অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে ইংল্যান্ড

2

কিরনঃ শুরুতেই চাপে রাখে ইংল্যান্ড। ইংল্যান্ডের ব্যাটিংটা ছিল দারুন।দাঁড়াতে পারেনি শক্তিধর অস্ট্রেলিয়া। দীর্ঘ ২৭ বছর পর ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠলো ইংল্যান্ড। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে নিজ মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠেছিলো ইংল্যান্ড। অবশেষে ২৭ বছর পর আবারো নিজ মাঠেই ফাইনালে উঠলো ইংলিশরা। আজ দ্বাদশ বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ইংলিশরা ৮ উইকেটে হারায় বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে। এই জয়ে ১৯৯২ সালের পর বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ইয়োইন মরগানের দল।
বার্মিংহামের এজবাস্টনে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে ৪৯ ওভারে ২২৩ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া। জবাবে ১০৭ বল বাকী রেখে ২ উইকেটে ২২৬ রান তুলে ফাইনাল নিশ্চিত করে ইংলিশরা। ফাইনালে আগামী ১৪ জুলাই লর্ডসে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।
টস জিতে প্রথমে ব্যাট হাতে নেমেই মহাবিপদে পড়ে অস্ট্রেলিয়া। ৬ দশমিক ১ ওভারে ১৪ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে বসে তারা। ১০ রানের মধ্যে দুই ওপেনার অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ ও ডেভিড ওয়ার্নারকে তুলে নেন ইংল্যান্ডের দুই ডান-হাতি পেসার জোফরা আর্চার ও ক্রিস ওকস। অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চকে শূন্য হাতে আর্চার ও ওয়ার্নারকে ৯ রানে বিদায় দেন ওকস।
দুই ওপেনারের বিদায়ের কিছুক্ষণ পর প্যাভিলিয়নে ফেরেন মিডল-অর্ডার ব্যাটসম্যান পিটার হ্যান্ডসকম্ব। ৪ রান করে ওকসের দ্বিতীয় শিকার হন হ্যান্ডসকম্ব।
দ্রুত ৩ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন সাবেক অধিনায়ক স্টিভেন স্মিথ ও ক্যারি। তবে অষ্টম ওভারের শেষ বলে আর্চারের দ্রুত গতির এক বাউন্সার ক্যারির হেলমেটের নিচে থুতনিতে গিয়ে আঘাত করে। সাথে সাথে হেলমেট মাথা থেকে খুলে যায় এবং থুতনি থেকে রক্ত পড়া শুরু করে। এরপর ২২ গজে প্রাথমিক চিকিৎসা চলে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করার জন্য সেখানেই তার মুখে ব্যান্ডেজ বেধে দেয়া হয়। ব্যান্ডেজ পরেও ব্যাটিং করেছেন ক্যারি।
তাই স্মিথকে নিয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দিয়ে দলকে খেলায় ফিরিয়ে আনেন ক্যারি। চতুর্থ উইকেটে ১০৩ রানের জুটি গড়েন স্মিথ-ক্যারি। দলীয় ১১৭ রানে আউট হয়ে যান ক্যারি। ৪টি চারে ৭০ বলে ৪৬ রান করেন ক্যারি।
২৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে ক্যারিকে তুলে নিয়ে এই জুটি ভাঙ্গেন ইংল্যান্ডের ডান-হাতি লেগ স্পিনার আদিল রশিদ। ক্যারির বিদায়ে উইকেটে গিয়ে রশিদের ঘুর্ণি সামলাতে পারেননি অলরাউন্ডারদ মার্কাস স্টয়নিস। ২ বল মোকাবেলা করে ঐ ওভারেই রশিদের বলে লেগ বিফোর ফাঁদে পড়ে শূন্য হাতে ফেরেন তিনি। ফলে ১১৭ রানে চতুর্থ ও ১১৮ রানে পঞ্চম উইকেট হারিয়ে আবারো চাপে পড়ে যায় অস্ট্রেলিয়া।
