রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব

0

মামুনুর রশীদঃ যে ব্রিটিশ শাসকরা এ দেশে পশ্চিমা আইন প্রণয়ন করেছেন- তারা সবসময়ই বলতেন, জাস্টিস ডিলেইড জাস্টিস ডিনাইড অর্থাৎ বিচার কার্য বিলম্বিত হলেই বিচার অস্বীকৃত হয়। কিন্তু সেই শাসকগোষ্ঠী ১৮৯৮ সালে সিআরপিসি প্রণয়ন করে এবং প্রণীত সিআরপিসি অনুযায়ী বিচার কার্য সম্পাদন করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টরকে ইনভেস্টিগেটিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া থেকে শুরু করে, চার্জশিট গঠন, সাক্ষ্য গ্রহণ করার পর মামলার রায় এবং রায়-পরবর্তী আপিলের সুযোগ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত বিচারের ফলাফল পেতে দীর্ঘ সময় লেগে যাওয়াই স্বাভাবিক। আবার পশ্চিমা আইন এ কথাও বলে, দশজন দোষী ছাড়া পাক; কিন্তু একজন নির্দোষ যেন শাস্তি না পায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, এমনকি আমাদের দেশেও বিনা বিচারে দীর্ঘ সময় জেল খাটার নজির রয়েছে।

আইনি প্রক্রিয়া কালে কালে জটিল হয়েছে; কিন্তু স্বাধীন দেশে আইনের কোনো বড় সংস্কার হয়নি। জেলায় জেলায় আদালতের অবকাঠামো অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন জজকোর্টগুলো বহুতল দালানে অবস্থান নিয়েছে। শোনা যায়, বিচারকদের সংখ্যা আরও বাড়ানো দরকার। কোর্টগুলোতে আইনজীবীদের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে গেছে। কোর্ট প্রাঙ্গণে তাদের জায়গা দেওয়াও কঠিন। অধিকাংশ মামলার বিষয় জনসমক্ষে আসে না। বাদী-বিবাদী, আইনজীবী ও বিচারকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। সামান্য কিছু চাঞ্চল্যকর মামলার বিষয় সাধারণ্যে প্রকাশ পায়। সম্প্রতি নুসরাত হত্যা মামলা তেমনি সাধারণ মানুষের আলাপ-আলোচনা এবং চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিডিয়ার তৎপরতা এবং ধাপে ধাপে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বিষয়টি দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট। কিন্তু আইন তার নিজস্ব পথেই এগোচ্ছে। এর পরেই যে বিষয়টি বড় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে সেটি হচ্ছে বরগুনার রিফাত হত্যা। বরগুনায় প্রকাশ্য দিবালোকে রিফাতকে নয়ন বন্ড ও তার সাথিরা কুপিয়ে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ড কোনো গোপন বিষয় ছিল না, শত শত ভীরু পথচারীর সামনে ঘটনাটি ঘটেছে। ভীরু পথচারীরা সন্ত্রাসীদের ভয়ে কোনো প্রতিরোধের চেষ্টা চালায়নি। তবে তাদেরই কেউ কেউ ফোন-ক্যামেরায় ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করেছে। আমরাও ভীরু গৃহবাসীরা তা অবলোকন করেছি। তার স্ত্রী ফেরানোর চেষ্টা করেছে, সেটিও আমরা দেখেছি। প্রধানমন্ত্রীও পুলিশ প্রশাসনকে আসামিদের ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরপরই বন্দুকযুদ্ধে প্রধান অভিযুক্ত নয়ন বন্ড নিহত হয়। স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নিকে প্রথম সাক্ষী হিসেবে মামলায় দেখানো হলেও সে বিবাদী হয়ে ওঠে। মামলার গতিপথ ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত হয়। ঘটনার অতীত খোঁজাখুঁজি শুরু হয়।

