জঙ্গি দমনে দরকার অতন্দ্র সতর্কতা

7

আহমদ রফিকঃ দেশে, সমাজে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করার লক্ষ্য নিয়ে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। এর সামাজিক চরিত্র যে হবে সেক্যুলার তথা অসাম্প্রদায়িক- এ দেশের সংবিধান তা নিশ্চিত করেছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামক শব্দটির মাধ্যমে। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্জন ও সামাজিক অর্জনের মধ্যে যে বড়সড় গুণগত ব্যবধান থেকে গেছে, তা দূর করা প্রজাতন্ত্রের চারিত্র্য বৈশিষ্ট্য রক্ষার জন্য অতীব জরুরি; সেদিকে আমাদের বিচক্ষণ দৃষ্টির অভাব ছিল। স্বভাবতই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন, অর্থনীতির পুনরুদ্ধার ইত্যাদি বিষয়ে সর্বাধিক নজর দেওয়া হয়। তার তৎপরতাও ছিল সেই ধারাতেই। ‘বাংলাদেশ একটি তলাবিহীন ঝুড়ি’- হেনরি কিসিঞ্জারের এ জাতীয় মন্তব্যও হয়তো-বা উন্নয়ন ও পুনর্গঠন বিষয়ক এক মুঠো চিন্তার কারণ হতে পারে। এক কথায়, তাৎক্ষণিক প্রয়োজনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল তখন। পাশাপাশি সমাজ বদলের দীর্ঘস্থায়ী কর্মসূচির কথা ভাবা হয়নি।

দেশ পুনর্গঠন, সন্দেহ নেই অতীব জরুরি বিবেচ্য বিষয় ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গে সমাজ বদল- পাকিস্তানি রক্ষণশীলতার চেতনা থেকে মানবিক মূল্যবোধের বিশ্বাসে উত্তরণ যে আধুনিক চৈতন্যে পৌঁছাতে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সেদিকে আমরা বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারিনি। ধর্মীয় সংস্কার, সামাজিক রক্ষণশীলতা থেকে মুক্তি ভবিষ্যৎ মানবিক সমাজ গঠনের জন্য যে কতটা জরুরি ছিল, সে হিসাব ও বিচক্ষণতা আমাদের ছিল না। হোক তা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়; কিন্তু কাজটা তখনই শুরু করা দরকার ছিল। এর যুক্তিসঙ্গত কারণ একটাই। যুদ্ধোত্তর বাংলায় রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শিক প্রেরণা তখন আবেগে সজীব, জনগণ মানসিক সংশোধনের জন্য প্রস্তুত। গোটা জাতিকে মানবিক মূল্যবোধে শিক্ষিত করার সুযোগ হেলায় হারানো, সন্দেহ নেই বাংলাদেশের জন্য ছিল দুর্ভাগ্যজনক। সে প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ার কারণে রাজনৈতিক অর্জনের-সুফলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক পরিবর্তনের সুফল অর্জন সম্ভব হয়নি। তাই সংবিধানের সেক্যুলার ধারা কয়েক বছরের মধ্যে বিলুপ্ত; সেখানে ধর্মীয় চেতনার অনুপ্রবেশ সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। তাতে সমর্থনও পাওয়া গেল। বিস্ময়কর যে, তাতে সহযোগী বাম রাজনীতির একাংশ। এ বিষয়ে সর্বশেষ পেরেকটি পোঁতা হলো আরেক সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতে। ঘোষিত হলো ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’। ভুল বোঝার অবকাশ তৈরি হলো যে, বাংলাদেশ একটি ইসলামী রাষ্ট্র।

দুই.

