আইএসের ‘দায় স্বীকার’ নিয়ে এবারও প্রশ্ন

1

মেহেদী হাসানঃ এ দেশে হামলা কারা ও কেন চালায় এবং কারাই বা আইএসের নামে দায় স্বীকার করে, তা নিয়ে অনেক প্রশ্নেরই উত্তর মেলে না। বিভিন্ন দূতাবাসের যেসব কর্মকর্তা নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন, তাঁদের কয়েকজন জানান, সন্ত্রাসের হুমকি থেকে কোনো দেশই মুক্ত নয়।

কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হামলাগুলো যে সত্যি আইএস করছে, তা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ নেই। তবে কোনো হামলায় আইএসের দায় স্বীকারের তথ্য প্রকাশিত হলে তা তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গেই আমলে নেন।
আইএসের বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের বরাত দিয়ে সন্ত্রাসের ব্যাপারে নজরদারি করা বিভিন্ন পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান দায় স্বীকারের তথ্য প্রচার করে থাকে। কিন্তু যে ধরনের সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বা যে রকম ভয়াবহতার জন্য আইএস পরিচিত, তার সঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ের বিচ্ছিন্ন কিছু হামলার খুব একটা সাদৃশ্য মেলে না। গত মাসে আইএসের গান বাংলায় ডাব করে প্রকাশ করার ঘোষণাকে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হামলার হুমকি হিসেবে গণমাধ্যমে যেভাবে প্রচার করা হয়েছে, তা থেকেও প্রকৃত বিষয়টি অতিরঞ্জিত করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ঢাকার মালিবাগে গত রবিবার সন্ধ্যায় পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণের দায় আইএস স্বীকার করেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়। ওই খবরকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার।

গতকাল সোমবার বিকেলে তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে যেখানে আইএস দৌড়ের ওপর আছে, সেখানে ঢাকায় ককটেল হামলা চালাতে আসবে-এমন ভাবনা হাস্যকর। আমরা অতীতেও দেখেছি, কোথাও ককটেল ফুটলে আইএসের দায় স্বীকার করার কথা প্রচার করা হয়।’
মোহাম্মদ আলী শিকদার বলেন, এসব দায় স্বীকারের তথ্য প্রচারের পেছনে ভূ-রাজনৈতিক অনেক স্বার্থ আছে। রিটা কােসর সাইট ইন্টেলিজেন্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আইএস নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ থাকা দেশগুলোর সঙ্গে মিলে কাজ করে। এটি বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ। তিনি আরো বলেন, বিচ্ছিন্ন এসব হামলা আইএস না করে থাকলেও এ দেশে জঙ্গি আছে। গত কয়েক বছরে তারা অনেকবার তত্পরতা চালানোর চেষ্টা করেছে এবং ধরাও পড়েছে। তাই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। বরং জঙ্গিদের ঠেকাতে অনলাইনসহ সর্বত্র জোরালো নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।

গত রবিবার মধ্যরাতে সাইট ইন্টেলিজেন্সের এক টুইট বার্তায় বলা হয়, আইএস দাবি করেছে যে বাংলাদেশে পুলিশের গাড়িতে বোমা হামলা চালিয়েছে। এর সঙ্গে আরবি ভাষায় আইএসের দায় স্বীকারমূলক বক্তব্যের ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে।

রবিবার রাতে টুইটারে কথিত আত-তামকিন মিডিয়ার নামে বাংলা ভাষায় একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আইএসের কথিত প্রচারমাধ্যম আমাক এজেন্সির বরাত দিয়ে বলা হয়, ‘ঢাকা শহরের মালিবাগ মোড়ের কাছে একটি গোপন ইউনিট বাঙালি পুলিশের একটি গাড়িতে একটি আইইডি বিস্ফোরিত করে। এতে গাড়িটি অকেজো হয়ে যায় আর তাতে থাকা তিন সদস্য আহত হয়।’

