উদ্বোধনে তোড়জোড় থাকলেও শিগগিরই মিলছে না ই-পাসপোর্ট

5

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও আতাউর রহমানঃ অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট বা ই-পাসপোর্টের উদ্বোধনে তোড়জোড় থাকলেও এখনই সব গ্রাহকের হাতে তা তুলে দেওয়া সম্ভব হবে না। গ্রাহকের কাছে তা পৌঁছাতে সময় লাগবে আরও কয়েক মাস। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট অধিদপ্তর (ডিআইপি) চলতি মাসেই এর কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের প্রস্তুতি নিয়েছে। তা সম্ভব না হলে আগামী আগস্টে ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলে জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র।

ই-পাসপোর্ট প্রকল্পের কর্মকর্তাদের আন্তরিকতায় ঘাটতি না থাকলেও নানা প্রক্রিয়াগত কারণে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সম্ভাব্য সময় কয়েক দফা পরিবর্তন করতে হয়েছে।

২০১৮ সালের ১৯ জুলাই ঢাকায় জার্মানির সরকারি প্রতিষ্ঠান ভেরিডোস জেএমবিএইচের সঙ্গে ডিআইপির ই-পাসপোর্ট সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরেই অত্যাধুনিক এই পাসপোর্ট গ্রাহকের হাতে তুলে দেওয়ার কথা জানায় ডিআইপি। তা সম্ভব না হওয়ায় চলতি বছরের শুরুর দিকে নতুন সময় নির্ধারণ করা হয়। নানা জটিলতায় এতেও পিছিয়ে যেতে হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ১ জুলাই ই-পাসপোর্টের আনুষ্ঠানিক সময় নির্ধারণ করা হলেও তা পিছিয়ে যায়। কবে তা হবে- নির্দিষ্ট করে সে সময়ও বলতে পারছে না ডিআইপি।

অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তারা অত্যাধুনিক এই পাসপোর্ট গ্রাহক পর্যায়ে বিতরণ করতে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। একেবারেই নতুন এই কার্যক্রমে নতুন নতুন প্রক্রিয়াগত সমস্যা দেখা দেয়। এরই মধ্যে অনেক কিছু গুছিয়ে আনা হয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, উদ্বোধনের পর কূটনৈতিক পাসপোর্ট বিতরণের পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে রাজধানীর উত্তরা পাসপোর্ট অফিস থেকে সীমিত পর্যায়ে সাধারণ গ্রাহককে ই-পাসপোর্ট দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এতে সফল হলে ডিআইপির সব অফিস থেকেই ই-পাসপোর্ট সরবরাহ করা হবে।

ই-পাসপোর্ট কার্যকর করতে প্রকল্পের আওতায় জার্মানি থেকে ৫০টি ই-গেট আসার কথা রয়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত এসেছে মাত্র তিনটি ই-গেট। এগুলো হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপন করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। ই-পাসপোর্ট বিতরণ করা হলেও দেশের বিমান ও স্থলবন্দরগুলোতে ই-গেট স্থাপন শেষ করা না গেলে এর সুফল মিলবে না। পাশাপাশি ইমিগ্রেশন পুলিশকেও ই-গেট বা ই-পাসপোর্ট ব্যবহারের বিষয়ে প্রশিক্ষিত হতে হবে। তাদেরও এখন পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি। পাঁচ বছর ও ১০ বছর মেয়াদি ই-পাসপোর্টের ফিও গত ৮ জুলাই পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় দেশের ৬৯টি পাসপোর্ট অফিস, বিদেশে ৭১টি মিশন, ৭২টি এসবি-ডিএসবি অফিস, ২২টি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টসহ সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোতে প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক স্থাপনের কথা রয়েছে। কিন্তু এসব কার্যক্রম এখনও পুরোপুরি শেষ করা যায়নি। এ ছাড়া প্রকল্পের আওতায় ১০০ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জার্মানিতে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চুক্তি রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া এখনও শুরু হয়নি।

অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের পূর্ণাঙ্গ রূপ দিতে তারা কাজ করছেন। ইমিগ্রেশন ব্যবস্থাপনাকে নির্ভুল, সময়সাশ্রয়ী ও সহজতর করতে শিগগিরই মানুষের হাতে মেশিন রিডেবল পাসপোর্টের চেয়েও অত্যাধুনিক ই-পাসপোর্ট তুলে দেওয়ার জন্য কার্যক্রম চলছে। এজন্য অধিদপ্তর ও প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ করে যাচ্ছেন।

ই-পাসপোর্ট প্রবর্তন ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান খান বলেন, হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে স্থাপিত ই-গেটের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। ই-পাসপোর্ট কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের জন্য তারা প্রস্তুত রয়েছেন। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের সময় চেয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

প্রকল্পের অপর এক কর্মকর্তা বলেন, এরই মধ্যে ই-পাসপোর্টের জন্য একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ডাটা সেন্টার, ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার এবং অত্যাধুনিক পার্সোনালাইজেশন সেন্টার নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী একজন গ্রাহকের ১০ আঙুলের ছাপ, মুখমণ্ডল, চোখের মণি বা আইরিশ, ডিজিটাল স্বাক্ষরসহ ৩৮ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকছে। এগুলো ই-পাসপোর্টে রক্ষিত বিশেষ ধরনের চিপে সংরক্ষণ করা হবে। ই-পাসপোর্টের বুকলেটও দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ই-পাসপোর্ট কার্যক্রম শুরু হলেও মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট বা এমআরপি কার্যক্রমও চলবে। তবে নতুন গ্রাহকদের ই-পাসপোর্টের আবেদন করতে হবে। তা ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ এমআরপির পরিবর্তে ই-পাসপোর্ট দেওয়া হবে।

বিশ্বে ১১৮টি দেশে অত্যাধুনিক ই-পাসপোর্ট চালু রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে অত্যাধুনিক এই ই-পাসপোর্ট প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। পরের বছর ‘ই-পাসপোর্ট প্রবর্তন ও স্বয়ংক্রিয় বর্ডার কন্ট্রোল ব্যবস্থাপনা’ নামে ৪ হাজার ৬ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় জার্মানির সঙ্গে জিটুজি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।-সমকাল