টার্মিনাল, হাসপাতাল, বস্তিতে এডিস সবচেয়ে বেশি

1

স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক জরিপ বলছে, রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনাল, কমলাপুরের বিআরটিসি বাস ডিপো, কমলাপুর রেলওয়ে বস্তি, শাজাহানপুর বস্তি ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঘনত্ব ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রার চেয়েও চার গুণ বেশি।

আর বিভিন্ন স্থানে ফেলে রাখা পরিত্যক্ত টায়ার এ মশার সবচেয়ে বড় প্রজননস্থল বলে উঠে এসেছে জরিপে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার জরিপে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় এ বছর বর্ষায় জরিপের অতিরিক্ত হিসেবে ৩১ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে ঢাকার ১৪টি এলাকায় এই জরিপ চালানো হয়েছে।

যার ফলাফল রোববার স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। নিয়মিত জরিপগুলোতে এই অধিদফতর সাধারণত বহুতল ভবন, আবাসিক এলাকা, ফাঁকা জায়গা ও নির্মাণাধীন ভবনে মশার ঘনত্ব জানার চেষ্টা করে।

কিন্তু জনবহুল এলাকায় মশার বিস্তারের ধরন বুঝতে রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কীটতত্ত্ববিদদের চারটি দল পাঁচ দিন ধরে ১৪টি এলাকায় এই চরিপ চালিয়েছে।

মূলত বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন, বস্তি এলাকা, মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকা, পুলিশ লাইনস ও হাসপাতাল এলাকাকে এই জরিপের জন্য বেছে নেয়া হয়।

জরিপের ফলাফলে দেখা যায়, ওই ১৪টি স্থানের মধ্যে ১২টিতেই ব্রুটো ইনডেক্স ঝুঁকিপূর্ণ মাত্রা বা ২০ এর বেশি।

রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মশার প্রজনন উৎস হিসাব করে এ জরিপ চালানো হয়। প্রতি একশ প্রজনন উৎসের মধ্যে ২০টি বা তার বেশিতে যদি এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা পাওয়া যায়, তাহলে সেটাকে ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি বলা যায়।

জরিপে দেখা যায়, মহাখালী বাস টার্মিনাল, কমলাপুরের বিআরটিসি বাস ডিপো, কমলাপুর রেলওয়ে বস্তি, শাজাহানপুর বস্তি ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ৮০ বা তার বেশি।

এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, গাবতলী বাস টার্মিনাল, মিরপুর ১২ নম্বরে বিআরটিসির বাস ডিপোতে ব্রুটো ইনডেক্স ৬০ থেকে ৮০ এর মধ্যে।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, মহাখালীর কড়াইল বস্তি আর মিরপুর ১২ নম্বরে মেট্রো রেল প্রকল্প এলাকায় ব্রুটো ইনডেক্স ৪০ থেকে ৬০ এর মধ্যে।

ঢাকার বাস টার্মিনাল ও ডিপোগুলোতে ঘুরে যত্রতত্র পরিত্যক্ত টায়ার এবং পানিভর্তি প্লাস্টিকের আধার পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যেগুলোতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে ব্যাপক হারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, এডিস মশা গড়ে তিনশ মিটারের বেশি উড়তে পারে না। তবে কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে তারা বহুদূরেও পৌঁছাতে পারে। তেলাপোকা এভাবেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বাস ডিপোতে রাখা একটা বাস বা এয়ারপোর্টে রাখা একটা এয়ারক্রাফট বা অন্য যে কোনো বাহনের দরজা খুললে মশাটা সেখান গিয়ে আশ্রয় নিল। যানবাহনে রাখা একটা বালতিতে মশা ডিম পাড়ল, সেই বালতিটা চলে গেল শহরের বাইরে। সেখানে গিয়ে পানি পেয়ে ডিম ফুটে মশা জন্ম নিল। এটাকে বলা হয় ডিসপারসন অব অ্যানিমেল।

আর এ কারণে কোরবানির ঈদের সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যানবাহনে করে চলে যাওয়া এডিস মশার কারণে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গু আরও বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করে আসছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। কীটতত্ত্ববিদ ও সিভিল সার্জনরা ঢাকা ছাড়ার আগে যানবাহনগুলোকে মশামুক্ত করার ওপর জোর দিচ্ছিলেন।

এদিকে দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০ হাজার ছাড়িয়েছে। সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আরও দুই হাজার ৩৩৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন।

আগের তিন দিনের তুলনায় নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার হার বেড়েছে। তবে ঢাকা মহনগরীতে সংক্রমণ কমেছে। রাজধানীর বাইরে ডেঙ্গুতে নতুন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বেড়েই চলছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলেন, ঢাকার বাইরে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়লেও সেটা আশঙ্কাজনক নয়।

তিনি বলেন, লোকজন ঈদের ছুটিতে ঢাকার বাইরে যাওয়ায় ঢাকায় রোগী ভর্তির সংখ্যা কমছে। আর সারাদেশে তুলনামূলকভাবে বেড়েছে, তবে তা আশঙ্কাজনক বলা যাবে না।

এই চিকিৎসক বলেন, ঢাকার বাইরে যেহেতু এডিস মশা কম। সে কারণে আক্রান্তদের কাছ থেকে ডেঙ্গু ছড়ানোর আশঙ্কা কম। এ কারণে আমরা আশা করছি, সেপ্টেম্বর নাগাদ রোগীর সংখ্যা অনেক কমে যাবে।

জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সবগুলো হাসপাতালের চিকিৎসকের প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেয়া আছে জানিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে সমস্যা হবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট সকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে ৪১ হাজার ১৭৮ হয়েছে। এর মধ্যে অগাস্ট মাসের প্রথম ১০ দিনেই ২২ হাজার ৭১৭ জন মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

সরকারি হিসেবে, চলতি বছর এপ্রিলে ৫৮ জন, মে মাসে ১৯৩ জন, জুনে একহাজার ৮৮৪ জন ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। জুলাই মাসে তা এক লাফে ১৬ হাজার ২৫৩ জনে পৌঁছায়।

আর অগাস্টের প্রথম ১০ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২২ হাজার ৭১৭ জন ডেঙ্গু রোগী।

সরকার চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৪০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করলেও সংবাদমাধ্যমে আসা সংখ্যা এর কয়েক গুণ বেশি।

সুচিকিৎসার অভাবে আক্রান্ত রোগীর প্রাণহানি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। এ অবস্থায় বাড়িতে না যাওয়াই ভালো।

কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার কামড় খেয়ে জ্বর নিয়ে কেউ গ্রামে গেলে এবং ওই আক্রান্ত ব্যক্তিকে গ্রামের মশা কামড়ালে সেই মশার মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রমিত হয়ে অন্যরাও এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সে কারণে জ্বর নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে যাওয়া মানে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়া।

তিনি বলেন, আমরা দেশের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসারত ডেঙ্গু রোগীদের বিষয়ে জানতে পেরেছি, বেশির ভাগের ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে বাড়িতে গিয়ে ডেঙ্গু ধরা পড়ছে। এ কারণেই আমরা আসন্ন ঈদে রাজধানীবাসী যাদের শরীরে জ্বর থাকবে তাদের গ্রামে ঈদ করতে না যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।-যুগান্তর