অনিয়মে চ্যাম্পিয়ন ইসি

28

যুগবার্তা ডেস্কঃস্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে এবার অনিয়মে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেছে ছয় পর্বে শেষ হওয়া এ ইউপি নির্বাচনে। এছাড়া বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়া, ভোটের আগের রাতে কেন্দ্রে সিল মারা, কেন্দ্র দখল ও দৃশ্যমান কারচুপিসহ নানা অনিয়মের ঘটনা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
নির্বাচনী সহিংসতায় কমপক্ষে ১৩২ জন নিহত হয়েছেন। আর আহত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পথে বাধা ও প্রত্যাহারের চাপের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। যার কারণে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করে এবার ২০৭ ইউপিতে ভোট ছাড়াই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। পাঁচ শতাধিক ইউপিতে চেয়ারম্যন পদে মাঠের বিরোধী দল বিএনপির কোনো প্রার্থী ছিল না।
এছাড়া কোনো কোনো কেন্দ্রে ভয়াবহ সহিংসতায় ব্যাপক হতাহতের ঘটনা, সিল মারা, কেন্দ্র দখল ও দৃশ্যমান কারচুপির ঘটনা ঘটলেও ভোট গ্রহণ অব্যাহত রাখার নজির স্থাপন করেছে বর্তমান কমিশন। তবে ৩৪০টি কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করে দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন করেছে ইসি। পাশাপাশি কোনো কোনো কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ারও দৃষ্টান্ত স্থসপিত হয়েছে এ নির্বাচনে। নানা অনিয়মের বিষয়টি খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন। পঞ্চম ধাপের নির্বাচনের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, সিল মারা (জাল ভোট) বন্ধের ব্যাপারে উন্নতি হয়েছে, সহিংসতায় আহত-নিহতের সংখ্যা বেড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খোদ ইসির কর্মকর্তারা বলেন, ইউপি নির্বাচনের ইতিহাসে এতদিন ১৯৮৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে সবচেয়ে খারাপ বলে আখ্যায়িত করা হতো। ওই নির্বাচনের সব ধরনের নেতিবাচক রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কমিশন। ১৯৮৮ সালে এক দিনে সারা দেশে নির্বাচন করায় সহিংসতা বেশি হয়েছিল। এবার আইনশৃংখলা রক্ষার সুবিধার্থে পাঁচ মাস ধরে ছয় ধাপে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেও ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কমিশন।
ইসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৮ সালের ওই নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখন মারা গিয়েছিলেন ৮০ জন ও আহত হয়েছিলেন পাঁচ হাজারের বেশি।
তবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বরাবরের মতোই সাফাই গেয়ে শনিবার বলেছেন, যে কোনো মানুষের প্রাণহানি একটা দুঃখজনক বিষয়। ইউপি নির্বাচন ভেরি কমপিটিটিভ। সে জন্যই তিক্ততা একটু বেশি। আরেকটা বিষয় মনস্তাত্ত্বিক- আমাদের যারা নির্বাচনে দাঁড়ান, তারা সবাই মনে করেন নিজেরই জয়ী হওয়া উচিত। ভোটাররা কি ভাবেন তা তোয়াক্কা করেন না কেউই। যেজন্য তারা যে কোনো ভাবেই হোক নির্বাচনে জিততে চান। এ সমস্ত কারণেই এমন ঘটনা ঘটেছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সব দিক থেকে এবারের একটি মন্দ ইউপি নির্বাচন হল। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, কেন্দ্রে ফল প্রকাশ না করে পরে তা পাল্টে দেয়া, বিনা ভোটে বিপুলসংখ্যক জয়ী হওয়া, ব্যাপক প্রাণহানি, প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র জমা দিতে বাধা ও প্রত্যাহারের চাপ সৃষ্টির মতো নেতিবাচক সব বৈশিষ্ট্য এ নির্বাচনে বিদ্যমান। নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। তিনি বলেন, মানুষ নির্বাচনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের আস্থা পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারই প্রথম দলীয়ভিত্তিতে ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর ফলে নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা গেছে। অপরদিকে নির্বাচন কমিশন এসব অনিয়মের বির“দ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি। উল্টো কমিশন অনেকটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল। এমনকি কমিশন নিজেদের ক্ষমতাও প্রয়োগ করেনি। ইসির ফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ২০৭ জনের মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র এবং বাকিরা সবাই আওয়ামী লীগের। একটিতেও বিএনপির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পাননি। এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছে। এতে অন্তত ৬৭ শতাংশ ইউপিতে আওয়ামী লীগ জয় পেয়েছে। বিএনপি জয় পেয়েছে ১০ শতাংশ ইউপিতে।
১৩২ জনের মৃত্যু : এবারের নির্বাচনসহ দেশে এ পর্যন্ত নয় বার ইউপি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল। এবার সর্বো”চসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হওয়ায় এ নির্বাচন প্রাণঘাতী বলে আখ্যায়িত করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১১ ফেব্রুয়ারি প্রথম ধাপের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে শনিবার পর্যন্ত নির্বাচনী সহিংসতায় ১৩২ জনের মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে গণমাধ্যমে। সর্বশেষ শনিবার ষষ্ঠ ধাপে সবচেয়ে কম প্রাণহানি ঘটেছে। এতেও চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
