উন্নয়নের যৌক্তিক ভিত্তি নেই বাজেটে

2

ড. এম শামসুল আলমঃ এলএনজি ঘাটতি সমন্বয়ে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা এসেছে। বাজেটে এলপিজিরও মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব আছে। ফলে ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। অথচ বাজেটে বরাদ্দ ও বরাদ্দ বৃদ্ধিতে ভোক্তার আয় বাড়বে না, অপচয় ও দুর্নীতি বাড়বে। এর অভিঘাত ১২ কোটি নিম্ন আয়ের ভোক্তার জন্য সহনীয় হবে না। তাছাড়া তেল, গ্যাস, কয়লা, বিদ্যুৎ, এলপিজি ও এলএনজির মূল্য এবং মূল্যবৃদ্ধি ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়। সঠিক দামে, সঠিক মানে এবং সঠিক মাপে ওইসব জ্বালানি পাওয়া ভোক্তার অধিকার। অথচ ভোক্তা সে অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং প্রতারিত। নিল্ফেম্ন বর্ণিত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অসঙ্গতিগুলো ভোক্তা অধিকার খর্ব করে :গ্যাস খাত থেকে সরকারি রাজস্ব আহরণ প্রবৃদ্ধি অত্যধিক এবং অযৌক্তিক। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রাজস্ব আহরণ ৫ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা। পাঁচ বছরে প্রায় তিনগুণ। আবার ভোক্তারা দিয়েছেন গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে ১০ হাজার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিলে ১০ হাজার কোটি টাকা। কোম্পানি ও সংস্থাগুলোতে পুঞ্জীভূত সর্বমোট উদ্বৃত্ত অর্থ প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ ও আইওসি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমানের জন্য গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল গঠিত হয়। এলএনজিজনিত আর্থিক ঘাটতি মোকাবেলায় জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল গঠিত হয়। এসব তহবিল কাজে আসেনি। তবুও এসব তহবিলে এ অর্থবছরেও জমা হবে যথাক্রমে প্রায় ২.৮ ও ১.৭ হাজার কোটি টাকা। সরকারি রাজস্বসহ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় যৌক্তিক হলে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল ও গ্যাস উন্নয়ন তহবিলে অর্থ গৃহীত না হলে চলতি অর্থবছরে গ্যাস সরবরাহ ব্যয় সাশ্রয় হতো প্রায় ৮.৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ ঘাটতি সমন্বয়ে অযৌক্তিক ব্যয় ও দুর্নীতি না কমিয়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে।

চলতি অর্থবছরে এলএনজির কারণে গ্যাসে ঘাটতি প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। এলএনজির ক্রয়মূল্য, পরিবহন ব্যয়, রিগ্যাসিফিকেশন চার্জ ও সঞ্চালন অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয় এবং গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ ব্যয়, পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের সার্ভিস চার্জ, জনবল ও অবকাঠামো উন্নয়ন চাহিদা- গ্যাস সরবরাহ ব্যয়বৃদ্ধির এ নিয়ামকগুলোর যৌক্তিকতা যাচাই করার সুযোগ ভোক্তার নেই। অথচ এসব ব্যয়ে যথেষ্ট অযৌক্তিক ব্যয় ও দুর্নীতি রয়েছে। কেবল সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জহার (২৫ ও ২৩ পয়সা-ঘনমিটার) বৃদ্ধির প্রস্তাব গণশুনানিতে আনা হয়। এই গণশুনানিকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি বলে চালানো হয়। ফলে ভোক্তা প্রতারিত হয়।

