রহস্যের নাম; নামের রহস্য!!!

5

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বাংলা গল্প কিংবা উপন্যাসে আমার শোনিমের বেশ আগ্রহ আছে বলেই মনে হয়। বিশেষ করে সাইন্স ফিকশান কিংবা ভুতের গল্পে। এসব পড়ে ও খুব মজা পায়। এমন বই হাতের কাছে পেলে কিনেই ছাড়ে। বিশেষ করে একুশে বই মেলা থেকে পছন্দের নানা বই কেনে। মেলাও তার ভারি পছন্দ। ইতিমধ্যেই সংগ্রহে বেশ ভাল বইই জমেছে। ইংরেজী মিডিয়ামের ছাত্র হলেও বাংলার প্রতি ওর আলাদা টান। ঘুমুতে যাবার আগে একটা না একটা বই নিয়ে বিছানায় যাবেই। শোনিম বিছানায় যাবে, কিন্তু সংগে জাফর ইকবাল, আনিসুল হক কিংবা হুমায়ুন আহমেদ যাবে না; তা হতেই পারে না!
শোনিম কোন কিছু পড়তে যেয়ে যখন খুব মজা পায়, তখন আর ঘুমুতে পারে না। খুব হাসে। একা একাই হাসে। প্রথমে মুচকি হাসে। মাথা নিচু করে বই পড়ে আর ঠোঁট বাঁকিয়ে মুচকি হাসে। পরে একটু একটু শব্দ করে হাসে। সময় যায় আর শব্দের মাত্রা বাড়ে। মজার মাত্রাটা বেশী হলে শব্দের মাত্রাটাও বেড়ে যায়। খিটখিটিয়ে হাসা শুরু করে। মাত্রাটা আরো বেশী হলে কেবল খিটখিটিয়েই হাসে না; দৌঁড়ে আমার কাছে চলে আসে। হাসতে হাসতে আমার উপরে এসে পড়ে। হাসিটা আর নিজের মধ্যে রাখতে পারে না।
সেদিনও এমনটি করলো। আব্বু! দেখ কি লিখছে, বলে দৌঁড়ে আমার কাছে আসলো। তবে বই নিয়ে নয়। মোবাইল নিয়ে। মোবাইলটা আমার হাতে দিয়ে আর দাঁড়ায়নি; হাসতে হাসতেই আবার দৌঁড়। এমনিতে ওর মোবাইল ধরা নিষেধ। কঠিন আইন; মোবাইল ধরা যাবে না। তবুও সুযোগ কিংবা ফাঁক পেলেই হলো। টুপ করে ধরে বসবে। শত নিষেধের পরও ধরবে। আমাকে বা ওর মাকে একটু ব্যস্ত দেখলেই ধরে। তবে সচারচর আম্মুরটা ধরে না। এ ব্যাপারে আম্মু বেজায় কঠিন। ধরা পড়লে রক্ষে নেই। কঠিন শাস্তি খেতে হয়। তাই আমারটা ধরে।
আমার মোবাইলে ওর দেখানো পুরো টপিক্সটা পড়ে আমিও হাসলাম। তবে ওর মত খিটখিটিয়ে নয়; মুচকি হাসলাম। দেখলাম, বিষয়টি খুব জটিল বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। হালকা রসিকতার বিষয়। তবুও বিষয়টি আমারও মনে ধরলো। তাই কেবল হাসলামই না; বিষয়টা নিয়ে একটু চিন্তাও করলাম। যদিও আগামাথা কিছুই পেলাম না। জাষ্ট ফান মনে হলো। ফানি টপিক্সের টাইটেলটাও দারুণ; “চুলকানি