অগণতা‌ন্ত্রিক শাসন কি অ‌নিবার্য ?

56

মুন‌জের আহমদ চৌধুরী : বাংলা‌দে‌শে কি পু‌রোপু‌রি অগনতা‌ন্ত্রিক কোন শাসন ফের অ‌নিবার্য ক‌রে তোলা হ‌চ্ছে? ‌‌সে‌টি কার খেলা ?
দে‌শে গনত‌ন্ত্রের না‌মে ইচ্ছাচার চ‌লে‌ছে কম বে‌শি সব আম‌লে।সর্বগ্রাসী দলীয়কর‌নের রাজনী‌তির দে‌শে কিছুটা সচ্ছতা আর স্পষ্টতা নি‌য়ে জনগনের ভরসার শেষ অকুস্থল এ‌দে‌শের বিচার বিভাগ। আস‌লে রাজনী‌তি আর শাসক‌দের হ‌য়ে উঠবার কথা ছিল দে‌শের জনগনের আশা ভরসার আশ্র‌য়ের ঠিকানা। দুর্ভাগ্যজনকভা‌বে রাজনী‌তি জনগ‌নের ম‌নে আস্থার জায়গাটুকু অর্জন কর‌তে পা‌রে‌নি স্বাধীনতা‌ত্তোর কোন আম‌লেই। ত্যাক্ত-‌বিরক্ত আর রাজনী‌তি নী‌পি‌ড়িত মানু‌ষের তাই বিচার পাবার শেষ আশ্রয় হি‌সেবে আ‌ছে উচ্চ আদালত। স্বীকার করতেই হ‌বে, দে‌শে সরকারগু‌লো উচ্চ আদাল‌তের ঘা‌ড়ে বন্দুক রেখে অতী‌তে অ‌নেক রাজ‌নৈ‌তিক সু‌বিধা নি‌য়ে‌ছে। এমন ন‌জির কিন্তু এক‌টি দু‌টি নয়। ব্যতয় যে নেই বিচার বিভা‌গের সে‌টি নয় কিন্তু। স্বীকার কর‌তেই হ‌বে,‌বিচারকরা তো ভীনগ্র‌হ থে‌কে আসা এ‌লি‌য়েন নন। তারা এই সিংহভাগ নী‌তিহীন রাজনী‌তি সর্বস্ব দে‌শেই বাস ক‌রেন।
‌এখা‌নে কৃষক, সাংবাদিক, ‌চি‌কিৎসক,‌ শিক্ষক সবাই‌কে নায্য পাওনা টুকুন পে‌তেও দ‌লের জা‌র্সি গা‌য়ে চ‌ড়ি‌য়ে রী‌তিমত ষ্টাইকার হ‌য়ে আনুগ‌ত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হ‌তে হয়। এমন দলবা‌জি সর্বস্বতা আজ বাংলা‌দে‌শের বাস্তবতা। ‌
এমন বাস্তবতায় ও কিছু সীমা ও স্বার্থবদ্ধতা স‌ত্বেও বিচার বিভ‌াগই গ‌ড়ে উ‌ঠে‌ছিল ন্যায় ভি‌ত্তিক প্র‌তিষ্টান হিস‌ে‌বে।
প্রথা ভাঙ্গা বা আনুগ‌ত্য ত‌ত্বের উদাহরনীয় বিচারক বিচারপ‌তি খায়রুল হ‌কের কথা আ‌লোচনা না করাই ভাল। সিই‌সি আব্দুল আ‌জি‌জের ম‌তো লজ্জাহীন চ‌রিত্র‌কে বাংলা‌দেশ ভূ‌লে যে‌তে চাই‌লেও পার‌বে না। তি‌নিও একজন বিচারপ‌তি ছি‌লেন।
উচ্চ আদালতের কোনো বিচারকের অবসর গ্রহণের পর পুনরায় কোন লাভজরক সরকারি চাকরি বা প‌দে তাঁর নিয়োগকে ১৯৭২ সালের সংবিধানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। গণপরিষদ বিতর্কে চাকরিকালীন বিচারকদের নিরপেক্ষতা রক্ষার জন্য এটি প্রয়োজন বলে অভিমত দেওয়া হয়। খায়রুল হক
প্রধান বিচারপতি থাকবার সময় তাঁরই নির্দেশক্রমে ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদে বিচারকদের অবসর গ্রহণ করার পর প্রজাতন্ত্রের সব ধরনের কর্মে নিয়োগকে অবৈধ করা হয়, যদিও এ-সংক্রান্ত কোনো স্পষ্ট উল্লেখ তাঁর রায়ে ছিল না।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতির সমান মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদে তাঁর নিয়োগ গ্রহণ স্ববিরোধিতামূলক এবং তাঁর প্রদত্ত রা‌য়ের সাথে সাংঘ‌র্ষিকও। বিচারপ‌তি খায়‌রুল হ‌কের মত শাসক অনুকূল বিচার‌ক যে বিচার বিভা‌গে আর নেই, বাস্তবতা তা আমা‌দের বিশ্বাস কর‌তে বাধ‌া দেয়। আ‌দৌ দেয় না।