এ অবস্থায় উইকেটে গিয়ে ইংল্যান্ডের বোলারদের উপর পাল্টা আক্রমন করার চেষ্টা করেন হার্ড-হিটার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ২টি চার ও ১টি ছক্কায় দ্রুতই রান তুলতে থাকেন ম্যাক্স। তাকে স্ট্রাইক দেয়ার চেষ্টায় ছিলেন অন্যপ্রান্তে ব্যাট হাতে উইকেটের সাথে সেট হয়ে যাওয়া স্মিথ। ততক্ষণে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ২৩তম ও এবারের বিশ্বকাপে চতুর্থ হাফ-সেঞ্চুরির স্বাদ নিয়ে নেন স্মিথ। তবে নিজের ইনিংসটা বড় করতে পারেননি ম্যাক্সওয়েল। দ্বিতীয় স্পেলে আক্রমণে এসে নিজের তৃতীয় ওভারে উইকেট তুলে নেন আর্চার। ২৩ বলে ২২ রান করা ম্যাক্সওয়েলকে নিজের দ্বিতীয় শিকার বানান আর্চার।
ম্যাক্সওয়েলকে হারানোর স্মৃতি ভুলতে না ভুলতে লোয়ার-অর্ডারের ব্যাটসম্যান প্যাট কামিন্সকে হারায় অস্ট্রেলিয়া। ১০ বলে ৬ রান করে রশিদের বলে রুটকে ক্যাচ দিয়ে আউট হহন কামিন্স। কামিন্স ব্যর্থ হলেও, স্মিথকে নিয়ে বড় জুটি গড়ার চেষ্টা করেন বাঁ-হাতি পেসার মিচেল স্টার্ক। বেশ ভালোভাবেই ইংল্যাান্ডের বোলারদের সামলাচ্ছিলেন স্টার্ক। অন্যপ্রান্তে উইকেট আগলে রাখার পরিকল্পনায় ছিলেন স্মিথ। তাই এই জুটির কল্যাণে ২শ’ রানের কোটা পেরিয়ে যেতে সমর্থ হয় অস্ট্রেলিয়া।
৪৭ ওভার শেষে ৭ উইকেটে ২১৭ রানে পৌঁছায় অস্ট্রেলিয়া। এ অবস্থায় শেষ ৩ ওভারে আড়াইশ’ রান স্পর্শ করার স্বপ্ন দেখছিলো অসিরা। কারণ তখন উইকেটে সেট ব্যাটসম্যান স্মিথ। কিন্তু ৪৮তম ওভারের প্রথম বলেই স্মিথ বিদায় নিশ্চিত হয়। নিজেদের ভুলে রান আউটের ফাঁদে পড়েন স্মিথ। ৬টি চারে ১১৯ বলে ৮৫ রান করেন স্মিথ।
অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে স্মিথের আউটের পর, অস্ট্রেলিয়ার বাকী ২ উইকেটের পতন হয় মাত্র ৬ রানে। শেষ পর্যন্ত ১ ওভার বাকী থাকতে ২২৩ রানে গুটিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস। ৩৬ বলে ২৯ রান করা স্টার্ককে ওকস ও জেসন বেহরেনডর্ফকে ১ রানে বোল্ড করেন মার্ক উড। ইংল্যান্ডের ওকস ২০ রানে ও রশিদ ৫৪ রানে ৩টি করে উইকেট নেন।
বোলারদের দুর্দান্ত নৈপুন্যে সেমিফাইনাল জয়ের জন্য ২২৪ রানের টার্গেট পায় ইংল্যান্ড। টার্গেটটি মোটেই আহামরি ছিলো না স্বাগতিকদেও জন্য । তবে সেটি প্রমাণের জন্য নয়, দ্রুতই ম্যাচ শেষ করার তাগাদা ছিলো ইংলিশদের। ফাইনালে ওঠার জন্য অস্থির হয়েছিলো তারা। তাই ব্যাট হাতে জবাব দিতে নেমেই অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের অসহায় বানিয়ে ফেলেন ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার জেসন রয় ও জনি বেয়ারস্টো।