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির প্রাক্তন প্রেমিক ও স্বামী, বর্তমান প্রেমিক ও স্বামী এবং তার মধ্যে নানা ধরনের সম্পর্কের টানাপড়েন খুঁজে বের করা হয়। মামলার স্বার্থে এসব প্রয়োজনীয়, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রকাশ্য দিবালোকে যে খুনটি হলো, ওইসব ঘটনায় কি তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে? আগে খুনের মামলা নাকি মিন্নির কর্মকাণ্ডের বিচার? যদিও জনমত বিচারকে প্রভাবিত করা উচিত নয়, তবুও প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন সারাদেশে এই হত্যার বিরুদ্ধে জনগণ যেভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল, তার মূল্য কি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে উপেক্ষিত হবে? এর মধ্যে স্থানীয় সাংসদ এবং প্রভাবশালী নেতা ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভুর ছেলে নানাভাবে জড়িয়ে গেছেন- এই অভিযোগ উঠেছে, কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সাংসদপুত্র এবং সরকারি দলের নেতাকে এখনও কোনো আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়নি- এই প্রশ্নও উঠেছে, উঠছে। সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভুর তৎপরতা নিয়েও কথা উঠেছে। একজন আইনজীবীও প্রথম দিকে মিন্নির পক্ষে দাঁড়াননি। এও শোনা গেছে, পরে একজন আইনজীবী সাংসদের সঙ্গে আলোচনার পর কোর্টে দাঁড়িয়েছেন। এই যে এত আইনজীবীর মধ্যে কেউ দাঁড়ালেন না, এটি এক বিস্ময়কর ঘটনা! যেখানে যে কোনো চিহ্নিত সন্ত্রাসীর পক্ষেও আইনজীবীর অভাব হয় না, সেই দেশে একটি অত্যন্ত জনগুরুত্বপূর্ণ মামলায় একজন আইনজীবীও সাহস দেখালেন না! নয়ন বন্ডের ভয়ে এখনও বরগুনার বিবেকবান আইনজীবীরা অন্য মামলায় ব্যস্ত রইলেন; কিন্তু এই কোর্টের কাছেও আসতে সাহস পেলেন না। অবশ্য খবরের কাগজে জানা গেল, ৪০ জন আইনজীবী ঢাকা থেকে বরগুনা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যারা মিন্নিকে আইনি সহায়তা দেবেন।

বরগুনার আইনজীবীরা কি বার কাউন্সিলের সনদপত্র নেননি? বার কাউন্সিল কি এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না? যেসব দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সেখানে অনেক সন্ত্রাসী আইনের আওতায় আসে না; এলেও নানা ফাঁকফোকরে জামিন নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান হচ্ছে পুলিশের। পুলিশের তৎপরতা আমরা দেখেছি নুসরাত হত্যা মামলায়। থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন কী নিষ্ঠুরভাবে নুসরাতকে জেরার নামে মানসিকভাবে অত্যাচার করে তার সেই ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল করে দিয়েছিল। যদিও সেই ওসিকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। একটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত এবং হত্যাকারীকে ওই মুহূর্তেই আইনের আওতায় আনা জরুরি ছিল; কিন্তু তা না করে ওসি মোয়াজ্জেম মেয়েটির দিকে দৃষ্টিপাত করল এবং ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এসপি বিষয়টির গভীরে না গিয়ে ওসিকে সমর্থন করার চেষ্টা করল। নুসরাত হত্যার বিচারকাজ চলছে। এই বিচারকে বিভ্রান্ত করার জন্য তৎপরতা থাকলেও আইন তার নিজস্ব গতিতে এগোচ্ছে। কিন্তু বিচার কবে সম্পন্ন হবে, তা অনিশ্চিত। আমরাও যেহেতু স্বল্প স্মৃতির মানুষ, সেহেতু ভুলে যাব এবং আরেকটি নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সংবাদে আরও বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে যাব। আইনের ভাষায় হেইনাস মার্ডার, এ ধরনের খুনের তদন্তের জন্য পুলিশের সংস্থাও আছে। সাধারণত সিআইডি এসব মামলার তদন্তভার গ্রহণ করে থাকে। স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে এই দায়িত্ব দেওয়া হতো না; কারণ তারা এলাকার ক্ষমতাবানদের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে।

