উজিরপুরে প্রতারক এক নারীকে নিয়ে আলোচনার ঝড়

131

কল্যান কুমার চন্দঃ বরিশালের উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচাযর্ শিশির কুমার পালের বিরুদ্ধে কথিত শ্রুতিমতে বরিশাল রেঞ্জ ডিআইজির কাছে মনগড়া ভিত্তিহিন একটি অভিযোগ করে হঠাৎ করে বরিশাল সহ গোটা দেশে আলোচনার ঝড় তুলেছেন মোসাম্মৎ রাশিদা বেগম (৪২) নামক এক নারী । এই নারীকে নিয়ে বরিশাল রেঞ্জের পুলিশ এখন রয়েছে মহা বিপাকে । রাশিদা বেগমকে নিয়ে গত দুইদিন ব্যাপী উজিরপুর প্রেসক্লাবভুক্ত সংবাদকর্মিদের সমন্বয় ব্যাপক অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দীর্ঘ অজানা লোমহর্ষক কাহিনী,যা শুনলে রিতিমিত আতকিংত হতে হবে প্রতিটি বিবেকবান মানুষকেই ।

রাশিদা বেগম (৪২), স্বামী মৃত হেলাল মাতুব্বর, ( উল্লেখ্য যে স্বামী হিসাবে তিনি কোথাও কোথাও জনৈক মইন উদ্দিন মাতুব্বরপর নামও উল্লেখ করেছেন ) সাং চরব্রাম্মন্দী,থানা ও জেলা মাদারীপুর । ২০১৭ সাল থেকে তিনি লেগে আছেন দেশের বিভিন্ন থানার ওসি,দারোগা, কনেষ্টবল,সাধারন জনগন সহ নিজের পেটের ছেলের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর এই নারী উজিরপুর মডেল থানার সামনে একটি চায়ের দোকানে বসে হঠাৎ ডাকচিৎকার শুরু করে এবং ওসি শিশির কুমার পাল ও কনেষ্টবল জাহিদুল ইসলামের নামে তাকে মারধর করা এবং তার গালে জলন্ত সিগারেটের স্যাকা দেওয়ার অভিযোগ করতে থাকেন, এক পর্যায় রাশিদা বেগমের কান্না জরিত একটি ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় । এরপরেই ঘটনা তদন্তে নামে জেলা পুলিশ । এ ঘটনায় শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বরিশাল জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) নাইমুল হককে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী ৫ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বিশেষ শাখা) নাইমুল হক শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঘটনা সম্পর্কে স্থানীয়দের মাধ্যমে খোঁজ খবর নেন।

পুলিশ ও সাংবাদিক পৃথকভাবে ঘটনা অনুসন্ধানে নামলে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। জানা যায় ওই নারী সম্পর্কে সীমাহীন অভিযোগ । দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে পুলিশসহ সাধারন মানুষকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করে আসছে রাশিদা বেগম নামের এই নারী। তার প্রতিহিংসার থেকে রেহাই পায়নি তার পেটের বড় ছেলে মৃত রাসেল মাতুব্বরও । কতিথ রয়েছে যে তার ছেলে রাসেল তার মায়ের দায়েরকৃত মামলা থেকে চিরতরে বাঁচার জন্য তার শশুরবাড়ি ভোলা জেলার চরফ্যাসন থানায় বসে আত্মহত্যা করেছে । তার বড় ছেলে রাসেল মায়ের অমতে ভোলা জেলার চরফ্যাসন পৌরসভার আয়শাবাগ ০৯ নং ওর্য়াডের বারেক হাওলাদারের মেয়ে মরিয়ম বেগমকে বিয়ে করার কারনে মায়ের দায়ের করা মুলাদি থানার ৭(১১)/১৭, হিজলা থানার মামলা নং ৬(৭) ১৭ সহ একের পর এক বিভিন্ব থানায় মিথ্যা মামলায় দিয়ে হয়রানী করায় বড় ছেলে রাসেল(২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর) শশুরবাড়ীতে আত্মহত্যা করেন। এ ঘটনায় চরফ্যাসন থানায় ১৭ ডিসেম্বর একটি অপমৃত্য মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় তৎকালিন ওই থানার তদন্ত কর্মকর্তা এস আই আমিনুল ইসলাম অপমৃত্যু মামলার চূড়ান্ত রির্পোট দেয়। এই রির্পোটে ক্ষিপ্ত হয়ে নিহতের মা রাশিদা বেগম ওই থানার অফিসার ইনচার্জ মো: এনামুল হক ও এস আই আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে পুলিশ হেডকোয়াটারে গত ২০১৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এবং ২০১৯ সালের ১লা জানুয়ারী আড়াই লক্ষ টাকা ঘুষ, ডান পাজারে ঘুষি , ডান হাত ভেঙ্গে দেয়াসহ এস আই আমিনুল জ্বলন্ত সিগারেট দিয়ে রাশিদার গাঁল পুড়িয়ে দেন এবং তার নাবালিকা মেয়ে সোনামনির শরীরের আঘাত করে তাদেরকে গলা ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দিয়ে থানা থেকে বের করে দেন মর্মে ওসি ও এস আই এর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে বরিশাল জোনের পুলিশ পরিদর্শক (ডিএন্ডপিএস-১) মো: হেলাল উদ্দিন, বরিশাল জেলা ও মহানগর পিবিআই এর পুলিশ সুপার মো: মিজানুর রহমান ২০১৯ সালের ১৪ মে আনিত অভিযোগ প্রমানিত হয়নি বলে রির্পোট দেন। এছাড়া মাদারীপুর থানার মামলা নাং ৮(৭) ১৯ তারিখ ৩৬৪/৩৪ ধারায় ৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় তার ছেলে হাসানকে অপহরন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রকৃত পক্ষে হাসান নামে কোন সন্তান ভূমিষ্টই হয়নি। মামলায় মাদারীপুর থানার কালকীনী উপজেলার আবু তালেব, সাগর ওরফে ভোদাই ফকির সহ চরফ্যাসন থানার ৪ জনকে আসামী করা হয়। প্রতারক রাশিদা বেগম মাদারিপুর থানায় ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট, নারী শিশু নির্যাতন ও মারামারি ধারায় ৬ জনের বিরুদ্ধে একটি হয়রানী মূলক মিথ্যা মামলা দায়ের করেন,যার মামলা নং ৪২। এ মামলায়ও পুলিশ অভিযুক্তুদের নামে অভিযোগ প্রমানিত না হওয়ায় ২০১৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারী মামলাটি চুড়ান্ত রিপোর্ট প্রদান করে রিপোর্ট নং ৩৬ আদালতে দাখিল করেন । কালকিনি আদালতে ১৭৫/১৭ একটি সিআর মামলা দায়ের করেন। এছাড়া মাদারিপুর থানায় কতিপয় ব্যাক্তিদের নামে ২০১৮সালের ৪ সেপ্টেম্বর একটি সাধারন ডায়রি করেন।

