নানা আয়োজনে পহেলা বৈশাখ পালিত

2

কিরনঃ উৎসাহ উদ্দীপনার মাধ্যমে বর্ষ বরণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপি মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়।

সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন।
একক ও সম্মিলিত কন্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতায় ছায়ানটের শিল্পীরা স্বাগত জানান পহেলা বৈশাখকে। নানান রঙের পোশাকে এ সময় রমনার বটমূলে শতাধিক শিল্পী তাদের সুর-ছন্দ আর তাল-লয়ে বৈশাখের বন্দনা করে স্বাগত জানান নতুন বছর ১৪২৬-কে। তাদের সে আয়োজনে ছিলো বৈশাখের মগ্নতা, হৃদয়ে নতুনকে কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা।

বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ উপলক্ষে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণ থেকে বাংলা নববর্ষের বর্ণিল আকর্ষণ ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।

উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রাটি শাহবাগ মোড় হয়ে টিএসসি ঘুরে চারুকলায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অনেক বিদেশি অতিথিও উপস্থিত ছিলেন।
‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ উদ্বোধনের প্রাক্কালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেন, বাংলা নববর্ষ বাঙালির আবহমান কালের সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসব। এর মধ্য দিয়ে আমরা অনুভব করি উদার, মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই উৎসবের অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবিক মূল্যবোধের চেতনা সারাদেশের মানুষের মধ্যে বিরাজমান।
শোভাযাত্রায় আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী উপস্থাপনের জন্য নানা বিষয় স্থান পায়।
মঙ্গল শোভাযাত্রায় নিরাপত্তার কড়াকড়ি থাকলেও তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের কাছে হার মানে সবকিছুই। ঢাক-ঢোলের বাদ্য আর তালে তালে তরুণ-তরুণীদের নৃত্য, হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ-উল্লাস মাতিয়ে রেখেছিল পুরো শোভাযাত্রা।

সকল জেলা শহর, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলা শহর ও নদীবন্দর এলাকায় সকালে শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে বাংলা নববর্ষ বরণ উৎসব শুরু হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪২৬। ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। এসব আয়োজনের মধ্যে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার এন্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে নাটমন্ডলে নাটক ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের ঐতিহাসিক আমতলার মুক্তমঞ্চে খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে পরিবেশিত হয় শিশুদের বৈশাখ বরণ অনুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের উদ্যোগে সন্ধ্যায় শুরু হয়েছে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান।
মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে আজ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল ১০টায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়।
শোভাযাত্রাটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল, ওয়াইচ ঘাট, আহসান মঞ্জিল, মুন কমপ্লেক্স, পাটুয়াটুলী, বাটা ক্রসিং হয়ে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসে।
মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ‘নদী’। আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল স্লোগান ছিল- ‘‘বাঁচলে নদী বাঁচবে দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ”।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল সংগীত বিভাগের পরিবেশনায় নৃত্য ও দলীয় সংগীত, লোক সংগীত। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত মেলায় মিষ্টান্ন ও দধি, দেশীয় ফলসহ বিভিন্ন খাবারের স্টল, মাটির তৈরি তৈজসপত্র ও খেলনার স্টল স্থান পায়।
এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন একাডেমিক ভবনের নীচতলায় দিনব্যাপী ‘প্রকাশনা প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন গ্রন্থ, জার্নাল, সাময়িকী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বার্তাসহ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রকাশিত গ্রন্থ স্থান পায়।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ ছিল সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়।
এ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদফতর, আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদফর, জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, কপিরাইট অফিস, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বিসিক নববর্ষ মেলা, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ নানা অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। এ উপলক্ষে রাজধানীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়।

শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শন করা হয়। সব জাদুঘর ও প্রত্মস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ ছিল।

এ উপলক্ষে বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে একাডেমি।
জাতীয় প্রেসক্লাব বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকে খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবারের আয়োজনসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।