণে কাজ করে যাওয়া। যা ব্যক্তির ইহকাল পরকালে মঙ্গল বয়ে আনবে।

-লেখক : কলামিস্ট ও খ‍্যাতিমান গীতিকবি।