অনাস্থা দিতে বাধ্য হব ॥ সিনহার প্রতি এ্যাটর্নি জেনারেল

43

যুগবার্তা ডেস্কঃ সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী হাইকোর্টে বাতিল সংক্রান্ত আপীল আবেদনের শুনানিতে সময় চাওয়া নিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা ও এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের মধ্যে বাগবিতন্ডার সৃষ্টি হয়েছে। সাংবিধানিক এই আপীল শুনানিতে আপীল বিভাগের সব বিচারপতি যোগ না দিলে এ মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার কথাও জানান এ্যাটর্নি জেনারেল। পরে এই আপীল আবেদনের দ্বিতীয় দিনের মতো শুনানি শেষে আগামী ২১ মে পর্যন্ত মুলতবি শুনানি মুলতবি করেন সুপ্রীমকোর্ট।
মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আপীল বিভাগে দুটি আবেদন উপস্থাপন করেন। এর মধ্যে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী হাইকোর্টে বাতিলের রায়ে বলা হয়েছিল সংসদ সদস্যদের মধ্যে একটা বিরাট অংশের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল রেকর্ড রয়েছে, সেই এমপিদের তালিকা চেয়ে একটি আবেদন। অন্যটি আপীল বিভাগের সাত বিচারপতি উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত শুনানি মুলতবির আবেদন।
শুনানি শেষে এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা দুটি দরখাস্ত দাখিল করেছি আদালতে। একটি দরখাস্ত দাখিল করেছি হাইকোর্ট বিভাগ তার রায়ে একটি জায়গায় বলেছে, সংসদ সদস্যদের মধ্যে একটা বিরাট অংশের বিরুদ্ধে ক্রিমিনাল রেকর্ড আছে। আমি দরখাস্ত করে সেই তালিকাই চেয়েছি। আদালত বলেছে, এগুলো আমরা শুনানির সময় বা রায়ের সময় দেখবো। আরেকটি দরখাস্ত করেছিলাম দুইজন বিচারপতি বাইরে আছে তাদের উপস্থিতিতেই যেন শুনানি করা হয়।
নিজ কার্যালয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়টির ওপর আমি আগা-গোড়াই জোর দিচ্ছি। যেহেতু এটা সাংবিধানিক বিষয়। সেহেতু আপীল বিভাগের সব কয়জন বিচারপতি যাতে শুনানিতে অংশ নেন। এটা কিন্তু আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি আজও (মঙ্গলবার) বলছি। তিনি বলেন, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন যাতে শুনানিতে অংশ নেন সেই জন্য তাদের তালিকায় রাখা। ওনারা (বিচারপতিগণ) না আসা পর্যন্ত এবং আমাদের প্রস্তুতির জন্য সময় প্রার্থনা করেছিলাম। কিন্তু শুনানি হয়েছে। আগামী ২১ মে পরবর্তী শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন।
এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আমি আদালতকে বলেছি সবাই আপীল বিভাগের সব বিচারপতি যদি এই মামলা না শোনেন তাহলে এই মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেব। তিনি বলেন, গত তারিখে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, সব বিচারপতিকে যুক্ত করেই এ মামলাটি শুনবেন। আজকে (মঙ্গলবার) একপর্যায় ওনি (প্রধান বিচারপতি) বললেন না পাঁচজনই শুনবেন। তখন আমি বললাম সে ক্ষেত্রে আপনারা যদি আপনাদের সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসেন তাহলে আমি অনাস্থা দিতে বাধ্য হবো। কোন বিচারপতি এই মামলা শুনতে অপারগতাও প্রকাশ করেননি বলে জানান এ্যাটর্নি জেনারেল।
আপনি কি আদালতকে হুমকি দিচ্ছেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখানে হুমকি দেয়ার প্রশ্ন আসে না। আদালত যখন বলেছিল তারা পাঁচজনই শুনবেন তখন আমি বলেছি, আপনারা আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সাত বিচারপতি নিয়ে শুনবেন, সে অবস্থা থেকে ফিরে আসলে আমিও অনাস্থা দেব। পরে আদালত বলেছে যখন সাবমিশন শুরু হবে তখন সবাইকে যুক্ত করা হবে। আগামী ২১ মে যুক্ততর্ক শুরু হবে। যারা লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন আদালত সুযোগ দিলে তারা মৌখিক সাবমিশন দেবে।
তিনি আরও বলেন, কোন বিচারক যদি অসুস্থ থাকেন কোন বিচারক যদি অপারগতা প্রকাশ করতেন সে ক্ষেত্রে তো আমাদের কিছু করার নেই। আমি বলতে চাচ্ছি, যেহেতু বিষয়টি একটি সাংবিধানিক বিষয়। যেহেতু দুটি কোর্ট ভেঙ্গে একটি কোর্টে বিষয়টি শুনানি হচ্ছে। এখানে সবাইকে যুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, প্রধান বিচারপতি বললেন এ অবস্থাতে বিচারপতিদের অপসারণ বা ইত্যাদির বিষয়ে কোন আইন নাই। কাজেই এ বিষয়টিকে ত্বরিত গতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। আমি বলছি হ্যাঁ নেয়া উচিত সবাইকে যুক্ত করে এবং আমাকে কিছু সময় দিয়ে।
রিটকারী আইনজীবী এ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদের বক্তব্যেও শুনানি চলাকালে সৃষ্টি হওয়া বাগবিতন্ডার চিত্র পাওয়া গেছে। শুনানি শেষে তিনিও বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। মনজিল মোরসেদ সাংবাদিকদের বলেন, শুনানি শুরুর দিকেই এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি পিছিয়ে দেয়ার জন্য সময়ের আবেদন করেন। এ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারাই বলেছিলেন সাংবিধানিক বিষয়ের এই মামলা আপীল বিভাগের সব বিচারপতি শুনবেন। যেহেতু আজকে (মঙ্গলবার) সব বিচারপতি উপস্থিত নেই (সাতজন), পাঁচজন আছেন তাই সব বিচারপতি উপস্থিত না হওয়া পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হোক।