বাস্তবতা দেখায়,‌জিয়াউর রহমানের জা‌রি করা সব‌চে‌য়ে বে‌শি সাম‌রিক ফরমান এখ‌নো বিচার বিভা‌গে প্রাব‌ল্যে বিদ্যমান। এখ‌নো বাংলা আইনী প‌রিভাষা তৈরী না কর‌তে পারার অজুহা‌তে আদালত ইং‌রেজী‌তে রায় দেন। সঙ্গত কার‌নেই সু‌বিধা‌ন্বেষী‌দের নি‌জে‌দের ম‌তো ক‌রে ব্যাখ্যা দি‌য়ে বিতর্ক সৃ‌ষ্টির পথ র‌য়ে যায়। গত এক সপ্তা‌হে আমরা তাই দেখ‌ছি। তবু,আমা‌দের স্বীকার কর‌তেই হ‌বে, বিচার‌বি‌ভা‌গের স্বাধীনতা এক‌টি সার্ব‌ভৌম রাষ্ট্রের অপরিবর্তনীয় অনড়তম ‌মৌ‌লিক কাঠা‌মো। আমা‌দের ভ্রষ্ট রাজনী‌তি সংবিধানের কোনো একটি অনুচ্ছেদকে খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা করে। শুধ‌মাত্র নি‌জে‌দের সু‌বিধাবা‌জির তাড়নায়। অথচ,বাক্‌স্বাধীনতা ছাড়া বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিতান্ত নিরর্থক।
দুই
আ‌মি আই‌নের মানুষ নই। আই‌নের বিষ‌য়েও আমার পড়া‌শোনাও খুব সী‌মিত। আমার মরহুম আইনজী‌বি পিতা আমা‌কে আই‌নের শাসনে শ্রদ্ধাশীল হ‌তে তা‌ড়ি‌য়ে‌ছেন আজীবন।
গত দু‌দি‌নে সং‌বিধান নি‌য়ে যারা পড়া‌শোনা ক‌রেন তাদের ক‌য়েকজ‌নের সা‌থে কথা ব‌লে‌ছি। কথা ব‌লে‌ছি,বৃহত্তর সি‌লেটের বর্ষীয়ান রাজনী‌তিক,‌দে‌শের অন্যতম প্রবীন আইনজী‌বি, চারবা‌রের সাংসদ,সা‌বেক মন্ত্রী এড‌ভো‌কেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর সা‌থেও।
দুই হাজার স‌তের আর ১৯৭২ সাল যেমন এক নয় তেম‌নি বাস্তবতাও পা‌ল্টে‌ছে বহুুদুর। সময়ের সা‌থে বিচা‌রকের রা‌য়ে পর্য‌বেক্ষ‌নের ব্যা‌প্তি প্রশারনের প্র‌য়োজ‌ন বা‌ড়ে।
এখন কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রায় গেলেই তারা সেই বিচারপতিকে অপসারণ করতে চাইতে পারেন ‌কি ? এমনকি বিচারকরাও কোনো এমপির বিরুদ্ধে রায় দিতে চিন্তা করবেন ? এটাই কি কাম্য হওয়া উ‌চিত? আপাত দৃ‌ষ্টে বাংলা‌দে‌শের গত ক‌দি‌নের বাস্তবতা সে অনায্যতার কথা বল‌ছে। রা‌য়ে বা পর্য‌বেক্ষ‌নে কোথাও বঙ্গবন্ধু‌কে খা‌টো করা বা সে চেষ্টাও হয়‌নি। না তোতা পা‌খির শ্লোগান সর্বস্ব বি‌রোধীতা কর‌ছেন কজন রায়‌টি আ‌দৌ কত পৃষ্টা প‌ড়ে‌ছেন সে নি‌য়ে ঢের স‌ন্দেহ আ‌ছে। সমাজ,রাজনী‌তির গুনগত নৈ‌তিক অধঃপত‌নের কথা সবাই বল‌ছি আমরা। কেন বিচার বিভাগ তা‌দের পর্য‌বেক্ষ‌নে সে বাস্তবতার কথা বল‌তে পার‌বেন না?
