রোহিঙ্গা, কাশ্মীর ও পাকিস্তান

1

হারুন হাবীব

কাশ্মীরের প্রতি সৌন্দর্যপিপাসুদের টান বা ভালোবাসা যতই থাকুক না কেন, হিমালয়ের এই নয়নাভিরাম উপত্যকা কখনোই তিক্ততার বাইরে ছিল না। ইংরেজের সুদীর্ঘ উপনিবেশ শেষে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকে কাশ্মীর প্রায় লাগাতারভাবে আলোচনায় থেকেছে। এই ভূখণ্ড নিয়ে ভারত ও পাকিস্তান কয়েকটি যুদ্ধ করেছে। সেসব যুদ্ধে মানুষ হতাহত হয়েছে, জনপদ ধ্বংস হয়েছে, সম্পদ নষ্ট হয়েছে; কাশ্মীরের মানুষের অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর পর আছে জেহাদি বা উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর তৎপরতা, প্রায় লাগাতার ও ভয়ঙ্কর সব সহিংসতা। তবে চলতি বছরের ৫ আগস্ট একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’। কারণ সেদিন থেকেই কাশ্মীর আলোচনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। কারণ ভারতের বিজেপি সরকার প্রায় আকস্মিকভাবে দেশের সংবিধানের কাশ্মীর সংক্রান্ত সাংবিধানিক ধারাগুলো রহিত বা অকার্যকর করে জম্মু ও কাশ্মীরকে দেশের কেন্দ্রীয় শাসনের অন্তর্ভুক্ত করেছে। লাদাখকে আলাদা করেছে। অনেকটাই স্বশাসিত কাশ্মীর পরিপূর্ণভাবে ভারতের অংশ হয়েছে। সুতরাং বাংলাদেশ কেন; গত এক মাসে প্রায় সারাবিশ্বেই কাশ্মীর নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে, খোদ ভারতেও পক্ষ-বিপক্ষের যুক্তিতর্ক চলছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনী এমন সব ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলেছে, যাতে মনে হতেই পারে, দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে আরেকটি যুদ্ধ প্রায় অনিবার্য। অতএব কাশ্মীর নিয়ে কিছু মন্তব্য করার ইচ্ছা বটে, তবে আমার বিবেচনায় কাশ্মীরের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ আমাদের জন্য রোহিঙ্গা সংকট।

দুই বছর আগে বিপন্ন, ভয়ার্ত রোহিঙ্গারা জীবন বাঁচাতে যখন নাফ নদ পেরিয়ে বাংলাদেশে আসতে শুরু করে, একজন সংবাদকর্মী হিসেবে তখন কক্সবাজারের কয়েকটি এলাকায় যেতে হয়েছিল আমাকে। সাম্প্রতিক সময়ের ভয়াবহতম মানবিক বিপর্যয়ের চেহারা দেখে শিউরে উঠেছিলাম সেদিন। একটি গণতান্ত্রিক সরকারের উপস্থিতিতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী কী নির্মম পন্থা ও ভয়ঙ্কর বর্বরতায় একটি অতি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষকে ঘরবাড়ি-ছাড়া করেছে, তার শত জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত পেয়েছি টেকনাফ ও উখিয়ার বনবাদাড় ও সমুদ্রের কিনারা ঘুরে। যে কোনো সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই বলতে বাধ্য হবেন, রোহিঙ্গারা গণহত্যা, গণধর্ষণসহ যেসব নিষ্ঠুর আচরণের শিকার হয়েছে, তা সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে হৃদয় কাঁপানো ঘটনা। কাজেই বাংলাদেশের মাটিতে তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি ছিল ন্যায্য ও মানবিক। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, দুই বছরের ব্যবধানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের সেই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে শুরু করেছে। এই পরিবর্তনের যোগ্য কারণও আছে। এই বিপন্ন মানুষদের জায়গা দিয়ে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ ও সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়লেও সরকারের এই সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়েই সমাদৃত হয়েছে। কিন্তু দুই বছরেও রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরিকল্পিতভাবেই মিয়ানমার যাদের বহিস্কার করেছে, তারা তাদের ফিরিয়ে নেয়নি। নানা টালবাহানায় জটিলতা সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ আগস্ট মাসে কয়েক হাজার রোহিঙ্গার প্রথম দলটির যাওয়ার দিনক্ষণ ঠিক হলেও পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা সঙ্গবদ্ধভাবে ফিরে যাওয়ার বিরোধিতা করেছে, প্রতিরোধ কর্মসূচি দিয়েছে। তারা হাজার হাজার মানুষের মিছিল, জনসভা করেছে। এমনকি সশস্ত্র তৎপরতা দেখিয়েছে। খবরে প্রকাশ, সেই প্রতিরোধে শক্তি ও সামর্থ্য জুগিয়েছে কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও।

