অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ব্যবহার কমছে না

2

মুনিরউদ্দীন আহমেদঃ ২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীর ১১৪টি দেশে পরিচালিত গবেষণার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উদ্বেগের সঙ্গে বলা হয়েছে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় এখন আর কোনো ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ব্যাপার নয়।

এখনই, এ মুহূর্তে বিশ্বের প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সব বয়সের সব মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের শিকার হওয়ার প্রবল হুমকির মধ্যে রয়েছে। ‘অ্যান্টিমাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্স : গ্লোবাল রিপোর্ট অন সার্ভেইলেন্স’ (জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন : কড়া নজরদারির ওপর বিশ্ব প্রতিবেদন) শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অসংখ্য সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী অসংখ্য জীবাণু বেশিরভাগ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে।

প্রতিবেদনে ডায়রিয়া, কলেরা, নিউমোনিয়া, মূত্রনালির সংক্রমণ, গনোরিয়া, সেপসিস (রক্তের সংক্রমণ)-এর মতো সাধারণ থেকে শুরু করে খুব মারাত্মক সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুর ওপর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের ফলাফল প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে প্রকাশিত ফলাফল খুব উদ্বেগ ও আতঙ্কজনক। কারণ প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনকারী বহু জীবাণুর বিরুদ্ধে শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচিত খুব কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকগুলোও এখন কার্যকারিতা হারাতে বসেছে।

কার্বাপেনেমকে এতদিন একমাত্র নন-রেজিস্ট্যান্ট শতভাগ কার্যকর শেষ অবলম্বন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে গণ্য করা হতো। জীবন বিপন্নকারী অন্ত্রের জীবাণু ক্লেবসিলা নিউমোনি কার্বাপেনেমের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করে দিয়ে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে।

ক্লেবসিলা নিউমোনি হাসপাতালে নিউমোনিয়া, সেপসিস, নবজাতকের সংক্রমণ এবং জরুরি বিভাগে চিকিৎসারত বিপন্ন রোগীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়ানোর মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু দেশে রেজিস্ট্যান্সের কারণে কার্বাপেনেম ক্লেবসিলা নিউমোনিতে আক্রান্ত ৫০ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করে তুলতে ব্যর্থ হচ্ছে।

মূত্রনালির সংক্রমণের জন্য দায়ী গ্রাম নেগেটিভ জীবাণু ই. কোলাইয়ের বিরুদ্ধে বহুল পরিচিত সিপ্রোগ্রুপের (ফ্লোরোকুনোলন) অ্যান্টিবায়োটিকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এখন আর কাজ করছে না। ১৯৮০ সালে বাজারে আসা সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনের পরিমাণ ছিল শূন্য। এখন পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় সিপ্রোগ্রুপের ওষুধগুলোর কার্যকারিতা ৫০ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে।

গনোরিয়া চিকিৎসায় শেষ অবলম্বন হিসেবে পরিচিত তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধগুলো এখন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জাপান, নরওয়ে, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন এবং যুক্তরাজ্যের গনোরিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা বিশ্বে দশ লাখ মানুষ গনোরিয়ায় আক্রান্ত হয়।

জীবাণু কীভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের কর্মক্ষমতাকে নিষ্ফল করে দিয়ে বহাল তবিয়তে বেঁচে থাকতে পারে তা নিয়ে অনেকেরই প্রচণ্ড আগ্রহ আছে। এ বিষয় নিয়ে সংক্ষেপে এখানে একটু আলোচনা করা যেতে পারে। বিশেষ কোনো এনজাইম অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতে (structure) এমন কোনো রাসায়নিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে যার কারণে অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ে।

এনজাইম দ্বারা স্ট্রেপ্টোমাইসিন রাসায়নিকভাবে এমনভাবে পরিবর্তিত হয়, যাতে করে প্রোটিন সংশ্লেষণ করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিকটি রাইবোজোমের সঙ্গে যুক্ত হতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, অনেক সময় জীবাণু এমন সব এনজাইম তৈরি করে যা অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেতকে ভেঙে দিতে সক্ষম। অ্যান্টিবায়োটিকের গাঠনিক সংকেত ভেঙে গেলে অ্যান্টিবায়োটিক নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। যেমন- বিটালেকটামেজ এনজাইম পেনিসিলিনেইজ পেনিসিলেনের বিটালেক্টাম রিংকে ভেঙে দেয়ার কারণে পেনিসিলিন অকার্যকর হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, কোনো কোনো জীবাণু আছে যেগুলো জন্মগতভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সংবেদনশীল নয়। যেমন- গ্রাম নেগেটিভ জীবাণুগুলোর কোষ প্রাচীর এমন জটিলভাবে তৈরি যার প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক কোনোভাবেই কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারে না।

