পহেলা বৈশাখ নিয়ে আামার কিছু কথা

37

আবুল বাসার খানঃ যেহেতু একদিন পরই পহেলা বৈশাখ । তাই আগে বলি উৎসব টা কি ?
উৎসবটা হল দুই প্রকার । একটা হল ধর্মীয় জাতিগত উৎসব এবং অন্য টা হল ভৌগিলিক লোক উৎসব । পহেলা বৈশাখও একটা লোক উৎসব । পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বঙ্গাব্দের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি সকল বাঙালী জাতির ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণের দিন। দিনটি বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সাথে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এই উৎসবে অংশ নিয়ে থাকে। সে হিসেবে এটি বাঙালিদের একটি সর্বজনীন লোক উৎসব হিসাবে বিবেচিত।। এই উৎসব শোভাযাত্রা, মেলা, পান্তাভাত খাওয়া, হালখাতা খোলা ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়। বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যবাহী শুভেচ্ছা বাক্য হল “শুভ নববর্ষ”। নববর্ষের সময় বাংলাদেশে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত এই উৎসব শোভাযাত্রাকে “মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য” হিসেবে ঘোষণা করে ।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে পহেলা বৈশাখ নিয়ে কিছু মানুষের মধ্যে কেন সৃষ্টি হয়েছে বিভ্রান্তি? আমি মনে করি এর সঙ্গে দুটি দিক জড়িত। প্রথমত অনেক কট্টর ও গোঁড়া মুসলমানদের ধারণা পহেলা বৈশাখ হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আসলে বিষয়টি কিন্তু আদৌ সত্য নয়। সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেছিলেন খাজনা আদায়ে সুবিধা ও সুষ্ঠুতার জন্য। এখন আমাদের সামনে প্রশ্ন আসতে পারে খাজনা আদায়ের জন্য নতুন একটি সনের প্রয়োজন কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। মোগল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায় করা হতো আরবি হিজরি সন অনুযায়ী অথচ ফসল উৎপাদিত হতো সৌরসন অনুযায়ী। আমরা সবাই জানি যে, হিজরি সন হল চাঁদের হিসাব অনুযায়ী ।হিজরি চান্দ্রসন হওয়ায় এ সনের দিনের সংখ্যা ৩৫৪। অন্যদিকে সে সময়ের শকাব্দ নামে যে সৌরসন ছিল, দিনের হিসাবে সেটা-৩৬৫। অর্থাৎ চান্দ্রসন সৌরসনের চেয়ে ১১ দিন কম।
এই জন্যই আমরা দেখি প্রতিবছর রোজা কিংবা ঈদ নির্ধারিত দিনের চেয়ে ১১ দিন কমে আসে। ফলে ঈদ কখনও কনকনে শীতে আবার কখনও কাঠফাটা গ্রীষ্মে উদযাপিত হয়। ফসল চক্র সৌরসনের রীতি মেনে চলায় আদায়কৃত খাজনার হিসাব ও রাজকোষ মিলাতে গরমিল হতো। দেখা যেত হিজরি সনের যে মাসে যে ফসলে খাজনা হিসেবে জমা হয়েছে সেই একই মাসে তিন চার বছর পর অন্য ফসল জমা হয়েছে।
যেমন তিন বছর আগে মহররম মাসে আউশের ফসল আউশ ধান জমা হয়েছে (ঋতুভিত্তিক মাস শ্রাবণ) তিন বছর পর মহররম মাস এসেছে ঋতুচক্রে আষাঢ়ে। তখন মহররম মাসে তিলের ফসলের খাজনা জমা হয়েছে। আবার হিজরি সনের মাস নির্দিষ্ট রেখে খাজনা আদায় করতে হলে কোনো কোনো সময় দেখা যেত তা ফসল বপনের সময়, কর্তনের সময় নয়।সম্রাট আকবর এ সন প্রবর্তন করলেন রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার্য খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানাদি পালনে বাংলা সন অনুসরণে তাদের কখনও বাধ্য করা হয়নি।
পহেলা বৈশাখকে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার আরেকটি কারণ হয়তো বা আমার মতে- হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন। কারণ চৈত্রসংক্রান্তি পালন করা হয় চৈত্র মাসের একেবারে শেষ দিন। আর তারপরই আসে পহেলা বৈশাখ। মুসলমানদের মধ্যে কতজন এটা জানেন আমি ঠিক বলতে পারব না তবে না জানলেও জানা উচিত যে , হিন্দু ধর্মে প্রায় প্রতি মাসের শেষেই একটি করে সংক্রান্তি পালিত হয়। যেমনম- চৈত্র, আশ্বিন, ভাদ্র, অগ্রহায়ই, পৌষ প্রভূত সংক্রান্তি এবং প্রতিটি সংক্রান্তিতেই পূজা-পার্বণের ব্যবস্থা থাকে। যেমন চৈত্র সংক্রান্তিতে ছাতুদান ও ছাতু খাওয়ার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
আশ্বিন সংক্রান্তিতে চাষীরা প্রত্যুষে কাঁচা হলুদ বাটা সরষের তেলের সঙ্গে মিশিয়ে ধানের ক্ষেতে ছিটিয়ে দিয়ে বলে- ধান রে সাধ খা/পাইক্যা ফুইল্যা ঘরে যা। আসলে সংস্কৃতি বিষয়টি বেশ গোলমেলে ও জটিল একটি বিষয়। এই যে আমরা প্রতিবছর শীত মৌসুমে দলবেঁধে গাড়ির বহর সাজিয়ে
বনভোজনে যাই, কেউ কি বলতে পারেন কোত্থেকে এসেছে এই সংস্কৃতি? পৃথিবীর অন্য কোথাও কি এভাবে বনভোজন করার রীতি আছে? না নেই। এটা এসেছে হিন্দু পৌষসংক্রান্তি উদযাপন থেকে। [ কিছু তথ্য সংগৃহীত ]