মনজিল মোরসেদ বলেন, এ সময় এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখন হাইকোর্টের রায় উপস্থাপন করা হচ্ছে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় সব বিচারপতি উপস্থিত থাকবেন। শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতি বার বার জোর দিচ্ছিলেন। এ পর্যায়ে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যদি আমাদের সময় না দেয়া হয়, তাহলে তো আদালতের প্রতি আমাদের আস্থা থাকছে না। মনজিল বলেন, এ্যাটর্নি জেনারেল একপর্যায়ে মামলা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার কথাও আদালতকে জানান।
মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, এ পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনি রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা, আপনি এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। জবাবে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, আপনি কি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন? তখন আদালত বলে, না আমরা হুমকি দিচ্ছি না। তবে আপনি যে বক্তব্য দিচ্ছেন তা কি আপনি বুঝে দিচ্ছেন। মনজিল বলেন, শুনানির একপর্যায়ে আদালত বলে আমরা এখানে বসেছি এই মামলা চূড়ান্ত শুনানি করার জন্য। কারণ এখন কোন বিচারককে অপসারণের কোন আইন নাই। সে ক্ষেত্রে কোন বিচারকের বিরুদ্ধে যদি কোন অভিযোগ আসে তাহলে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। আমরা এ বিষয়ের একটা সমাধান চাই। পরে আদালতের নির্দেশে পেপারবুক থেকে হাইকোর্টের রায় পড়া শুরু করেন অতিরিক্ত এ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিষয়টির ওপর মতামত দিতে ১২ বিশিষ্ট আইনজীবীকে এমিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র ও বিশিষ্ট আইনজীবী হচ্ছেন- টিএইচ খান, ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, এ এফ হাসান আরিফ, আজমালুল হোসেন কিউসি, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এম আই ফারুকী, এ জে মোহাম্মদ আলী ও ব্যারিস্টার ফিদা এম কামাল। এর মধ্যে ইতোমধ্যে আদালতে লিখিত মতামত দাখিল করেছেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া ও এম আই ফারুকী।
উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে অর্পণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে হাইকোর্টের ১৬৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় গত বছর ১১ আগস্ট প্রকাশ করা হয়। বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত বৃহত্তর বেঞ্চ গত বছর ৫ মে বিষয়টির ওপর সংক্ষিপ্ত রায় দেয়। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য ছিলেন- বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোঃ আশরাফুল কামাল। রায়টি লিখেছেন, বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। রায়ের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন বেঞ্চের অপর বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক। তবে বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মোঃ আশরাফুল কামাল রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আরেকটি রায় দিয়েছেন। উচ্চ আদালতের রুলস অনুযায়ী, সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে যে রায় দেয়া হয়, সেটাই চূড়ান্ত হবে।
এক রিটের প্রেক্ষিতে কেন ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করা হবে এ মর্মে রুল নিষ্পত্তি করে এ রায় দেয় হাইকোর্ট। এ মামলায় ৫ বিশিষ্ট আইনজীবী ড. কামাল হোসেন, এম আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ ও আজমালুল হোসেন কিউসিকে এমিকাস কিউরি হিসেবে নিয়োগ দেয় আদালত। এরই মধ্যে বিশিষ্ট আইনজীবী মাহমুদুল ইসলাম মৃত্যুবরণ করেন। বিষয়টির ওপর এমিকাস কিউরিগণের মধ্যে অপর চারজন তাদের মতামত আদালতে তুলে ধরেন।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর আলোকে বিচারপতি অপসারণের জন্য একটি খসড়া আইন প্রস্তত করা হয়েছে। অসদাচরণের জন্য সুপ্রীমকোর্টের কোন বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত ও তাকে অপসারণের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে ‘বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্ট বিচারক (তদন্ত) আইন’-এর খসড়ার গত বছর ২৫ এপ্রিল মন্ত্রিসভা নীতিগত অনুমোদন দেয়।
সর্বো”চ আদালতের বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। বিলটি পাসের পর ওই বছরের ২২ সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। পরে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আইন-২০১৪-এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ওই বছরের ৫ নবেম্বর সুপ্রীমকোর্টের নয়জন আইনজীবী রিট আবেদনটি করে।-জনকন্ঠ