মিন্নির বাবা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করেছেন। এই অনুরোধ যথার্থ। দেশে বহুদিন আগেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল হয়েছে; এই ট্রাইব্যুনালগুলো বিচারকাজকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে গঠন করা হয়েছে। আমরা যথার্থই বলে থাকি, বিচারহীনতার একটা অপসংস্কৃতি চলছে। বিচার বিলম্বিত হলে জনগণ তা মনে রাখতে পারে না। কিন্তু যদি দ্রুত বিচার করে জনসমক্ষে বিষয়গুলো আনা যায়, তাহলে বিচারের বিলম্বের বিষয়টি আর আলোচিত হবে না। ভাওয়াল রাজার বিচারের বিষয়টি অনেক বছর লেগে গিয়েছিল; ততদিনে ভাওয়ালের দাবিদার মধ্যম কুমার মারাও গেছেন। দেখা যায়, অনেক সাক্ষী বিচারের বিলম্বের কারণে মৃত্যুবরণ করেছেন, মত বদলেছেন এবং নানা ধরনের চাপের মুখে ভিটাছাড়া হয়েছেন। সমগ্র বিষয়টি বিচার বিভাগের বিবেচনার ওপরই নির্ভর করে। ইদানীং প্রকাশ্য খুন এবং ধর্ষণ বাড়ছে, সেইসঙ্গে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের গুজব। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে একটি নাটক লিখেছিলাম, একটি সেতুর গল্প। সেই নাটকেও ছিল নদীতীরে এক বটবৃক্ষের নিচে এক কাপালিক সন্ন্যাসী বলত, নদীতে রক্ত দিতে হবে, নরমুণ্ড চাই, না হলে সেতু হবে না। মণকে মণ দুধ ফেলা হয়েছিল নদীতে। গুজবের কারণে সেতুটি অনেক বছর ধরে নির্মিত হয়নি। কিন্তু একজন সাহসী ইঞ্জিনিয়ার সেতুটি নির্মাণ করে ফেললেন এবং ওই সন্ন্যাসীর লোকেরাই ইঞ্জিনিয়ারকে নদীতে ফেলে হত্যা করে। ৩৬ বছর পর আলোকিত বাংলাদেশে সেই প্রাচীন গল্পটি আবার ফিরে আসতে পারে, তা কল্পনারও অতীত। তার মানে ওই সন্ন্যাসীর ভূতরা রাজনীতির অনেক কানাগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিন্নি বা নুসরাতের অতীত জানার চেয়ে বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে নয়ন বন্ডদের উত্থান। এই উত্থান সারাদেশেই হচ্ছে এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়। এই বন্ডরা আবার ক্ষমতার পালাবদলে আরেক ধরনের ছত্রছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। এই প্রক্রিয়া বহুদিন ধরে চলছে। এর সমাধান পুলিশ প্রশাসন বা বিচারব্যবস্থা নয়, সমাধানটা রাজনৈতিক দলের হাতে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. বি. চৌধুরী যখন বঙ্গভবন থেকে বিদায় নিচ্ছেন, তখন একটি কথা বলেছিলেন- ‘আমার হাতে পোলাপানরা নাই’ সে জন্যই রাষ্ট্রপতির পদ থেকেও আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাবের দৃষ্টান্ত আরও দেওয়া যাবে। রাজনৈতিক অপসংস্কৃতিতে যেসব পোলাপান যুক্ত, তাদের শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। এই পোলাপানরা বৃহত্তর অর্থে ক্যাডার হয়ে দাঁড়ায়। এই ক্যাডাররাই বিস্ময়করভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বে প্রবেশ করে। তারাও জেনে যায় তাদেরও পোলাপান প্রয়োজন এবং দু-একটি দুঃসাহসিক ঘটনা বা বেয়াদবির পর নেতাদের দৃষ্টি পড়ে তাদের ওপর। নেতা তার ছেলেকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়িয়ে বিদেশ পাঠিয়ে দেয়। আর স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পোলাপানদের ঢুকিয়ে দেয়। এই মানসিকতার যেমন পরিবর্তন দরকার, তেমনি কল্যাণকামী রাষ্ট্রের নেতৃত্বের জন্য শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসা প্রয়োজন। ফ্রাঞ্জ ফ্যাননের ভাষায়, এরাই হচ্ছে রেচড অব দ্য আর্থ- মানে পৃথিবীর হতভাগ্য, যাদের পরিণতি হয় নয়ন বন্ডদের মতো নিঃসঙ্গ অপমৃত্যু।-লেখকঃসাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।-(সূত্র: সমকাল)