মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রাণীটি

30

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ মধ্যবিত্ত শব্দটি একটি মারাত্মক শব্দ। আপাত দৃষ্টিতে একটি গোবেচারা মার্কা হাবলু টাইপের শব্দ। তবে এর ভেতরটা মোটেই গোবেচারা টাইপের নয়। একেবারে ভেজাল বিহীন অত্যন্ত জটিল এবং কঠিন টাইপের শব্দ। সমাজের আনাচে কানাচে, যত্রতত্র শব্দটি ব্যবহার হয়। অবলীলায় এবং খুব সহজেই ব্যবহার হয়। কিন্তু বাস্তবে মধ্যবিত্তের কোন কিছুই সহজে হয় না। কাঠখড় না পুড়িয়ে মধ্যবিত্ত সহজে কোন কিছুই করতে পারে না। পারে কেবল মাত্র অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে। খুব সহজেই কাজটি পারে। জোড়াতালি দিয়ে কোনমতে সম্মানবোধ ধরে রেখে অসহায় মাখা মুখখানা তুলে সহজেই অসহায়ত্ব প্রকাশ করতে পারে।
এমনি অসহায় একটি মুখ নিয়েই মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার বেড়ে ওঠা। সেই শৈশব থেকে একটু একটু করে বেড়ে উঠতে যেয়ে কত নির্মম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি যে হয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। এটা সবাই বুঝবে না। উচ্চবিত্ত তো নয়ই। একটু উপর থেকে মধ্যবিত্তকে যারা দেখে বিষয়টি তারাও বুঝবে না। বুঝতাম আমি; বোঝার জন্যে আমাকে কোন কসরত করতে হতো না। বরং তারাই বুঝিয়ে দিত। বুঝতে না চাইলেও জোর করে বুঝিয়ে দিত। সকাল সন্ধ্যা জীবনের নানা ঘটনায় নানাবিধ উপায়ে বুঝিয়ে দিত।
একবারের ঘটনা। আমার শোনিমের চেয়েও আমি তখন বেশ ছোট। ধলা ভবঘুরে আশ্রমে সদ্য নিয়োগ পেয়েছেন বড্ড তরুণ সহকারী ম্যানেজার ফজলুল হক। সরকারী ২য় শ্রেণীর কর্মকর্তা। থাকেন ময়মনসিংহ শহরের নিজ বাসায়। সকালের ট্রেনে ধলা এসে অফিস শেষে সন্ধ্যায় ময়মনসিংহে ফেরেন। মিশুক প্রকৃতির ভারী ভাল এই মানুষটি অল্পতেই সবার মন জয় করে নিয়েছেন। একদিন তার বিয়ের সংবাদ এলো। সংবাদ তো নয়; পুরো জমিদার বাড়ীতে যেন হৈহৈ রব উঠে গেল। যার তার বিয়ে নয়; ছোট ম্যানেজার সাহেবের বিয়ে। ফাটাফাটি আয়োজন।
ফাটাফাটি এই আয়োজনে আমাকেও ময়মনসিংহ নিয়ে গেলেন আব্বা। পৌঁছে তো আমি অবাক। সাংঘাতিক রকমের বড় আয়োজন। সারা বাড়ী লাল নীল বাতিতে সাজানো। ভেতরে বাহিরে সব জায়গায় সাজানো। যেনতেন বাতি নয়। একবার জ্বলে আবার নেভে। চোখ জুড়িয়ে যায়। আমি অবাক নয়নে দেখি। স্বর্গতুল্য এমনই শহরে এসে আমি তো অস্থির। অস্থির হবার দ্বিতীয় কারণ হরেক রকমের রকমারী খাবার। জিহ্বে পানি আসে। ইস্! যদি এই শহরেই সারাটা জীবন থাকা যেত!
