সময়টা ভালো যাচ্ছে না!!

8

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ সময়টা ভাল যাচ্ছে না কোথায়ও কারো! ভাল হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছি না। সব জায়গায় কেবলই অস্থিরতা, কেবলই অশান্তির অশনি সংকেত। ভাল সংবাদের দেখা পাওয়া আজকাল দুস্কর। সংবাদপত্রে সর্বদা বিচরণ করি বলে বিষয়টি সহজে টের পাই। ইদানিং ছোট খাটো কেবল একটি ভাল সংবাদের পাশাপাশি তিনটি বড় মাত্রার খারাপ সংবাদ আসে। বিষয়টি কেবল যে আমাদের দেশে আসে তাই নয়; সারা পৃথিবীতেই অনেকটা একই অবস্থা। ভাল খবর কোথাও থেকে খুব একটা আসে না। আসে সব খারাপ খবর। আমার শোনিমের ভাষায়, “অসম্ভব খারাপ খবর!”
২৪শে মার্চের সন্ধ্যেবেলা। সারাদেশে হঠাৎ রেড এলার্ট জারি হলো। ধরমর করে লাফিয়ে উঠলাম। সন্ত্রাসবাদের রেড এলার্টে কঠিনভাবে আতঙ্কিত হলাম। আতঙ্কিত না হয়ে উপায়ও তো নেই। সন্ত্রাসবাদের ঘটনা ইউরোপ ছাড়িয়ে এখন নিউজিল্যান্ড অবদি ছড়িয়েছে। আর এবার ঘটিয়েছে স্বয়ং অষ্ট্রেলিয়ান এক সন্ত্রাসী। এতে চুপসে গেছে অষ্ট্রেলিয়ান জাতি তথা সরকার। ক’দিন আগেও ঢাকার হলিআর্টিজানের ঘটনায় এই অষ্ট্রেলিয়া নিরাপত্তার নামে আমাদের কী চুবানিটাই না দিয়েছে। সরকারের এত ভূমিকার পরেও ওরা ওদের ক্রিকেট দল পাঠায়নি এদেশে। নিজের দেশে সন্ত্রাসী লালন করে ওরা সারাবিশ্বকে বার্তা দিয়েছে বাংলাদেশ না ভ্রমণে।
বাড়াবাড়ির একটা মাত্রা থাকে। ওরা সেটাও ছাড়িয়েছিলো। এবার যদি হুশ হয়। এবার যদি থামে। তবে লক্ষণ ভাল। নিউজিল্যান্ডের ঘটনায় একেবারে চুপসে গেছে; রাম ধরা খেয়েছে অষ্ট্রেলিয়া। বলা যায় উচিৎ শিক্ষা পেয়েছে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন সন্ত্রাস কোন ধর্ম করেনা, দল করে না। সন্ত্রাস করে সন্ত্রাসী। ওদের কোন জাত নেই, ধর্ম নেই এবং দেশ নেই। ওদের একটাই পরিচয়, ওরা সন্ত্রাসী। কেউ শোনেনি শেখ হাসিনার কথা। কেউ মানেনি তাঁর আবেদন। এখন এই কথা ওরাই বলছে। চিপায় পড়ে গা বাঁচানোর জন্যই বলছে। সারা পৃথিবীতে ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃনার আগুন জ্বালিয়ে এখন নিজেরাই সেই আগুনে জ্বলছে।
এই আগুন ধাউধাউ মার্কা আগুন। বিশ্ব রাজনীতির আগুন। বড় খারাপ; বড় বিপদজনক। এটা নিয়ে বাঁচতে পারবে না কেউ। এ তো সর্বনাশা আগুন। কাউকে যে ছাড়ে না এটা তো বারবার প্রমাণিত। এই আগুন তো আর ছেলেখেলার আতশবাজির রশ্মি নয় যে কাউকে ছেড়ে কথা বলবে। এটা নিমতলী, চকবাজার কিংবা বনানী, গুলশানের আগুনের চেয়েও ভয়াবহ এক দানবীয় আতঙ্ক।
বনানী গুলশানের আগুনই তো মারাত্মক। কি ভাবে সবকিছু ছাড়খার করে দিচ্ছে। এখন তো সারা দেশেই লাগছে কিংবা কেউ না কেউ লাগাচ্ছে। বিশেষ করে পুরান ঢাকাকে। বলা যায় পুরান ঢাকা এখন আগুনের প্রকৃত চারণভূমি। বসবাসযোগ্য কোন শহর নয়; আস্তাবলের ঘিঞ্জীতুল্য একটা বসতি মাত্র। এলোমেলো সরু, চিপা অলিগলির বিপদজনক জনপদ। ঘনবসতি বললে পুরোপুরি ভুল হবে। ঘন শব্দটি এখানে চলেনা। বলা যায় গায়ে গায়ে লেগে আছে মানুষ। আর এভাবেই তারা বাস করছে মেয়াদ উত্তীর্ন পুরাতন এবং আধাভাঙা ভবনে। এসব ভবন বিধ্বস্ত হতে ভুমিকম্পেরও দরকার হবে না। মোটামোটি একটু নাড়া দিলেই ধপ্পাস করে গুড়িয়ে যাবে।