এখন আসি অহেতুক বিতর্ক করতে করতে আমাদের কর্মের তফাৎ কতখানি হয়েছেে তা একটু বর্ননা করিঃ
আগে পহেলা বৈশাখে মা সকাল বেলায় পানির কলসের মুখে কলা পাতা দিয়ে মুড়ে দিতেন এবং সেই পানি দিয়ে ভাত রান্না করতেন ৷ সবাই মিলে পুকুরে বড় রুই কাতল মাছ ধরতাম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে ৷ পহেলা বৈশাখে মেলা বসত এবং ঘোড়ার দৌড় হত ৷ বাঙালির প্রতিটি উৎসবে সবাই মিলে আনন্দ করতাম ৷ গ্রাম বাংলায় বিয়ে সাদিতে মাইকে মুজিব পরদেশির গান বাজত ৷ আমরা দেথতে যেতাম ৷ স্কুল , কলেজ গুলোতে সাংস্কৃতিক চর্চা হত ৷ শিক্ষকরা বলতেন সবাইকে গান গাইতে হবে এবং সবাইকে একে একে স্টেজে ডাকত গান গাওয়ার জন্য ৷
কথাগুলো লিখলাম এইজন্য যে , সেই দিনে ধর্মের নামে কোন মানুষ হত্যা করা হতনা ৷ ছিলনা সেই সময় কালে ধর্মের নামে কোন উগ্রবাদী সংগঠন ৷ ছিলনা জুমুআর নামাজ বাদ দিয়ে মানুষ হত্যার নিষ্ঠুর কাজ ৷ আমার কথা হল সেই যুগের মানুষগুলো কি নামাজ করেনি? ?

আজকে পহেলা বৈশাখে কোন উৎসব গ্রাম বাংলায় দেখা যায়না ৷ নবান্ন উৎসব পালন করা হয়না ৷ বিয়ে সাদিতে কোন গান বাজানো হয়না ৷ স্কুল, কলেজগুলোতে কোন বিনোদন চর্চা নাই ৷ কারন এগুলো নাকি ধর্মে জায়েজ নাই ৷ বাঙালির কোন উৎসবের আয়োজন করলে তাদেরকে ধর্মীয় অজুহাতে বন্ধ করে দেয়া হয় ৷
বুঝলাম ধর্মে এগুলো নাই , তাহলে জুমুআর নামাজ না পড়ে ঐ সময়ে আল্লাহু আকবর স্লোগান দিয়ে যারা মানুষ হত্যা করতে যায়, যারা পবিত্র রমজান মাসে মানষকে জিম্মি করে সেহরি খাওয়ার সময় মাথায় টুপি পাগড়ি পড়ে মানুষ হত্যা করে এটা কোন্ ধর্মে লেখা আছে? ? প্লিজ কেউ আমাকে এই প্রশ্নের উত্তর দিবেন কি!-লেখকঃ একজন চাকুরীজীবী, বরিশাল।