সারাজীবন না হোক, প্রথম রাতের থাকার জায়গা হলো ড্রয়িং রুমের মেঝেতে। নো প্রবলেম। এক রাত্রিরই তো বিষয়। দেখতে দেখতে পার হয়ে যাবে। আর বললেই তো হবে না! এত্ত এত্ত মানুষ! এত্ত বেড পাবে কোথায়! আবার বেড যা আছে সবই উপর লেভেলের জন্যে বরাদ্ধ দেয়া! মধ্যবিত্তের জন্যে ওসব নয়। এসব নিয়ে আমার মধ্যবিত্ত বাবার কোন মাথা ব্যথাও নেই। এদিক ওদিক তাকিয়ে রুমের এক কোণায় এখনো দখল না হয়ে থাকা তোষকের উপর আমাকে নিয়ে শুয়ে পড়লেন। অবশ্য গায়ে দেবার মত কিছু একটা খুঁজেছিলেন। কাঁথা কিংবা চাদর! দু’একটা ছিলও। কিন্তু ভাগে জোটেনি। কাড়াকাড়ি করতে পারেননি বলেই জুটেনি। মধ্যবিত্ত কাড়াকাড়ি করতেও জানে না।
মধ্যবিত্তরা এমনই হয়। এক বালিশে মাথা রেখে বাপবেটা অনায়েশে রাত পার করতে পারে। বেশ ভালভাবেই পারে। মশারী ছাড়াও পারে। সে রাতে আমরাও পেরেছিলাম। আব্বার আদরমাখা হাতে পিঠ হাতিয়ে দেয়ায় বেশ আরাম করে ঘুমিয়ে রাতটা প্রায় পার করেই ছিলাম। আব্বা দারুণ ভাবে শরীরে আদর দিয়ে ঘুমপাড়াতে পারতেন। হাতপাখা দিয়ে সারারাত বাতাস দিতেন। ঘুমের মধ্যেও দিতেন। আজ হাতপাখা লাগেনি। মাথার উপর ফ্যান ছিল।
বিদ্যুত বিহীন গ্রামের অন্ধকার থেকে এসেছিলাম বলে ফ্যানের বাতাসটাও বেশ উপভোগ করেছিলাম। কী চমৎকার বিষয়; পাখা ঘুরাতে হয় না। কেবল একবার সুইচ দিলে নিজে নিজেই ঘোরে। এসব ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়েছিলাম টের পাইনি। ঘুম ভাঙলো ভোর রাতের দিকে। শীতের কারণেই ভাঙলো। আব্বাকে জড়িয়ে ধরেও শীত কমাতে পারছিলাম না। হাল্কা শীতের আমেজ ভোর রাতে ভারী শীতে পরিণত হওয়ায় বেশ শীত লাগছিল। অসহায় বাবা আমার! সমাধানের কোন পথ না পেয়ে নিজের গায়ের জামাটি খুলে আমার গায়ে পেঁচিয়ে দিলেন।
এই আমার বাবা! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা! নিজে শীতকে বরণ করেছেন আমার শীত নিবারণের জন্যে। কেবল আমার বাবা নয়। মধ্যবিত্তের সব বাবারাই এমন। উচ্চবিত্তের বাবাদের এমন করতে হয় না। করা লাগে না। মধবিত্তের লাগে। হাজারো স্যাক্রিফাইস কেবল এই মধ্যবিত্ত বাবাদেরই করতে হয়। কোথায় করতে হয় না! দাম্পত্য জীবনেও করতে হয়। মধ্যবিত্তের বিয়ের আট-দশ বছরে মায়েদের সঙ্গে আর আগের সেই ভালোবাসাটা থাকে না। ভালোবাসাটা অভ্যাসে পরিণত হয়।
নিত্যদিনের রুটিনে থাকে না। নিত্যদিন আলু-পেঁয়াজ, বাচ্চার স্কুল-কলেজের আলাপে ঘুম নেমে আসে চোখে। একান্ত নিজের কথা, নিজের ভাবনা, ভালোলাগা কিছু বলার অবকাশ হয় না। বিয়ের শুরুতে অথবা প্রেমিক জীবনে হয়তো বাচ্চার নাম ঠিক করেছিলেন দু’জন মিলে। রোমান্টিসিজম ছিলো। সন্তান জন্মের পরে একরাশ দায়িত্ব কাঁধে চাপে। সন্তানের স্কুল, ভালো রেজাল্ট, বিয়ে, বাড়ি- গাড়ি। এসব আলাপেই ব্যস্ত থাকেন দু’জন।
একসময় হয়তো দুপুরে অফিসের ব্যস্ততার ফাঁকে ফোন দিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে নানা অর্থহীন গল্প গুজবে ভালোবাসা খুঁজে পেতেন। এখন ফোন দিলে স্ত্রী বলেন, ‘ডিপোজিটের টাকাটা জমা দিয়েছো? কারেন্ট বিল, গ্যাস বিল দিয়েছো?’ বাসায় ফিরে দেখেন স্ত্রী ব্যস্ত বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক নিয়ে। যদি স্ত্রীকে বলেন, ‘আসো একটু নিরিবিলি কথা বলি, আমাদের কথা বলি।’ উত্তরে স্ত্রী বলেন, ‘ঢং করার জায়গা পাও না? আমার রান্না আছে! একটু পরে বলবা ভাত দাও।’
এখানে স্ত্রীদের কোন দোষ নেই। তিনিও তো মধ্যবিত্তের স্ত্রী। আর তাই তিনি বলবেন, ‘বাচ্চারা বড় হয়েছে, সে খেয়াল আছে?’ কোনো কোনো সময় হয়তো বাচ্চারা আশেপাশে থাকে না। আমাদের মায়েরা ফ্রি থাকেন। দুই কাপ চা নিয়ে দু’জন বসে পড়েন পুরানো স্মৃতি রোমন্থনে। কিন্তু মন ভরে করতে পারেন না। হঠাৎ করেই হয়তো প্রতিবেশীর মেয়ের বিয়ের দাওয়াতের কথা মনে পড়ে। কমদামে সম্মানজনক গিফট কেনার চিন্তা গ্রাস করে দু’জনকে। বিশেষ করে বাবাকে। নিঃসঙ্গ কর্মজীবি বাবাকে!