গুড়িয়ে যাবে এরই মাঝে গড়ে উঠা প্রচন্ড সম্ভাবনাময় অগণিত কুটির শিল্প। জীবিকার তাগিদে মানুষ তাদের নিজেদের গড়জেই গড়ে তুলছে এসব শিল্প। যে যেভাবে পেরেছে সেভাবেই গড়ে তুলেছে। আর তৈরি হয়েছে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের। সবাই এই ভাল দিকটিই সকল সময় দেখেছে। গর্ব করেছে। কিন্তু নিরাপত্তার দিকটি কেউ দেখেনি। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দাহ্য পদার্থের সমাহারে একের পর এক মারাত্মক বিপদজনক শিল্পের ভয়ানক দিকটা কেউ বিবেচনা করেনি। করলে এতটা বিপদজনক জায়গায় এতসব বিপদজনক শিল্প কোনভাবেই গড়ে উঠতে পারতো না।
অথচ ঘটছে। লোকচক্ষুর সামনে প্রতিটি সরকারের উদাসীনতাতেই ঘটছে। অথচ সরকারের মাত্র একটি সিদ্ধান্তে পাল্টে যেতে পারে পুরো চিত্রপট। কেবল একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বিপদজনক সকল ভবনকে পুরোপুরি অবমুক্ত করে পুরো এলাকাকে পর্যটনের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত। যারা উচ্ছেদ হবে তাদের জন্য বুড়িগঙ্গার অপরপাড়ে আবাসিক এবং আধুনিক নগর সুবিধাসহ বর্তমানের সকল কুটির শিল্প বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে গড়ে দিতে হবে। ওখানে নতুন জায়গায় নতুন শিল্প পল্লী হবে। আধুনিক বাংলাদেশ গঠনে যে শিল্পের থাকবে অপরিসীম ভূমিকা। আর অবমুক্তকৃত বর্তমানের পুরান ঢাকা হবে অন্তত ৪০০ বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ হ্যারিটেজ। প্রাচীন ঐতিহ্যের একটা চমৎকার হ্যারিটেজ। রাজধানীর ভিতরে থাকা একটা বিশাল পর্যটন সম্পদ। তাজমহলের মত সম্পদ হবে না সত্যি; তবুও বাঁধভাঙা জোয়ারের মত বিদেশীরা ছুটে আসবে দেখতে। বিদেশী পর্যটকগণ এসবের মারাত্মক পাগল। ওরা এসবই খোঁজে। লক্ষ লক্ষ ডলার ভেঙ্গে ওরা এসব দেখতেই আসবে। নিশ্চিন্ত চিত্তে নতুন রাজধানীতে থেকেই পুরাতন রাজধানীকে দেখবে।
আগে থেকেই এই পুরনো রাজধানীতে লালবাগের কেল্লা আছে; আছে আহ্সান মঞ্জিল। আছে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় কারাগার মিউজিয়াম। কিন্তু প্রচন্ড জ্যাম এর কারণে পর্যটকগণ ওদিকটায় তেমন যেতে পারে না। যাবার সুযোগই নেই। নতুন সিদ্ধান্তে জ্যাম উঠে যাবে। আর বর্তমানের পর্যটন স্থানগুলোর সাথে যোগ হবে এসব আধাভঙ্গুর ভবন; যা ইতিহাস ঐতিহ্যকে মেলে ধরবে। আজকের আগুনঝরা উত্তপ্ত পূরান ঢাকা হবে উত্তাপহীন এক শহর। দেশবিদেশের পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত গর্ব করার মত পর্যটনের এক নতুন শহর।
অবশ্য গর্বটা করবে কে? জনগণ? আলবৎ করবে। জনগণ সামান্যতম গর্ব করার সুযোগ পেলে অসামান্য রকমের গর্ব করে। কিন্তু জনগণের এমনি গর্ব করার মত চমৎকার কাজটা সরকারে থাকা যেসব লোকজনের করার কথা তারা কি আদৌ ব্যাপারটি বোঝে? বুঝলাম, তারা বোঝে না। কিন্তু যারা সরকারে যাবার জন্যে এত হাপিত্যেস করছে তারা বোঝে তো? নমুনা তো তা বলে না। যারা রাজনীতিটাই এখনো ভাল করে বোঝে উঠতে পারছে না তারা বুঝবে উন্নয়ন!