চতুর্থত, জেনেটিক মিউটেশনের (জিনের রাসায়নিক পরিবর্তন) মাধ্যমে অনেক জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে। কোটি কোটি জীবাণুর মধ্যে যে কোনো একটি যদি মিউটেশনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে যায়, সেই জীবাণু পরবর্তী সময়ে বংশবৃদ্ধি ও বিস্তারের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।

এসব জীবাণু পরিবর্তিত জিনকে অন্য জীবাণুতে ট্রান্সফার করার মাধ্যমে রেজিস্ট্যান্স জীবাণুর ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। এসব জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত কোনো রোগী তখন কোনো অ্যান্টিবায়োটিকের দ্বারা সংক্রমণমুক্ত হয়ে আরোগ্য লাভ করে না।

ফলে রোগীর ভোগান্তি বাড়ে নতুবা কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের অভাবে অসহায়ভাবে মৃত্যুর কবলে পতিত হয়। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে মানুষ দীর্ঘদিন রোগে ভোগে এবং মৃত্যুহার অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, মেথিসিলিন রেজিস্ট্যান্ট স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস দ্বারা আক্রান্ত রোগীরা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেনি এমন জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত রোগীর চেয়ে ৬৪ শতাংশ বেশি মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে দীর্ঘসময় রোগীকে হাসপাতালে থাকতে হয় এবং ভুগতে হয় বলে চিকিৎসা ব্যয়ও সমানতালে বেড়ে যায়। তাই যে কোনো মূল্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিহত করতে হবে, নিতে হবে যথাযথ সমন্বিত পদক্ষেপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ করার জন্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশের প্রতিটি সরকার, প্রত্যেক চিকিৎসক, রোগী, মানুষ, স্বাস্থ্যকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানিয়েছে। কারণ, এ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানো না গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানব সভ্যতাকে চরম মূল্য দিতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বিপদ ও বিপর্যয়ের ভয়াবহতা উপলব্ধি করে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে এগিয়ে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং বাস্তবসম্মত বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সুপারিশ পেশ করেছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের যথাযথ ও যুক্তিসঙ্গত ব্যবহারকে অ্যান্টিবায়োটিক স্টিউয়ার্ডশিপ বলা হয়। অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ও মানুষকে রেজিস্ট্যান্ট জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করার ও সংরক্ষণের জন্য এই সিউয়ার্ডশিপের অন্য কোনো বিকল্প নেই।

বিশ্বের কয়েকটি দেশের হাসপাতাল ও মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা সংক্রান্ত একটি গাইডলাইন প্রণয়ন করেছে যাতে করে কার্যকর ও নিরাপদভাবে জীবাণু সংক্রমণ প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা যায় এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অযৌক্তিক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বন্ধ করা যায়। প্রত্যেক সচেতন মানুষ অ্যান্টিবায়োটিক স্টিউয়ার্ডশিপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কয়েকটি উদাহরণ দিলে ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।

এক, শুধু প্রয়োজনেই অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করুন। অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করে নিজে ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন না এবং অন্যকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না। রোগের প্রকৃতি বুঝে সঠিক মাত্রায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, ৭ দিনের জন্য ৫০০ মিলিগ্রামের ১৪টি অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের নির্দেশ থাকলে নিজের খেয়ালখুশি মতো কোনোক্রমেই এর বেশি বা কম অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করা যাবে না।

দুই, সাধারণ সর্দি, কাশি, জ্বর, গলাব্যথা বা অন্যান্য ভাইরাস সংক্রমণের কারণে সৃষ্ট রোগে অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করুন। মনে রাখবেন, ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকর নয়। তিন, ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হলে আপনাকে অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিক নিতে হবে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জেনে নেয়া দরকার আপনি কোন ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত। তারপর চিকিৎসক আপনাকে সঠিক ও কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করবেন আপনার রোগ সারানোর জন্য।