অনেককাল থেকেই পাকিস্তান ও কিছু বিদেশি শক্তি রোহিঙ্গা সংকটকে ব্যবহার করে এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে। যার খবর দেশ-বিদেশের নানা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। অতএব রোহিঙ্গা ইস্যু আজ কেবল মানবিক সংকট নয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তারও সংকট। কেবল বাংলাদেশ নয়; ভারতকেও তাই গভীরভাবে রোহিঙ্গা নীতি নিয়ে ভাবতে হবে। যত দ্রুত এসব ভাগ্যহীন মানুষ স্বদেশে ফিরে যায়, সে লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় আমার বিশ্বাস, আজকের মানবিক সংকট আরও বড় ও দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্র তৈরি করবে। গণচীন বরাবরই মিয়ানমারের সমর্থক। সে দেশে দৃশ্যত চীনের প্রভূত অর্থনৈতিক বিনিয়োগ আছে। হয়তো কৌশলগত স্বার্থও আছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীন মিয়ানমারকেই জোরালো সমর্থন দিয়েছে। কিন্তু অতি সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতির দেশটি রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের মনোভাবকে সমর্থন করেছে। এখন প্রয়োজন চীনের আন্তরিকতা প্রদর্শন। ভুললে চলবে না, বাংলাদেশের সঙ্গেও চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক যোগসূত্র আছে।