ষোড়শ সংশোধনীর রায় নি‌য়ে ভিন্নমত থাক‌তে ই পা‌রে কা‌রো। সেটাই স্বাভা‌বিক। কিন্তু সর্ব‌চ্চো আদাল‌তের সাত জন বিচারপ‌তি সর্ব সন্মতভা‌বে এ রায় দি‌য়ে‌ছেন। এ‌টি বিভক্ত কোন রায় নয়। তাহ‌লে শুধু প্রধান বিচারপ‌তি কেন টা‌র্গেট শুধু ? এই প্রধান বিচারপ‌তি,‌যি‌নি অপু উ‌কি‌লের ভাষায় ‘হিন্দু নন’ যেমন আজ,গতকাল ছি‌লেন ভস্ম জাতীয়তাবাদী‌দের ‘মালাউন’। আমরা স‌ত্যি বড্ড ভু‌লোমনা জা‌তি। ৫ জানুয়ারীর প্রশ্ন‌বিদ্ধ নির্বাচ‌নেও এস কে সিনহার কমলগ‌ঞ্জের বাড়ী‌তে নাশকতা চা‌লি‌য়ে‌ছিল বিএন‌পি-জামাত। সে‌দিন তো আওয়ামীলীগ দলীয় সাংবা‌দি‌কেরাও এস কে সিনহার দুর্নী‌তির ‘গল্প’ গু‌লোও লে‌খেন‌নি ফেসবু‌কে।
এভা‌বে ভিন্নম‌তের না‌মে যেভা‌বে সর্ব‌চ্চো আদাল‌তের প্রধান বিচারপ‌তি‌কে তুচ্ছ তা‌চ্ছিল্য করা হ‌চ্ছে,‌হেয় অপমা‌নিত করার চেষ্টা করা হ‌চ্ছে তা কি সভ্য গনতা‌ন্ত্রিক কোন রা‌ষ্ট্রে ঘ‌টে? কোন গনতা‌ন্ত্রিক রা‌ষ্ট্রে প্রধান বিচারপ‌তির বিরু‌দ্ধে সভা-সমা‌বেশ হয় ব‌লে আমার জানা নেই।
দে‌শের অন্যতম সং‌বিধান প্র‌নেতা ড. কামাল হো‌সেন গতকাল এক সাক্ষাতকা‌রে ব‌লেছেন,”সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদই হচ্ছে আমাদের রক্ষাকবচ, গাইডলাইন। এতে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ- কেবলই সংবিধানের অধীন এবং কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এরপরেও কেন আমরা বিতর্ক করছি বুঝতে পারি না। ”
আজ‌কে সরকা‌রের
আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদের ম‌তো সি‌নিত্তর মন্ত্রীরা কি ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আদালতের রায়টা পু‌রো পড়েছেন?
অ‌হেতুক যু‌ক্তিহীন তর্কহীনভা‌বে বুলি আর গা‌লি ছুড়ঁ‌ছেন। যা রাজনী‌তি এবং বিচার ব্যবস্থার সুস্থ সম‌য়ে বিরল।
অ‌নে‌কের বক্তৃতা শুনলে মনে হয়- তারা আসলে রায়টা পড়েন নি। দলের তৃতীয় শ্রেণীর সমর্থকদের মত বক্তৃতা করছেন। আসল কথা হল ৫ জানুয়ারীর প্রশ্নসা‌পেক্ষ এ সরকার ক্ষমতায়,‌সে কার‌নে তা‌দের আঘাত একটু বে‌শি লা‌গে।
আইনমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, “এটা কিন্তু ৭৯৯ পাতার একটা রায়। রিভিউ করতে গেলেও পড়ে জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। সেটা সময়না‌পেক্ষ। আজ-কাল-পরশুর ‍মধ্যে হয়ে যাবে- সেটা আমি বলব না।“ তা হলে তিনিই কি ক‌রে পু‌রো বিষয়‌টি না প‌ড়ে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুললেন? এ‌তো আই‌নের হাত ধ‌রেই যেন বেআই‌নি।
অবশ্য,‌বিচারহীনতা,সাম্যহীনতা আজ সমাজ আর রা‌ষ্ট্রের নিশ্বা‌সে,ধমনী‌তে। ইনসাফ যেন ভুগ‌ছে ক্যান্সা‌রে। অথচ মু‌ক্তিযু‌দ্ধের মূলনী‌তি ছিল এ তিন‌টি। অন্যায় কী যে বিশালতায় আসীন দেশময়!