তারা বোঝে এবং খোঁজে সুযোগ। কেবলই সুযোগ। আর পারে ঝিমাতে। সুযোগের অপেক্ষায় নিশ্চিন্তে ঘুম চোখে ঝিমায়। রাতে ভাল ঘুম না হলে সকালে যেভাবে মানুষ ঝিমায়, দেশের বিরোধীদল এখন ঠিক সেভাবে ঝিমাচ্ছে।
ডঃ কামাল থেকে শুরু করে মান্না-রব সাহেব; বাকী নেই কেউ। ফখরুল-জাফরউল্লাহও মুখে তালা মেরেছেন। তবে আশা ছাড়েননি। আশায় আশায় আজো পথ চেয়ে আছেন। কখন কোথায় আগুন লাগে, নিরাপদ সড়ক কখন অনিরাপদ হয়; কখন শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসে রাষ্ট্র্রযন্ত্র মেরামতে নামে এই আশায় পথপানে চেয়ে আছেন।
আশানিরাশার দোলাচলে সবচেয়ে করুণ অবস্থা জাতীয় পার্টির। এইচ এম এরশাদ একসময় বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মানে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মানে সিএমএলএ ছিলেন। কিন্তু এরশাদ আসলেই চিরকালীন সিএমএলএ। এই সিএমএলএ মানে “ক্যান্সেল মাই লাস্ট অ্যানাউন্সমেন্ট।” রাজনীতির ক্যারিয়ারজুড়ে এরশাদ সকাল বিকাল সিদ্ধান্ত বদলানোর ব্যাপারে ওস্তাদ। সেদিন আবারো বদলালেন। কলমের একখোঁচায় ছোটভাই কাদেরকে বের করে দিলেন।
ইদানীং অবশ্য তার একজন অনুসারী মিলেছে। ডাকসুর নবনির্বাচিত ভিপি নুরুল হক নুর। তিনিও সিদ্ধান্তহীনতায় এরশাদের কাছাকাছি। দিনে চারবার কথা পাল্টানোর রেকর্ড ইতিমধ্যেই করে ফেলেছেন। প্রায় প্রতিদিন কথা পাল্টান। কিন্তু তাতে কি! বিরোধী নেতা এবং বুদ্ধিজীবিদের একমাত্র ভরসা তিনিই। মিডিয়ারও একমাত্র খোরাক তিনি। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন নিউজ হয়। তিনি গাড়ি না পেয়ে উবার ডেকে রাস্তায় অপেক্ষা করছেন এটাও নিউজ হয়। বনানীর আগুন দেখতে নয়, আগুনের সামনে জাষ্ট ছবি তুলতে আসেন; সেটাও ভাইরাল হয়। বেফাঁস কথাটা নিজের মুখ থেকেই বের হওয়াতে এখন তিনি চরম বিব্রত। এবং একদমই চুপ।
কিন্তু তারপরও নুরকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জীবিত তারেক-খালেদাকে বাদ দিয়ে শেখ হাসিনার পাশে এসে দাঁড় করিয়েছে। বাড়াবাড়িটা চরম করছে বঙ্গবন্ধুর সাথে নুরের তুলনা করে। নুরের মাঝে তরুণ বঙ্গবন্ধুর ছায়া দেখছে স্বয়ং আসিফ নজরুল। তার কাজই কেবল ছায়া দেখা। ক’বছর আগে তারেক জিয়ার মাঝেও তিনি তরুণ জিয়ার ছায়াও দেখেছিলেন। তিনি সব জায়গায় ছায়া দেখেন। ছায়া দেখা এই ছায়া নজরুলের বুদ্ধিতে ডঃ কামালকে নেতা মেনে বিএনপি নির্বাচনে যেয়ে কায়া থেকে অলরেডি ছায়া হবার পথে। বঙ্গবন্ধুর আদলে নুরকে বঙ্গনুর খেতাব দেয়ার অপচেষ্টা করে মুর্খের এই দলেরা নুরকে কোন পথে নিয়ে যায় কে জানে।-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।