আসি কাশ্মীর প্রসঙ্গে। কাশ্মীর নিয়ে যে সংকট তার ক্ষেত্র তৈরি হয় ৭০ বছর আগে। ইংরেজ শাসনে কাশ্মীর ছিল ‘প্রিন্সলি স্টেট’ বা স্বশাসিত রাজ্য। সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক মুসলমান হলেও শাসক রাজপুত ডোগরা বংশীয় মহারাজা হরি সিং। সাতচল্লিশে ব্রিটিশ ভারতের বিভক্তির ডামাডোলে সব রীতিনীতি ভেঙে সৈন্য পাঠিয়ে পাকিস্তান অঞ্চলটির একটি বড় অংশ দখল করে নেয়, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘আজাদ কাশ্মীর’। না, সেই কাশ্মীর নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য নেই। কারণ তা পাকিস্তানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর পর ভারত বাকি অংশ পাকিস্তানের হাত থেকে রক্ষা করে, মহারাজা হরি সিংয়ের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয় এবং সংবিধানে ৩৭০ ধারা সংযোজন করে অঞ্চলটিকে ভারতীয় সংবিধানের আওতায় বিশেষ মর্যাদা দেয়। বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী হয় জম্মু ও কাশ্মীরের সংসদ। প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি, মুদ্রাসহ কয়েকটি বিষয় ছাড়া স্বশাসনের অধিকার পায় কাশ্মীর। কিন্তু কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত নেহরুর যে সরকার এ ব্যবস্থা মেনে নেয়, তারাই ক্রমান্বয়ে নতুন চিন্তায় সিক্ত হয়। কাশ্মীর পরিস্থিতি ঘোলাটে হতে থাকে। নতুন করে স্বাধীনতার দাবি ওঠে। পাকিস্তান প্রকাশ্যেই ভারত নিয়ন্ত্রিত অংশের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে চলে; তাদের অস্ত্র-গোলাবারুদ জোগান দিতে থাকে। মূলত পাকিস্তানের সহায়তায় গড়ে ওঠে বিভিন্ন নামের সশস্ত্র জেহাদি সংগঠন, যাদের সঙ্গে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সংষর্ষে লাগাতার রক্তপাত ঘটে। উল্লেখযোগ্য, পাকিস্তান কাশ্মীরি জেহাদিদের প্রায় প্রকাশ্য ও জোরালো সমর্থন দিতে থাকে মূলত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর। সাময়িক বা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া যা-ই হোক না কেন, বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্ত মূলত দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারত সরকারের সিদ্ধান্ত। ভুল বা সঠিক তা ঠিক করবে সময়। কারণ এ সিদ্ধান্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদী শাসক দলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিদ্ধান্তটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে ভারতের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। এর প্রত্যক্ষ বিরোধিতা দেশটির কোনো রাজনৈতিক দল করেনি। যদিও কংগ্রেসসহ কেউ কেউ সরকারের সমালোচনা করে চলেছে, বিশেষত সাংবিধানিক ধারাটি রহিতের পদ্ধতিগত কিংবা আইনগত প্রক্রিয়ার প্রশ্ন তুলে। তবে কেউ কেউ এও মনে করেন, এ সিদ্ধান্ত সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গোটা কাশ্মীরকে তার নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। পরবর্তী ৭০ বছর ধরে নানা তৎপরতার পরও তা সম্ভব হয়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ও তার সরকার কাশ্মীর প্রশ্নে যে ধরনের উগ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে যাচ্ছেন, তাতে মোদি সরকারের ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হচ্ছে। পাকিস্তান রাতারাতি ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করেছে; বাণিজ্য ও যাতায়াত বন্ধ করেছে। সরকারের আয়োজনে সারাদেশে কাশ্মীর উদ্ধারের সমাবেশ চলেছে। দেশটির সেনাবাহিনী যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের গণমাধ্যম প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পাকিস্তান যত বেশি কাশ্মীর প্রশ্নে কঠোর হচ্ছে, ভারতের মানুষ তত বেশি মোদি সরকারের হাত শক্ত করছে। এমনকি ভারতের উদারপন্থি বা বিজেপি সরকারের শক্ত সমালোচকরাও পাকিস্তানের হুঙ্কারে নীরব হচ্ছেন। কারণ তারা সবাই বিশ্বাস করেন, পাকিস্তানের সহায়তাতেই কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলে। এ আন্দোলনকে পাকিস্তান যতই ‘আজাদি’ বলে চালানোর চেষ্টা করুক না কেন, আদপে তা নয়। ভারতের জনমত জানে, হিজবুল মুজাহিদিন, লস্কর-এ-তৈয়বা বা জয়স-ই-মোহাম্মদসহ নানা ধরনের উগ্রপন্থিরা পাকিস্তানের সমর্থনেই মুম্বাই, কাশ্মীরে তৎপরতা চালায়। আন্তর্জাতিক দূতিয়ালিতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’ বর্তমান, তারও লঙ্ঘন ঘটেছে বারবার। কাশ্মীর ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণেও সফল হয়নি পাকিস্তান।

দৃশ্যত নরেন্দ্র মোদি সরকার এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভ করেছে। পাকিস্তানের সব আবহাওয়ার বন্ধু চীন স্বভাবতই ক্ষুুব্ধ হয়েছে। বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ অনেক দেশই বিষয়টি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখছে। তবে সবাই চায়, সংঘর্ষে না জড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ভারত ও পাকিস্তান বিষয়টির সুরাহা করুক। কেউ কেউ আবার শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন, যাতে দুই দেশের মধ্যে পারমাণবিক সংষর্ষ না বাধে। কাশ্মীর নিয়ে বিজেপি সরকারের সিদ্ধান্তটি এরই মধ্যে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। অক্টোবর মাসে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ এ সংক্রান্ত অভিযোগগুলো নিয়ে তার রায় ব্যক্ত করবেন। অর্থাৎ বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে ভারতের শীর্ষ আদালত থেকে।-:মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক-( সূত্র-সমকাল)