এই যে বিপরীতমুখী পরিবর্তন রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক, সাংবিধানিক- এর প্রভাব সমাজে পড়তে বাধ্য। পড়েছেও। সমাজের যে ছোট্ট রক্ষণশীল অংশ তার সদস্যরা উৎসাহিত হয়েছে নব্য গণতন্ত্রী রাষ্ট্রটিকে পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করতে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অভাবিত গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন- মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের টানে, যা পরে তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। আফগানিস্তান তছনছ হলো মার্কিনি অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণের টানে। বাংলাদেশের রক্ষণশীলতায় এর প্রভাব- পরিণামে স্লোগান- ‘আমরা হবো তালেবান, বাংলা হবে আফগানিস্তান’। ভাবতে অবাক লাগে, আফগানিস্তানকে সোভিয়েত প্রভাব থেকে মুক্ত করার মার্কিনি-চীনি প্রচেষ্টার যুদ্ধে বহুবিধ শরিয়তি যোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেয় কিছু সংখ্যক বাঙালি যুবা। তারা প্রশিক্ষণ নেয়, যুদ্ধ করে, কেউ কেউ প্রাণ দেয়। আর কিছু সংখ্যক তাদের বিশ্বাসমতে ‘গাজি’ হয়ে স্বদেশে ফেরে।

ইতিমধ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে ধর্মীয় মৌলবাদে দীক্ষিত একাধিক জঙ্গি সংগঠন গড়ে ওঠে। উদ্দেশ্য একটাই- বাংলাদেশকে কট্টর ধর্মীয় রাষ্ট্রে পরিণত করা, এর চরিত্র বদল ঘটানো। এদের মধ্যে জেএমবিই সম্ভবত সর্বাধিক শক্তিশালী ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠন। এ ছাড়াও অনুরূপ বিভিন্ন ধারার জঙ্গি সংগঠনও। এরা মতাদর্শিক ক্ষেত্রে নিজেদের দেশের চৌহদ্দিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এদের কেউ কেউ বিদেশি মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তোলে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অঘটন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘোলা পানির টানে। সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের প্রয়োজনে আইএস (্‌ইসলামিক স্টেট) নামক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুুর জঙ্গি সংগঠন গড়ে ওঠে তার প্রতাপ, প্রচার ও বিস্তার শান্তিপূর্ণ বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী রাজনীতি ইরাক, লিবিয়া কবজায় নেওয়ার পর সিরিয়ায় যখন হস্তক্ষেপ চালায়, ততক্ষণে মার্কিনি মদদে গড়া আইএসের ভোল বদল, ইরাকের একাংশ দখল, সিরিয়া যুদ্ধে অংশ নিয়ে সিরিয়ার অঞ্চলবিশেষ দখল করে নিজ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

তাদের চোখে তখন স্বপ্ন মুসলিম বিশ্বে ইসলামী স্টেট স্থাপনের, বিরোধী মতাদর্শীর শিরশ্ছেদে, রক্তে মাটি, বালুভূমি ভেজানো। ইরাকি তেল সম্পদে বলীয়ান আইএস এমন স্বপ্নই দেখেছিল পাল্টা আঘাতের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত। তাদের ইরাকের অংশবিশেষ দখল মার্কিনি যুদ্ধবাজদের বোধোদয় ঘটাতে সাহায্য করেছিল, বিশেষ করে মানুষ হত্যায় তাদের আনন্দে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল নতুন বিস্ময়। যদিও বাংলাদেশ সরকারের বোধোদয় এবং জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ ও বিশেষ করে জেএমবির বিরুদ্ধে তাদের ব্যাপক সফল অভিযানে জেএমবির মূল শিকড় কাটা পড়েছিল; কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। দুর্বোধ্য কারণে বাংলাদেশি প্রশাসন এ দেশে আইএসের অস্তিত্ব বা প্রভাব কোনোটাই স্বীকার করতে চায়নি। করলে তাদের অক্ষমতার প্রকাশ প্রমাণিত হতো না; বরং নতুন উদ্যমে, নতুন পরিকল্পনায় জঙ্গিবিরোধী অভিযান চালানোর পক্ষে যুক্তি তৈরি হতো। এমন সম্ভাবনার কথাও ভাবা যায় যে, সে ক্ষেত্রে তিন বছর আগে (২০১৬) সংঘটিত গুলশানের হলি আর্টিসান বেকারির রক্তস্নাত নৃশংসতা ও মৃত্যুর হোলি খেলার সুযোগ আইএস মতাদর্শে প্রভাবিত বাংলাদেশি জঙ্গিরা নাও পেতে পারত। সবটাই অবশ্য সম্ভাবনার কথা; তবু এতে কিছুটা তথ্যগত যুক্তি অস্বীকার করা কঠিন।

তিন.