এই নারী সোনামনি (১৪) নামক তার একটি কথিত মেয়েকে পুঁজি হিসাবে ব্যাবহার করে গত তিন বছরে মাদারীপুর আদালত, বরিশালের মুলাদী থানা, হিজলা থানা, বিমানবন্দর থানা, উজিরপুর থানা এবং ভোলা জেলার চরফ্যাসন থানা সহ বিভিন্ন পুলিশ ষ্টেশনে কমপক্ষে ৫০ জনকে ফাঁসিয়ে মেয়ে অপহরনের অভিযোগ করেছেন এবং ফাঁদে ফেলা ব্যাক্তিদের থেকে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে জানাগেছে ।

প্রতারক রাশিদা বেগম ৫ মাস আগে উজিরপুর পৌরসভার ইচলাদী বাসষ্ঠ্যাান্ড সংলগ্ন কালাম হাওলাদার (৫৫) এর বাড়িতে বাসা ভাড়া নেয়, এরপর থেকে ইচলাদী বাজরের বিভিন্ন দোকানে বাকিতে পন্য ক্রয় করে ,এমনকি বাড়ির মালিককে ভাড়া না দিয়ে তালবাহানা করতে থাকে। গত ৪ সেপ্টেম্বর পাওনাদারদের টাকা না দিয়ে বাসা বাড়ির মালামাল নিয়ে অন্যত্র পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কালে পাওনাদারেরা তাকে বাধা দেয় । এ ঘটনা শুনে উজিরপুর মডেল থানার ওসি শিশির কুমার পালের নির্দেশে এস আই রুহুল আমিন সংগীয় ফোর্স নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবেশ শান্ত করে । পরে ১১ সেপ্টেম্বর পুলিশের সহযোগীতায় পাওনাদারদের টাকা আশিংক পরিশোধ করে এবং বাড়ি ভাড়ার টাকা পরিশোধ না করে উল্টো বাড়ির মালিক কালাম সহ স্থানীয় বোরহান ,শুক্কুর ,আনিচের নাম উল্লেখ করে তার মেয়ে সোনামনি (১৪) কে দিয়ে একটি মিথ্যা অপহরনের নাটক সাজিয়ে অপপ্রচার চালায়, এবং বাড়ির মালিকের কাছে অগ্রিম বাবদ ৮ হাজার টাকা দিয়েছে বলে দাবী করে । এদিকে বাড়ির মালিক কালাম হাওলাদার স্থায়ী ভাবে ঢাকায় বসবাস করে। এ ব্যাপারে বাড়ির মালিক জানান রাশিদা বেগম আমাকে অগ্রিম কোন টাকা দেয়নি বরং আমি তার কাছে বাড়ি ভাড়া বাবদ সাড়ে তিন হাজার টাকা পাবো । উল্টো সে আমার সম্মান হানি করেছে।
অপরদিকে ঘটনার পরেরদিন রাশিদা মালামাল নিয়ে বরিশাল বিমান বন্দর থানার রহমতপুর আলী মিঞার মার্কেটে রফিকের ঘরে বাসা ভাড়া নেয়। বাসায় উঠার পরের দিন ওই মালিকের সাথে ঝামেলা সৃষ্টি করে সেখান থেকে চলে যায়। বাড়ির মালামাল নিয়ে যাওয়ার ট্রাকের ভাড়া না দিয়ে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করলে এয়ারর্পোট থানায় এস আই মনোজ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনে। এ ব্যাপারে রাশিদার ছেলে আলামিন বাবু জানান, তার মা বিভিন্ন জায়গায় ইচ্ছাকৃতভাবে ঝামেলা সৃষ্টি করে এবং আমাকেও মামলা দেয়ার ভয় দেখায়।
এ ব্যাপারে উজিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ, শিশির কুমার পাল জানান, আমার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগ গুলো মিথ্যা, বানোয়াট। আমার সম্মান হানিসহ আমাকে ব্লাকমেইল করেছে। সঠিক তদন্ত হলে এর মূল রহস্য বেরিয়ে আসবে।
বরিশাল জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম (বিপিএম) এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বিষয়টি আমি শুনেছি। রাশিদা বেগম সম্পর্কিত পুরো ঘটনাটরই তদন্ত চলছে ,তদন্ত শেষ না হলে কিছু বলা যাবে না ।