উপশমের জন্য দেশের সব ফার্মেসীতে যত ধরনের ঔষধ আছে তার প্রায় সবগুলোর নাম মেয়েদের নামে কেন?” আমি একটা একটা মেডিসিনের নাম পড়ছি আর হাসছি। আসলেই তো! ব্যাপারটা এমন কাকতালীয় হলো কেমন করে! কোম্পানি ভেদে চুলকানির ঔষধের নাম ভিন্ন। কিন্তু মিল শুধু কেবল এক জায়গায়। সবই মেয়েদের নামে; রুপা, দিপা, রুপমা, ওনি, রাভিয়া, আফরিন, জেরিন, নওশিন। কোনটার কথা বলবো! সবই চুলকানির মেডিসিন। জব্বার, কাদের, ফিরোজ, আবুল, নজরুল, হারিস, জাহিদ, জামাল নামে একটা মেডিসিনও পেলাম না। কেবল চুলকানি নয়, কোন অসুখের মেডিসিনের নামেই পেলাম না।
বিষয়টি রহস্যময় মনে হলো। খুব জটিল রহস্য হয়তো নয়। এবং খুব গবেষণা করে এমনটি হয়েছে বলেও মনে হয়নি। হলে এমনি এমনিই হয়েছে। বাঙ্গালী সমাজ নাম রাখার ক্ষেত্রে উদাসীন। খুব যে ভাবনা চিন্তা করে না এর ভুরিভুরি প্রমাণ আছে। ব্রহ্মপুত্রের পাড়ের এক চরের নাম ‘চর কোমরভাঙা’। কারো একজনের চলতে যেয়ে কোমর ভেঙেছিল বলেই কি এই নাম? হতে পারে। বাজারের নাম ‘ফুডাংগির বাজার’ও হয়ত কারো বিশেষ ফুডাংগিরি করার কারণেই হয়েছে। মুশকিল হলো ফুডাংগিরি শব্দের অর্থ ক’জনাই বা বোঝে বা জানে!
বাঙালী হয়েও অনেক বাংলা শব্দের অর্থও আমরা বুঝি না। এর ব্যবহারও ঠিক জানি না। শুধু নাম রাখা নয়, শব্দ চয়ন কিংবা এর প্রয়োগেও কখনই সাধারণ নিয়মনীতির ধার ধারি না। একই শব্দ স্থানভেদে ভিন্ন অর্থ বহন করে। কিংবা ভিন্ন অর্থের শব্দগুলোও স্থানভেদে ভুল অর্থে পরিণত হয়। কিংবা প্রথমে চালু করা শব্দগুলো সময়ের বিবর্তনে বদলাতে বদলাতে এমন রূপ ধারন করে যে শুরুর সংগে শেষের সামান্য মিলও থাকে না। শব্দ চয়নে বাঙালী সকল সময় কেবল সহজ উচ্চারণটাই বেছে নেয়। অর্থের তোয়াক্কা করে না।
ঢাকার ভুতের গলি বলে যে জায়গাটা আমরা চিনি এবং জানি, সেটা আসলেই কি ভুতের গলি? মানে, গলিতে ভুতের বসবাস? ওখানে কি ভুত থাকে কিংবা কোনকালে থাকতো? বাস্তবে মোটেই তা নয়। এখানে কোনকালেও ভুত থাকার কোন ইতিহাস নেই। তবে বুট থাকার ইতিহাস আছে। এখানে এককালে বুট থাকতো। বিদেশী ভদ্রলোক মিঃ বুট। তাই এটা বুট এর গলি। বুট একজন ব্রিটিশ ছিলেন, যার নামে গলির নামকরণ করা হয়েছিলো। বাঙালী কত সহজে ব্রিটিশ বুট সাহেবকে বাঙালী ভুত বাবু বানিয়ে দিলো!