গ্যাস সরবরাহ ব্যয়হার ৭.৩৯ টাকা থেকে প্রায় ১২ টাকা হয়। ফলে চলতি অর্থবছরে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। তবে বিতর্ক রয়েছে, সাড়ে ছয় ডলার দরের এলএজি ১০ ডলারে কেনা হয়েছে। রিগ্যাসিফিকেশনে যৌক্তিক চার্জের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ চার্জ ধরা হয়েছে, এলএনজি পরিবহনে জাহাজ ভাড়া কমপক্ষে ৩০ শতাংশ বেশি, গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গ্যাস সরবরাহে দেশীয় কোম্পানির গ্যাসের অনুপাত বাড়ানো ও উৎপাদন ব্যয় কমানোর কথা। কিন্তু বাস্তবে অনুপাত কমেছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ২০০৯ সালে আইওসি গ্যাসের অনুপাত ছিল ৪৮ শতাংশ। এখন ৬০ শতাংশ। আইওসি গ্যাসের মূল্যহার ২.৫৫ টাকা। বাপেক্স গ্যাসের মূল্যহার ৩.০৪ টাকা। ফলে দেশি কোম্পানি অপেক্ষা আইওসি গ্যাস এখন লাভজনক। সাগরের গ্যাস ক্রয় মূল্যহার করপোরেট কর বাদে হবে প্রায় সাড়ে সাত ডলার। গ্রিডে আনতে যা খরচ হবে, তাতে এলএনজি আমদানি করা এখন লাভজনক। সঞ্চালন ও বিতরণে মুনাফার সঙ্গে প্রায় ১.৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি অর্থ যোগ করে সঞ্চালন ও বিতরণ মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তিতাসকে দুই শতাংশ সিস্টেম লস সুবিধা এবং পেইড অব ক্যাপিটালের ওপর ১৮ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হয়। চুরিকৃত গ্যাসের মূল্য ভোক্তা দেয়। সে গ্যাস কালোবাজারে বিক্রি করে কালোবাজারি লাভবান হয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

প্রি-পেইড ও ইভিসি মিটার না লাগিয়ে গ্যাস চুরির সুযোগ রেখে মিটারবিহীন আবাসিক এবং ইভিসি মিটারবিহীন শিল্প ও বাণিজ্যিক ভোক্তার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়। আবার এলপিজির মূল্য পেট্রোলিয়াম পণ্যের বাই-প্রডাক্ট হওয়া সত্ত্বেও ভোক্তা পর্যায়ে এলএনজির মূল্য ছাড়িয়ে গেছে। সিএনজির মূল্যও এলএনজির যৌক্তিক মূল্য অপেক্ষা অধিক। পরিবহন ভাড়ায় ভোক্তা জ্বালানি তেলের দরপতন সমন্বয় সুবিধা পায়নি। অথচ সিএনজির মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি পায়। সিএনজির আবারও মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিরই নামান্তর। সিএনজির মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি দ্বারা গ্যাসে যে পরিমাণ আর্থিক ঘাটতি সমন্বয় হবে, এর থেকে অনেক বেশি পরিমাণ অর্থ ভাড়া বৃদ্ধি দ্বারা ভোক্তাদের কাছ থেকে আদায় করা হবে। তা জেনেও বিইআরসি মিটারবিহীন আবাসিক ভোক্তার গ্যাস এবং সিএনজির দাম বৃদ্ধিতে অনড়। ভোক্তার অভিমত, এলপিজির বাজার সম্প্রসারণে আবাসিক গ্যাস ও সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি করা হবে।

গ্যাস সংযোগ স্থগিত থাকা সত্ত্বেও সংযোগ দেওয়া, ডিমান্ড নোটিশ ইস্যু করা, অর্থ জমা নেওয়া, সংযোগ না দিয়ে সংযোগের নামে নেওয়া অর্থ বছরের পর বছর আটকে রাখা সংক্রান্ত ভোক্তা অভিযোগগুলো নিষ্পত্তি হয় না। তিতাসকে জবাবদিহির আওতায় আনা হয় না। পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগও নিষ্পত্তি হয় না। ভোক্তাকে আদালতে যেতে হয়।