আন্দাজের বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে ওষুধ প্রদান করলে সংক্রামক রোগ সারবে না, বরং রোগী অহেতুক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার শিকার হবে। চিকিৎসকদের অনেকেই অযৌক্তিকভাবে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ছাড়াই সংক্রামক রোগে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করে থাকেন। এভাবে অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান আর অন্ধকারে তীর ছোড়া একই কথা।

সে জন্য প্রত্যেক সংক্রামক রোগে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্পন্ন করে রোগীকে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করতে হবে। চার, অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স সমাপ্ত করুন।

মাঝপথে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বন্ধ করবেন না। রোগের উন্নতি হচ্ছে দেখলেও পূর্ণ কোর্স সমাপ্ত করুন। পূর্ণ কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক সেবন না করলে শরীর জীবাণুমুক্ত হয় না এবং বারবার বিরতির মাধ্যমে অপর্যাপ্ত ওষুধ সেবনের ফলে ওষুধের প্রতি জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

পরবর্তী সময়ে আর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক ওই সংক্রামক রোগে কাজ করে না। পাঁচ, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ, প্রগতিবাদী ও যুক্তিবাদী চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া আবশ্যক। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে অবহেলা বা ঝুঁকি নেয়া জেনেশুনে জীবনকে বিপন্ন করার সমতুল্য। সংক্রামক রোগে আত্মচিকিৎসা আত্মঘাতী হতে পারে। ছয়, অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো ডোজ গ্রহণ করতে ভুলে গেলে কী করা উচিত তা ফার্মাসিস্ট বা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।

সাত, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে কোর্স পূর্ণ হওয়ার পর অবশিষ্ট ওষুধ পরে গ্রহণ করার জন্য রেখে না দিয়ে ধ্বংস করে ফেলুন। তা না হলে অবশিষ্ট ওষুধ ঠিকমতো সংরক্ষণ না হওয়ার কারণে বা এক্সপায়ার ডেট পার হয়ে যাওয়ার কারণে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে যেতে পারে। আট, অন্যের জন্য প্রেসক্রাইব করা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ করবেন না।

তাতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। নয়, চিকিৎসককে কোনো রোগের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করার জন্য চাপ প্রয়োগ করবেন না। দশ, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণকালে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। এগারো, সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তার রোধে জোর সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে। সংক্রামক রোগের বাহক দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর খাবার। বিশুদ্ধ পানি ও উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব বহুলাংশে কমিয়ে আনে।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করুন। নিয়মিত সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। বিশেষ করে টয়লেট ব্যবহার করার পর এবং খাবার তৈরি ও খাওয়ার আগে। শাক-সবজি, ফলমূল খুব ভালো করে পরিষ্কার না করে খাবেন না। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত সালাদ খাওয়ার ব্যাপারে সর্তক থাকুন। সালাদ বহু সংক্রামক রোগের উৎস হতে পারে। পাকঘরের কাজের টেবিলটি সব সময় পরিষ্কার রাখুন। বারো, আপনার শিশুকে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করুন।

কোনো কোনো টিকা মানুষকে ডিপথেরিয়া ও হুপিং কফের মতো সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করে। তেরো, আপনি পেনিসিলিনের প্রতি সংবেদনশীল হলে পরীক্ষা না করে পেনিসিলিন গ্রহণ করবেন না। চৌদ্দ, শিশুদের সঠিকমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করুন। শিশুরা অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি অতি সংবেদনশীল এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বেশি ভোগে। পনেরো, অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বা প্রদানের পর রাতারাতি কার্যকারিতা আশা করবেন না। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ শুরু করতে সময় নেয় এবং সুফল পেতে কম করে হলেও দুই থেকে তিন দিন সময় লাগতে পারে।

ষোলো, সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হলে শিশুদের স্কুলে না পাঠিয়ে বিশ্রামে থাকতে দিন। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের যথাযথ নজরে রাখুন। বছরের কোনো না কোনো সময় পরিবারের সদস্যরা সর্দি, কাশি, সাধারণ জ্বর, গলাব্যথার মতো ভাইরাস রোগে আক্রান্ত হয়। শিশুরা এসব রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। শিশুদের চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলে মা-বাবা স্বভাবতই আশা করেন, তাড়াতাড়ি সুস্থ হওয়ার জন্য তাদের সন্তানকে চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক প্রদান করবেন। অনেক চিকিৎসক করেনও তাই যাতে মা-বাবা খুশি হন।

