ওরা আসবে! চুপি চুপি!! যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ!!!

5

ইঞ্জিঃসরদারমোঃশাহীনঃ মেয়েটার নাম ছায়াবীথি। ছদ্মনাম। জানা নামটা ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গেলাম। বিব্রত হতে পারে এই ভেবেই এড়িয়ে যাওয়া। অবশ্য ওটাও যে সঠিক নাম তাও জানি না। সোস্যাল মিডিয়ায় সঠিক বলতে, সত্যি বলতে কিচ্ছু নেই। সবই ধোঁয়া ধোঁয়া। তবুও ধরে নিচ্ছি জানা নামটাই সত্যি। নামটা জানা থাকলেও তার সাথে তেমন জানাশুনা নেই। ফেসবুকে আজকাল কাউকে তেমন জানতে হয়ও না। দুটো লাইক আর একটা কমেন্টে দূরের মানুষও কাছের হয়ে যায়। আবার আনফলো, আনফ্রেন্ড এবং ব্লকের ধাক্কায় হারিয়েও যায় চিরতরে।
ছায়াবীথি নামের মেয়েটা হয়ত হারিয়ে যাবে না। অন্তত লক্ষণ তা বলে না। আমার লেখার অনুরাগী। অনলাইনে লেখা আপডেট হতে দেরী হয়, পড়তে দেরী হয় না তার। তবে সমস্যাও আছে। লেখা হতে হবে তার মত; আমার মত হলে হবে না। বক্তব্যধর্মী কঠিন লেখা তার পছন্দের তালিকায় নেই। বিষয়বস্তু নিয়েও মাথা ব্যথা নেই। মাথা ব্যথা কেবল একটা নিয়েই; হতে হবে মজার লেখা, হাসির লেখা। কোনভাবেই রাজনীতি বিষয়ক কোন লেখা হতে পারবে না।
গেল সংখ্যায় রাজনীতি নিয়ে লেখাটি অনলাইনে যাবার পর ছায়াবীথি ক্ষেপে মহা আগুন। সাধারণত ক্ষেপে না। আজকে ক্ষেপেছে। “আপনার রসকষের ভান্ডার কি শেষ, জনাব? নাকি সমাজের অসংগতি আর চোখে পড়ে না! না পড়ুক। কিন্তু দুনিয়াতে তো আরও কত বিষয় আছে; সে সব নিয়ে কত কিছু লেখা যায়। ও সব রেখে ফালতু রাজনীতি নিয়ে লেখেন কেন, ভাইজান! কিচ্ছু না পেলে রোমান্টিক লেখা লেখেন। প্রেম নিয়ে লেখেন। তবুও মানুষ খাবে। রাজনীতি নিয়ে বস্তাপচা লেখা যতই লেখেন পাবলিকে খাবে না। এদেশে যারা রাজনীতি নিয়ে লেখে কিংবা সেই লেখা চুকচুক করে পড়ে তাদের সুস্থতা নিয়ে আমার যথেষ্ঠ সন্দেহ আছে।”
সন্দেহ আমার শোনিমেরও আছে। ওর সন্দেহ লেখা নিয়ে নয়; আমার চোখ নিয়ে। কঠিন সন্দেহ। ওর ধারণা আমার অন্ধ হতে বেশীদিন বাকী নেই। দিনে দিনে চোখের ক্ষমতা যেমনি কমছে আর চশমার পাওয়ার যেমনি বাড়ছে, অন্ধ হতে তো আর বেশী সময় লাগার কথা না। তখন চাইলেও আমি লিখতে পারবো না। না হয় নাই বা লিখলাম; নো প্রবলেম। কিন্তু শেষ বয়সে ওর ছেলেমেয়ের কী হবে! ওদেরকে তো সময় দিতে হবে আমার। অন্ধ হলে কি ভাবে কী করবো! আর অন্ধ দাদাভাইকে নিয়ে ওরাও তো মহা বিপদে পড়ে যাবে।
নিজের বিপদ নিয়ে ভাবনা নেই; ভাবনা তার অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে। দুষ্টের হাড্ডি হয়েছে একটা। দুষ্টামির ছলে এসব মিটমিট করে বলে আর খিটখিট করে হাসে। হাসির মধ্যেই দুষ্টামি। সারাদিনই কেবল দুষ্টামি। এতটুকুন পিচ্চি ছেলে আমার। আর সে কিনা তার পিচ্চি নিয়ে ভাবছে। পিচ্চিকে নিয়ে টেনশান করছে। এখনই এমন; বড় হয়ে আরো কতটা দুষ্ট হয় কে জানে!