২০১৫-১৬ অর্থবছরের হিসাবে, যৌক্তিক করা হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়হার পাঁচ টাকা নিচে নামানো সম্ভব। এ ব্যয়হার এখন প্রায় ৬.৫ টাকা। সেই সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয়হার যদি যৌক্তিক করা হতো, তাহলে বছরে কমপক্ষে বিদ্যুৎ সরবরাহে আট হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। বেতন প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় সব ইউটিলিটির রাজস্ব ঘাটতি হয় এবং মূল্যহার বৃদ্ধির দরকার হয়। কিন্তু পিজিসিবির দরকার হয়নি। বিতরণেও ব্যয় যৌক্তিক হলে বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। তাতে ঘাটতি ১.৮ হাজার কোটি টাকা সমন্বয় হয়ে উদ্বৃত্ত থাকত। অথচ ব্যয় যৌক্তিক না করে বিদ্যুতে ঘাটতি দেখানো হয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। সে ঘাটতি সমন্বয়ে প্রতি ইউনিটে মূল্যবৃদ্ধি করা হয় ৩৫ পয়সা। বাদবাকি প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ভর্তুকি দ্বারা সমন্বয় করা হয়।

২০০৯-১০ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর অবধি জ্বালানি তেলে ভর্তুকি ছিল ৩১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। দরপতন যৌক্তিক সমন্বয় না হওয়ায় ২০১৬-১৭ অর্থবছর থেকে এ খাত লাভে আছে। তেল সরবরাহ ব্যয় ও ব্যয়বৃদ্ধি যৌক্তিক এবং দুর্নীতিমুক্ত হলে দরপতন সমন্বয় ছাড়াই তেলের মূল্যহার কমে। এ মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির হলেও তা নির্ধারণ করে অবৈধভাবে জ্বালানি বিভাগ। একইভাবে এলপিজির মূল্যহার নির্ধারণের এখতিয়ার বিইআরসির হলেও তা নির্ধারণ করেন এলপিজি ব্যবসায়ীরা। এসব মূল্যহারের যৌক্তিকতা যাচাই করার সুযোগ ভোক্তার নেই।

বাজেটে প্রস্তাব করা হয়েছে, বিদ্যুতে ভর্তুকি সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ঘাটতি প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা। গ্যাসে ভর্তুকি তিন হাজার কোটি টাকা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল হতে অনুদান ১.৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পাবে। জ্বালানি তেলে ভর্তুকি রাখা হয়নি। তবে বিপিসি কিছুদিন আগেও বলেছে, তেলে ঘাটতি ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু ঘাটতি সমন্বয়ে ব্যয় কিংবা দুর্নীতি কমানোর

কথা বলেনি।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে পিকে বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ৯ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল সাত হাজার ৩৫৬ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল প্রায় ২১ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ১৪ মেগাওয়াট। সরবরাহ ছিল ১০ হাজার ৯৫৮ মেগাওয়াট। ঘাটতি ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ ঘাটতি নিরসনে কোনো অগ্রগতি নেই। গড়ে বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে ১২ শতাংশ। অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে ছয় শতাংশ। প্লান্ট ফ্যাক্টর ছিল ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৯ শতাংশ এবং ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪০ শতাংশ। উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে, ব্যবহার বৃদ্ধি পায়নি। অর্থাৎ উন্নয়নে গতি আছে, অগ্রগতি নেই।

বাজেটে ২৪ হাজার কোটি টাকা বিদ্যুৎ এবং দুই হাজার কোটি টাকা জ্বালানি খাত উন্নয়নে বরাদ্দ প্রস্তাব আছে। এ বরাদ্দ বেশি না কম- কোনোটিই বলার মতো কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোয় দেখা যায়, সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছে। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বেশি বেশি কর ও মুনাফা আহরণ, অন্যায় ও অযৌক্তিক ব্যয়বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে ঘাটতি সমন্বয়ে ভর্তুকি আর ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্যবৃদ্ধি করা হচ্ছে। তাতে ভোক্তা অধিকার বিপন্ন। এই হলো এ খাত উন্নয়ন কৌশল।

-লেখকঃ শিক্ষাবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ-সমকাল