বিচার মা‌নি কিন্তু তালগাছ বিচারক সব আমার এ অসুস্থ ধারা থে‌কে রাজ‌নৈ‌তিক শাসক‌শ্রেনী বে‌রি‌য়ে না এ‌লে ছন্দপতন তখন কেবল অ‌নিবার্যতার প‌রিন‌তি পায়।
‌তিন
এবার ক‌য়েকটা বি‌চ্ছিন্ন একইসা‌থে অপ্রাস‌ঙ্গিক বাস্তবতার কথা ব‌লি। ভারত বা চীন তা‌দের কূট‌নৈ‌তিক সম্প‌র্কের ক্ষেত্রে নি‌জে‌দের দে‌শের স্বার্থ ‌দে‌খে। সেখা‌নে কোন সরকার বা কে ক্ষমতায় সেটা বিষয় নয়। ব্যাপার‌টি সু‌বিধার লেনা‌দেনার। সে কার‌নে ‘পুতুলেরা’ একলাই খেলুক তা চান না মোড়‌লেরা। তারা বি‌ টিমটিকেও মা‌ঝে ম‌ধ্যে হা‌তে নেয়! অবশ্য তা আপন খেলারই স্বা‌র্থে।
রাজনী‌তিও কিন্তু আধু‌নিক প‌রিভাষায় কূটচা‌লে নৈপু‌ন্যের খেলা। ভারত যখন অ‌নেকগু‌লো বাংলা‌দেশমুখী নদীর স্লুইচ গেট খু‌লে দেয়। বাং‌লা‌দে‌শে যখন উচ্চ আদাল‌তের প্রধান বিচারপ‌তি‌কে রাজ‌নৈ‌তিক শাসক‌শ্রেনী সংখ্যালঘু বানা‌চ্ছে,ভার‌তের দ্যা হিন্দু‌র ম‌তো একা‌ধিক দৈ‌নিক তখন রী‌তি ভে‌ঙ্গে এক সম্পাদকীয়র সব প‌ত্রিকায় প্রকা‌শিত শি‌রোনাম হ‌চ্ছে “এস কে সিনহা হ‌চ্ছেন বাংলা‌দে‌শের পরবর্তী রাষ্ট্রপ‌তিৃ। আর বিএন‌পি তখন ভার‌তের বর্তমান সরকা‌রের সা‌থে সম্পর্ক উন্নয়‌নে সর্ব‌চ্চো চেষ্টা কর‌ছে লন্ডন থে‌কে। আশার কথা‌টি হল,সরকার প‌রি‌স্থি‌তি বুঝ‌তে পার‌ছে। সে কার‌নে প্র‌তি‌দিন আধ ডজন মন্ত্রী,অর্ধ মন্ত্রী প্রধান বিচারপ‌তির বিরু‌দ্ধে যেমন কথা বল‌ছেন,‌তেম‌নি আওয়ামীলীগ সাধারন সম্পাদকও এস কে সিনহার বাড়ী ছুট‌ছেন। বাই‌রে চাপ দি‌য়ে ভেত‌রে সম‌ঝোতা বোধক‌রি চানক্য শি‌খি‌য়ে গে‌ছেন।
আ‌মি কায়ম‌নোব‌া‌ক্যে প্রার্থনা ক‌রি আমার সব শঙ্কা মি‌থ্যে হোক। হেলা‌খেলার খেলার ময়দানে আগু‌নের খেলা মাঠ যেন না পোড়ায়। সরকারের বৈধতা চ্যা‌লেঞ্জ না করুক উচ্চআদালত। আ‌রো এক‌টি অগনতা‌ন্ত্রিক সরকার আসবার যে অশুভ ছায়াচিহ্ন তা মু‌ছে যাক বাংলা‌দে‌শের আকাশ হ‌তে।
আর সে‌টি ফলাফল পুর্ব নির্ধা‌রিত কোন খেলা
হ‌লে সে আত্বঘা‌তি মরন‌খেলা ভয়াবহ প‌রিন‌তি বাংলা‌দে‌শের জন্য।-লেখক: লন্ডনবাসী সাংবা‌দিক,সদস্য রাইটারস গীল্ড অব গ্রেট ব্রি‌টেন