বাঙালী কী না পারে! নারায়ণগঞ্জের গেন্ডারিয়া জীবনে কত বার গিয়েছি হিসাব নেই। আজ জানলাম এটা গেন্ডারিয়া নয়; এটা গ্র্যান্ড এরিয়া। ব্রিটিশ আমলে সমাজের উঁচু স্তরের মানুষদের বসবাস ছিলো এই এলাকায়। তাই এলাকাটি পরিচিতি পেয়েছিলো গ্র্যান্ড এরিয়া নামে। ব্রিটিশকুল এই নামেই নামকরণ করেছিলো এলাকাটির। বাঙালী এটাকে সহজ করে তার মত করে নিয়েছে। সারা বাংলায় বহুল পরিচিত আখের ভিন্ন নাম গেন্ডারিয়ার সাথে মিলিয়ে সেই যে গেন্ডারিয়া নামকরণ করলো, আজ অবধি সেটাই চলছে।
আমি পড়ি আর অবাক হই। অবাক হই মহাখালী নামটি নিয়েও। ঢাকার মহাখালীকে চেনে না এমন মানুষও কি আছে? একজনও নেই। নামটি বহুল পরিচিত এবং যথেষ্ঠ সমাদৃত একটি শব্দ। জীবনে মহাখালী রেললাইনে কতটা পথ হেঁটে গিয়েছি মনে নেই। দুই পাশের বস্তি ডিঙ্গিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা তেজগাঁও রেল স্টেশনে পৌঁছেছি। কিন্তু নামটি নিয়ে একবারও ভাবনা মাথায় আসেনি। ঘাটাঘাটি করতে যেয়ে আজ জানলাম এটাও মহাখালী নয়; মহা কালী। এই এলাকায় বিখ্যাত কালী মন্দির বানানোর পর এই নামকরণ করা হয়েছিলো।
কালের বিবর্তনে বাঙালী নিজের মত করে পাল্টে নিয়েছে। সব সময়ই নেয়। সব সময় সবকিছু সহজ বোধগম্য করে নেয়। বাংলা ভাষার একটি অতিপরিচিত শব্দে পরিণত হয়েছে ব্রাশফায়ার। কিন্তু এটি একটি ভুল শব্দ। ইংরেজী ভাষায় এরকম কোন শব্দই নেই। শব্দটির উচ্চারণ হবে বার্স্টফায়ার। স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করে এলোপাথাড়ি অনবরত গুলি করাকে সামরিক পরিভাষায় বার্স্টফায়ার বলে।
আধুনিক অস্ত্রের স্বয়ংক্রিয়ভাবে গুলি করার অসাধারণ ক্ষমতা রয়েছে। একটি এম ১৩৪ মিনিগান প্রতি মিনিটে অবিশ্বাস্য ৬ হাজারটি পর্যন্ত গুলি করতে পারে! বার্স্টফায়ার বা বার্স্ট মোড হচ্ছে এমন এক পদ্ধতি, যার মাধ্যমে একজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি একবার ট্রিগারে চাপ দিয়ে প্রচুর পরিমাণ গুলি করতে পারেন। হাতে ধরা যায় এমন অস্ত্রে সাধারণত এক বার্স্টে ৩টি, বিমান বিধ্বংসী বন্ধুক ও অটোক্যাননে শতাধিক গুলি এই পদ্ধতিতে করা যায়। অথচ এই মারাত্মক শব্দটিও বাঙালী কত সহজে পাল্টে দিল। একটু ভয়ও করলো না।
ভয় করবে কেন? ভয় পেয়ে কি লাভ? শব্দের অর্থের নিজেরই তো মাঝেমধ্যে আগামাথা থাকে না। একই শব্দ জায়গা ভেদে ভিন্ন অর্থ কিংবা জাষ্ট উল্টো অর্থ প্রকাশ করে। সামান্য একটা শব্দ ঝড়ৎৎু। খুব সামান্য তার অর্থ। প্রায়োগিক বিষয়টিও সামান্য। অথচ এই শব্দটিও সব জায়গায় এক অর্থ প্রকাশ করে না। কি অদ্ভুত তাই না! ঝড়ৎৎু শব্দটা সাধারণ মানুষ বললে সবাই খুশি। কেননা, ঝগড়ার সমাপ্তি; কেচালের শেষ। আর ডাক্তার বললে! জীবনটাই শেষ!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।