আরও জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনে সহিংসতা কমাতে ছয় ধাপে নির্বাচনের আয়োজন করে ইসি। প্রতিটি ধাপে দেড় লাখের বেশি আইনশৃংখলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। কিন্তু কমিশন থেকে পর্যাপ্ত তদারকি ও মনিটরিং করতে দেখা যায়নি। বিপুলসংখ্যক আইনশৃংখলা বাহিনী মাঠে থাকার পরও ২২ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম ধাপের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ১১ জনের প্রাণহানি ঘটে। দ্বিতীয় ধাপের পর থেকে পরবর্তী নির্বাচনগুলো ভালো করার বিষয়ে সিইসি প্রতিশ্র“তি দিলেও ৩১ মার্চ দ্বিতীয় ধাপে ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ৯ জন, ২৩ এপ্রিল তৃতীয় ধাপের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ৫ জন, ৭ মে চতুর্থ ধাপের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ৮ জন, ২৮ মে পঞ্চম ধাপের ভোট গ্রহণকে কেন্দ্র করে ১২ জনের মৃত্যু হয়। বাকিরা ছয় ধাপের ভোটের আগে-পরে সহিংসতায় মারা গেছেন।
বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার আমলে ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত ইউপি নির্বাচনে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। একইভাবে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৭ ও এইচএম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৩ সালের নির্বাচনে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপির প্রথম আমলে ১৯৯২ সালের নির্বাচনেও কোনো প্রাণহানি হয়নি। এর আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রাণহানির রেকর্ড ছিল ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে ৮০ জন নিহত হন। এরপর ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগের আমলে ৩১ জন, ২০০৩ সালে বিএনপির আমলে ২৩ জন এবং ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের আমলে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে। এই হিসাবে অতীতের যে কোনো ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে।
বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন রেকর্ড : স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইউপি নির্বাচনে এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হওয়ার নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। ছয় ধাপে ২০৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। কয়েকটি ইউপিতে চেয়ারম্যান, সাধারণ সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্য সব পদেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। ওই সব ইউপিতে ভোট ছাড়াই শুধু গেজেট প্রকাশ করছে ইসি।
জানা গেছে, এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ২০৭ জনের মধ্যে প্রথম ধাপে ৪৬ জন, দ্বিতীয় ধাপে ৩৪ জন, তৃতীয় ধাপে ২৯ জন, চতুর্থ ধাপে ৩৫ জন, পঞ্চম ধাপে ৩৯ জন ও ষষ্ঠ ধাপে ২৪ জন রয়েছেন। এদের মধ্যে তিনজন স্বতন্ত্র ও বাকিরা আওয়ামী লীগের প্রার্থী। কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, অতীতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার রেকর্ড ছিল ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে। ওই ইউপি নির্বাচনে ১০০ জন চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এছাড়া ১৯৯২ সালের ইউপি নির্বাচনে ৪ জন, ১৯৯৭ সালে ৩৭ জন, ২০০৩ সালে ৩৪ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। ২০১১ সালের নির্বাচনে এ সংখ্যা দুই অংকে পৌঁছেনি বলে ওই সময় দায়িত্বে থাকা ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
প্রাণহানি ও অনিয়মের পরও ভোট গ্রহণ অব্যাহত : ইউপি নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রে অনিয়ম ও কেন্দ্র দখলের পরও ভোট গ্রহণ বন্ধ করেনি নির্বাচন কমিশন। ইসি সূত্রে জানা গেছে, দ্বিতীয় ধাপে ঢাকার কেরাণীগঞ্জের হযরতপুর ইউপির মধুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ঢুকে ব্যালট পেপার ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টার ঘটনায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক শিশু মারা যায় এবং একজন বৃদ্ধ গুলিবিদ্ধ হন। অথচ ওই কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ সাময়িক বন্ধ রাখার পর তা আবার শুর“ করা হয়। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের চরবাওরা ইউপিতে একটি কেন্দ্রে কেন্দ্র দখল ও ব্যালট ছিনতাইকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘর্ষে তিনজনের মৃত্যু হয়। ওই কেন্দ্রের ভোট বাতিল না করে ফল ঘোষণা করা হয়। এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্র দখল, কেন্দ্রের মধ্যে মারামারির অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আমাদের সময়.কম