প্রথম ১০ ওভারে সর্তকতার সাথেই খেলেন রয়-বেয়ারস্টো। তাই দল পায় ৫০ রান। তবে এরপরই মারমুখী হয়ে রুপ নেন তারা। তাই পরের ৫ ওভারে ৪৫ রান যোগ করেন দুই ওপেনার রয়-বেয়ারস্টো। এ সময় ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ১৮তম হাফ-সেঞ্চুরি তুলে ৫১ বলে ৫৪ রানে দাঁড়িয়ে রয়। বেয়ারস্টোর রান ছিলো ৩২।
১৬তম ওভারে অস্ট্রেলিয়ার স্মিথকে তৃতীয় থেকে পঞ্চম বল পর্যন্ত টানা তিনটি ছক্কা মারেন রয়। তাই ঐ ওভারেই শতরানের কোটা স্পর্শ করেন ইংল্যান্ড। আর নিজের প্রথম ওভারে ২১ রান দেন স্মিথ।
দলকে উড়ন্ত সূচনা এনে দেয়ার পর সংগ্রহকে আরও বাড়িয়ে নিচ্ছিলেন রয়-বেয়ারস্টো। তবে ১৮তম ওভারের দ্বিতীয় বলে এই জুটিকে বিচ্ছিন্ন করে দেন চলমান বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী অস্ট্রেলিয়ার স্টার্ক। বেয়ারস্টোকে লেগ বিফোর ফাঁেদ ফেলেন তিনি। তবে আম্পায়ারের আউটের সিদ্বান্তের পর রিভিউ নেন বেয়ারস্টো। কিন্তু তাতে কোন লাভ হয়নি। রিভিউ নিয়েও আউট হয়ে যান তিনি। ফলে রিভিউ হারায় ইংল্যান্ড। ৫টি চারে ৪৩ বলে ৩৪ রান করেন বেয়ারস্টো। ১৭ দশমিক দ্বিতীয় বলে দলীয় ১২৪ রানে ভাঙ্গে ইংল্যান্ডের প্রথম জুটি।
বেয়ারস্টোকে আউট করে এবারের আসরে নিজের শিকার সংখ্যা ২৭-এ নিয়ে যান স্টার্ক। যার মাধ্যমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে এক আসরে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের বিশ্বরেকর্ড গড়েন স্টার্ক।
বেয়ারস্টোর বিদায়ে উইকেটে রয়ের সঙ্গী হন জো রুট। ঐ ওভারের বাকী চার বল থেকে ৩টি চারে ১২ রান তুলে নেন রুট। ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের শাসন করার ইঙ্গিত দেন রুট। তবে অন্যপ্রান্তে সেঞ্চুরির স্বপ্ন দেখছিলেন রয়। কিন্তু আম্পায়ারের ভুলের কারনে ২০তম ওভারের চতুর্থ বলে স্বপ্ন ভঙ্গ হয় রয়ের। অস্ট্রেলিয়ার পেসার কামিন্সের বাউন্সার পুল করেছিলেন রয়। কিন্তু বল তার ব্যাট বা গ্লভস স্পর্শ না করে অসি উইকেটরক্ষক ক্যারির হাতে জমা পড়ে। সাথে সাথে আউটের আবেদন করে অস্ট্রেলিয়া। সেই আবেদনে সাড়া দিয়ে রয়কে আউট দেন শ্রীলংকার আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা। আম্পায়ারের এমন আউটে হতভম্ব হয়ে ক্রিজে দাঁড়িয়ে তর্ক করতে থাকেন রয়। কারণ রিভিউ নেয়ার কোন উপায় ছিলো না। বেয়ারস্টো রিভিউ নিয়ে সেই সুযোগ পথ বন্ধ করে দেন। আম্পায়ারের ভুলে শেস পর্যন্ত ৮৫ রানে থেমে যেতে হয় রয়কে। তার ৬৫ বলের ইনিংসে ৯টি চার ও ৫টি ছক্কা ছিলো।
রয় যখন আউট হন, তখন ইংল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিলো ১৮২ বলে ৭৭ রান। এই বাকী কাজটুকু সম্পন্ন করতে কোন সমস্যাই হয়নি রুট ও অধিনায়ক মরগানের। তৃতীয় উইকেটে ৭৫ বলে অবিচ্ছিন্ন ৭৯ রান তুলে ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন টেস্ট ও ওয়ানডে দলপতি রুট-মরগান। ৪৬ বলে রুট অপরাজিত ৪৯ ও ৩৯ বলে মরগান অপরাজিত ৪৫ রান করেন। দু’জনই ৮টি করে বাউন্ডারি মারেন। অস্ট্রেলিয়ার স্টার্ক-কামিন্স ১টি করে উইকেট নেন। ম্যাচ সেরা হয়েছেন ইংল্যান্ডের ওকস। বল হাতে ৮ ওভারে ২০ রানে ৩ উইকেট নেন তিনি।