কোনো চিকিৎসক এসব রোগে অ্যান্টিবায়োটিক না দিলে মা-বাবা ক্ষিপ্ত হন এবং চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক, কফ সিরাপ, অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ প্রদান করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। কোনো চিকিৎসক তারপরও যদি ওষুধ দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন, তাহলে আপনাদের বোঝা উচিত চিকিৎসক আপনার শিশু তথা পুরো পরিবারের প্রতি এক বড় ধরনের উপকার করে আপনাদের ধন্য করেছেন। এ ধরনের চিকিৎসকের প্রতি আমাদের বিরূপ ধারণা পোষণ না করে বরং সবার সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানো উচিত।

সতেরো, বিশ্বের খ্যাতনামা ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানিগুলোকে কর রেয়াত বা পেটেন্ট সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নতুন নতুন কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে হবে। কেননা, যে অনুপাতে জীবাণুর প্রতি অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে সে অনুপাতে নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত না হলে মানবসভ্যতা আগামী দিন চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হবে।

আঠারো, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি নির্ভরশীলতা কমানোর লক্ষ্যে সংক্রামক রোগ চিকিৎসায় বিকল্প ওষুধের সন্ধানে ওষুধ বিজ্ঞানীদের তৎপর হতে হবে। সাধারণ সংক্রামক রোগের প্রতিকারে ভ্যাকসিন উদ্ভাবনের চিন্তা বিবেচনায় নেয়ার কথা আজকাল গুরুত্বসহ নেয়া হয়েছে। উনিশ, সাধারণত হাসপাতালগুলোতে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তার লাভ ঘটে বেশি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হাসপাতালগুলোতে প্রতি বছর এ ধরনের সংক্রামক রোগ প্রতিকারে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়। হাসপাতালে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি ও বিস্তাররোধ ৬ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারলে এ বিপুল ব্যয়ের এক-বৃহদাংশ অর্থের সাশ্রয় হবে। বিশ, অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসঙ্গত ব্যবহার এবং প্রয়োগ সম্পর্কে চিকিৎসক ও ভোক্তাদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে। সব দেশেই ভোক্তা ও চিকিৎসকরা ওষুধ সম্পর্কে তথ্যাবলি পেয়ে থাকেন কোম্পানি কর্তৃক প্রচারিত পক্ষপাতদুষ্ট বিজ্ঞাপন থেকে।

এ অবস্থা থেকে অব্যাহতি পেতে হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরপেক্ষ তথ্যাবলিসমৃদ্ধ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং স্ট্যান্ডার্ড ট্রিটমেন্ট গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। একুশ, নকল, ভেজাল ও নিুমানের অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। নকল, ভেজাল ও নিুমানের অ্যান্টিবায়োটিক রোগ সারাতে সক্ষম নয়, বরং এসব ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাইশ, অনুন্নত দেশে প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে ওষুধের অপব্যবহার ও যুক্তিহীন ব্যবহার অতি বেশি।

তাই সরকারকে প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তেইশ, অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার রোধকল্পে চিকিৎসক সমাজ এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। রোগীকে প্রকৃত তথ্য প্রদান, সতর্ক করা, প্রেসক্রিপশনে শুধু প্রয়োজনীয় ওষুধটি দিয়ে যৌক্তিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা দিতে পারেন শুধু চিকিৎসকরাই।

তাই আমরা আশা করব, মুনাফার ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি কমিয়ে বা বাদ দিয়ে মানবতা ও নৈতিকতার সঙ্গে চিকিৎসা প্রদানে চিকিৎসকরা সচেষ্ট হবেন।

তা না হলে অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিহীন অপব্যবহারজনিত জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতার বিস্তার লাভ অব্যাহত থাকলে আগামীতে আমরা এক চরম বিপদ ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হব। চব্বিশ, ওষুধ খাওয়ার আগে না পরে খাবেন, তা চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন।-যুগান্তর