মধ্যবিত্ত পরিবারের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ প্রাণীটি হলো বাবা। বাবারা যে কতোটা নিঃসঙ্গ তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মায়েদের সঙ্গে অভিমানের সময়। আমাদের বেশিরভাগ সন্তানই মা ঘেঁষা। বাবার সঙ্গে কেমন যেন একটা দূরত্ব থাকে। সন্তানেরা ভাবে, ‘বাবা প্রাণীটা কেমন। সেই সকালে বেরিয়ে যায়, রাতে ফেরে। দেখা হলে কেবল রেজাল্ট জিজ্ঞাসা করে। এমন কেন এই লোকটা?’ মায়েরা সন্তানকে নিয়ে সংসার নামক পার্লামেন্টে ঐক্যজোট করে। বাবা দেখে তার সন্তানেরাও তার পক্ষে নেই।
যাদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য তিনি বাবা-মা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন সেই সন্তানেরাও তার পক্ষে নেই। আবার যাদের সঙ্গে বিছানা শেয়ার করেছেন, এক পাতে খেয়েছেন; সেই ভাইবোনেরাও সংসারের চাপে জমি-বাড়ি-সম্পদ বিষয়ক ঝামেলায় দূরের মানুষ হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে এক সময়ের কাছের বন্ধুদের সঙ্গেও সেরকম যোগাযোগ থাকে না। কিংবা থাকলেও নানা রকম সামাজিক অনুষ্ঠান, বৈষয়িক কথাবার্তা, ছেলেমেয়ের রেজাল্টের খবর আদান-প্রদানে আটকে থাকে সেইসব যোগাযোগ।
সহকর্মীদের সঙ্গেও একটা কৃত্রিম গাম্ভীর্য বজায় রেখে চলতে হয়। যাকে বলে প্রফেশনালিজম। সম্পর্ক যেটুকুই থাকে পুরোপুরি অফিসিয়াল। ভাসা ভাসা সম্পর্ক; স্বীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়ে এখানে সম্পর্ক হয় না। কারো সাথেই মন খুলে কথা বলা যায় না। এখানেও বাবারা নিঃসঙ্গ। কারো সঙ্গে একত্রে বসে, নিজের মনের একান্ত কিছু কথা বলতে পারে না। বলার কেউ থাকে না। কেউ না।
মধ্যবিত্তের মায়েরা এই ক্ষেত্রে কিছুটা ভাগ্যবতী। আশেপাশে তাদের কথা বলার কেউ না কেউ থাকে। অভিমান করে চলে যাবার কত জায়গাও থাকে। থাকে বাপের বাড়ি কিংবা বোনের বাড়ি। মায়েরা কথায় কথায় বলতে পারে, আমি চলে গেলাম। কিন্তু মধ্যবিত্ত বাবারা সেটাও পারে না। এখানেও তারা দূর্ভাগা। সামান্য একটি রাতও কারো বাসায় গিয়ে থাকার মতো জায়গা তাদের নেই! বাবাদের চলে যাবার মতো কোন জায়গা আসলেই কোথায়ও নেই!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।