এখন তো ঘটনাদির পারম্পর্যে অস্বীকার করা কঠিন যে, বাংলাদেশের বেশ কিছু নর-নারী, বিশেষ করে তরুণ (বিত্তবান পরিবারের তরুণ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীও) আইএস মতাদর্শে আকর্ষিত। প্রমাণিত- সিরিয়া যুদ্ধে বাংলাদেশি জঙ্গির আইএসের পক্ষে অংশগ্রহণ; তাদের কেউ কেউ যে দেশে ফিরে এসে চুপ করে বসে থাকবে না- সে আশঙ্কাও দেশের সচেতন সমাজে প্রবল। সে জন্যই কি গুলশান-দুঃস্বপ্নের রাতটির স্মরণে ১ জুলাই (২০১৯) দেশের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দৈনিকে তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য :’সিরিয়ায় যাওয়া জঙ্গিদের নিয়ে এখন বড় দুশ্চিন্তা’। দীর্ঘ এ শিরোনামটি বাস্তবিকই দুশ্চিন্তার ইঙ্গিতবহ। কারণ এ প্রতিবেদনে সিরিয়া যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশি জঙ্গিদের সম্পর্কে নামধামসহ বিশদ তথ্য রয়েছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ মাত্রেরই দুশ্চিন্তা হওয়ার কথা।

অন্য একটি দৈনিকে এতদসংক্রান্ত শিরোনাম :”নব্য জেএমবি দুর্বল, ভয় ‘লোন উলফ’।” যে উদাসীনতার কারণে হলি আর্টিসানের ভয়ঙ্কর নৃশংসতা, পরবর্তী লাগাতার অভিযানের কারণে আইএস মতাদর্শে উদ্দীপ্ত নব্য জেএমবি দুর্বল হয়েছে ঠিকই; কিন্তু এ ক্ষেত্রে আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। কারণ জঙ্গিবাদের রক্তবীজ নীরবে-নিভৃতে অঙ্কুুুরিত হয়, কখন সে আঘাত হানবে, বলা কঠিন। নিউজিল্যান্ড বা শ্রীলংকায় হামলার ভয়াবহতা কি কারও হিসাবে ছিল? কিন্তু নৃশংসতা ঠিকই হানা দিয়েছে। আর উপমহাদেশ সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারিত হতেও আমরা শুনছি। সে জন্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে আরেকটি নৃশংসতার ঘটনা না ঘটে। মনে রাখা দরকার যে, ধর্মীয় জঙ্গিবাদ এখন শুধু দেশমাত্রেরই অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটা বর্তমানে আন্তর্জাতিক চরিত্রের এবং এর মতাদর্শগত হেরফের অনেক। তবে পরাজিত আইএস এখন আহত হিংস্র বাঘ, সে তার অবস্থান দৃঢ় করতে বেপরোয়া। বিভিন্ন সূত্র ও উৎসে তার অর্থ ও জনশক্তি- নেপথ্যে ধর্মীয় মতাদর্শের উন্মাদনা, তার সদস্যদের মৃত্যুভয় নেই। তাই যতক্ষণ আইএস ও অনুরূপ জঙ্গি সংগঠন পুরোপুরি নির্মূল না হবে, ততদিন শান্তিপ্রিয় মানুষের জন্য শান্তি নিশ্চিত করতে হলে সর্বক্ষণ অতন্দ্র প্রহরীর সতর্কতা নিয়ে সক্রিয় থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কখন ওদের কোন প্রতিনিধি হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে বিপদ ঘটাবে, কেউ তা বলতে পারে না। অতএব সাধু সাবধান।-ভাষাসংগ্রামী, প্রাবন্ধিক কবি ও রবীন্দ্র গবেষক।-সূত্রঃ সমকাল