মালিবাগে বিস্ফোরণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুক্তরাজ্যভিত্তিক নিরাপত্তা নজরদারি প্রতিষ্ঠান ইন্টেলিজেন্স ফিউশনের দক্ষিণ এশিয়া শাখা এক টুইট বার্তায় আইএসের দায় স্বীকারের তথ্য প্রচার করে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক আরেক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান রিস্কম্যাপও মালিবাগ হামলায় আইএসের দায় স্বীকারের তথ্য জানিয়ে টুইট বার্তা প্রকাশ করে। এর আগে এপ্রিল মাসে ঢাকার গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হামলা আইএস চালিয়েছিল বলে প্রচার করা হয়েছিল। এখন বলা হচ্ছে, শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলার পর আইএস বাংলাদেশে দুই দফায় হামলা চালিয়েছে। দুটি হামলার ক্ষেত্রেই আইএসের ওই দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।

সুইডেনভিত্তিক জঙ্গিবাদ বিশেষজ্ঞ তাসনিম খলিল বিবিসিকে বলেন, তাঁর মনে হয়েছে নতুন একটি গোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে। বাংলাদেশে আগে যাদের কর্মকাণ্ড ছিল না—এমন কোনো গোষ্ঠী পুলিশের ওপর হামলার জন্য দায়ী বলে তাঁর মনে হচ্ছে। তিনি বলছেন, হামলার দায় স্বীকার করার ধরনে কিছুটা পার্থক্য তিনি দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর বিশ্লেষণ হলো, ‘অফিশিয়ালি আইসিসের কাছ থেকে কোনো স্টেটমেন্ট আসার আগেই বিভিন্ন টেলিগ্রাম চ্যানেলে যেভাবে তারা এটি প্রচার করেছে এবং বিভিন্ন ছবি তারা শেয়ার করেছে, আইসিসের দায় স্বীকার করার যে চেইনটা আছে, আমার কাছে মনে হয় এই ঘটনার ক্ষেত্রে সেটি মেইনটেন হয়নি। কিছু নতুন এলিমেন্ট এই ঘটনায় রয়েছে।’

এর আগে গুলিস্তানে ককটেল হামলায় দুই পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায় আইএসের দায় স্বীকারকে ষড়যন্ত্রের অংশ বলে অভিহিত করেছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। গত ১ মে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, কোনো ঘটনা ঘটলেই আইএস দায় স্বীকার করছে এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান সাইট ইন্টেলিজেন্স বিবৃতি দিচ্ছে, এটি ষড়যন্ত্র।

সাইট ইন্টেলিজেন্সের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মানচিত্রে আইএসের প্রতি আনুগত্য পোষণকারী গোষ্ঠীর বাংলাদেশে উপস্থিতি দেখানো হয়েছে। আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে ইরাক-সিরিয়া গেছে—এমন ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশিও ছিল। কিন্তু সেই সংখ্যা পশ্চিমা অনেক দেশের নাগরিকদের তুলনায় নগণ্য।

এছাড়া ২০১৬ সালে ঢাকায় হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলার পর আইএসের কথিত দায় স্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবল চাপে পড়েছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের যুক্তি ছিল, ওই হামলাকারীরা বাংলাদেশি। এখানে আইএস নেই। তবে যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি ছিল, হামলাকারীরা বাংলাদেশি হতে পারে; কিন্তু তাদের সঙ্গে বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ আছে।

হলি আর্টিজানে হামলার পর বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনে উদ্যোগ আরো জোরদার করেছে। এর ফলে গত কয়েক বছরে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ঠেকানো গেছে। সন্ত্রাসী হামলার বিবেচনায় পশ্চিমা দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের আক্রান্ত হওয়ার রেকর্ড অনেক কম। এর পরও পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা তুলে ধরে তাদের নাগরিকদের সতর্ক করা অব্যাহত রেখেছে।-কালেরকন্ঠ