তবে ওর চেয়ে বড় দুষ্টও আছে। শোনিমই আমাকে সেদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। রাত বারোটার পরপরই শহীদ মিনারের বেদীতে জুতা পায়ে ওরই বয়সী দুষ্টের দলের লাফালাফি আর সেলফী তোলা দেখে শোনিমই আমায় বললো, আব্বু দেখো! কেবল আমি না! ওরা আমার চেয়েও দুষ্ট। দেখে কিছুটা অবাক হয়েছি। তবে কষ্ট পাইনি। এই ভেবে যে, ওরা এখনো অবুঝ; ওরা শিশু। তাই ওদের এসব দেখেও ততটা ভাবতে চাইনি।
তবে না ভেবে পারিনি পরমূহুর্তের দৃশ্যগুলো দেখে। বলা যায় গা শিউরে উঠেছিল বেদীতে কল্পনাতীত দৃশ্যাবলী অবলোকন করে। সিটি নির্বাচনের কাউন্সিলর প্রার্থী দলবল নিয়ে এসেছেন। উপস্থাপক মুখে ফেনা তুলে ফেলছে তার বর্ণনা দিতে দিতে। আয়োজকদের প্রধান তাকে অভ্যর্থনায় ব্যস্ত। বেদীর তিনটি ধাপে তিনি সহ কাউন্সিলর প্রার্থী সদলবলে দাঁড়িয়ে ফটো সেশন চালাচ্ছেন। বেদীকে পেছনে দিয়ে দাঁড়িয়েই সেশন চলছে।
স্বয়ং মহামান্য রাষ্ট্রপতিও বেদীকে পেছন দিয়ে কখনো দাঁড়ান না; ফটো তোলেন না। এটাই একুশের কালচার; একুশের চেতনা। ৬৭ বছর ধরে মনেপ্রাণে লালন করা বাঙালী জাতির চেতনা। কিন্তু তারা অবলীলায় চেতনার মূলে কুঠারাঘাত করেছেন। হাহা হিহি হাসির উচ্ছলতায় ফটো তুলেই যাচ্ছেন। ফটো তোলা আর শেষ হয় না। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আমার মত অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে। না দাঁড়িয়ে উপায়ও নেই। তারা না নামলে আমাদের বেদীতে ওঠার জোঁ নেই। তারাই তো সব। তারাই নেতা।
হয়ত নেতা বলেই কেউ কেউ জুতা পায়েই বেদীতে ওঠতে পারছেন। কে দেখে এসব! সবাই ব্যস্ত হাসিমুখে পোজ দিতে। অবশেষে গায়ে পরে উপস্থাপকের কাছে গেলাম। তিনি পাত্তাই দিলেন না আমায়। পাত্তা দিলেন বেদীতে থাকা ভদ্রমহিলাদের। তাদেরকে ডানবাম ঠিক করে ছবি তুলে দিচ্ছেন। না তুলে উপায় কি! পার্লার থেকে সবাই সেজেগুছে এসেছেন। তবে সাজ দেখে বোঝার উপায় নেই তারা কোথায় এসেছেন। শহীদের বেদীতে নাকি কনের গায়ে হলুদে; সত্যি বোঝার উপায় নেই।
বোঝার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে বলেই হয়ত বুঝতে পারছি না। কেননা, স্মৃতি তো বলে না একুশকে আমরা কোনদিন এভাবে জানতাম কি না। ছোটবেলা থেকেই জানতাম একুশ মানে রক্তঝরা ভাষার আন্দোলন; একুশ মানে মাতৃভাষার স্বীকৃতি। একুশ মানে সালাম, বরকত, রফিক, শফিক এবং জব্বারের রক্তে রাঙানো শোক। একুশ মানে শোকের পোষাক গায়ে চড়িয়ে খালি পায়ে মৌন মিছিলে শহীদ মিনারে যাওয়া। একুশ মানে কষ্টমাখা মনে শহীদদের ফুলেল শ্রদ্ধা জানানো। একুশ মানে কোরাসে গাওয়া, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী! আমি কি ভুলিতে পারি!!
রাজধানী ঢাকার উত্তরা শহরে একুশের প্রথম প্রহর উদযাপন দেখে আমার ভুল ভেঙেছে। বুঝতে পারছি বদলে যাওয়া দেশে একুশও বদলাচ্ছে। না হলে তো এমন হবার নয়। কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর সদলবলে বিদায়ের পর আয়োজকদের প্রধান তার পরিষদ নিয়ে এগিয়ে এলেন। দখলে নিলেন পুরো শহীদ মিনার। নাম ধরে ধরে ডেকে নিলেন নিজেদের কাছের জনাদের। আর বসালেন বেদীর তিন ধাপের সিঁড়িতে। তার আনন্দ চোখে পরার মত। প্রত্যেককেই যার যার বিবিদের পাশে বসালেন। শুরু হলো মিলনমেলা। উছ্লে পড়ছে মিলনের ঢেউ। পাড়াপড়শি ভাইভাবীদের একুশের আনন্দ উছ্লে পড়ছে শোকে বিহ্বল শহীদ বেদীর চারপাশে।
আনন্দ প্রকাশের এই ধারায় সবচেয়ে দৃষ্টিকটু ছিল সমস্বরে এবং উচ্চস্বরে কোরাসীয় অট্টহাসি। কেউ বাদ যাননি। উপস্থাপক নিজেও চলে এসেছেন। তুলছেন ছবির পর ছবি। নানাপোজে, নানা ভঙিমায় বেদীর ধাপে এবং পুরো বেদী জুড়ে ছবি তোলার মহরত। এভাবেই বরণ করে নেয়া হলো একুশকে। জাতীয় শোক দিবসের প্রথম প্রহরে শোককে শক্তিতে পরিণত করে তারা বেদীকে আনন্দানুষ্ঠানের মঞ্চে পরিণত করলেন। পিকনিকের আমেজের সংগে এর সামান্য পার্থক্য আর অবশিষ্ট রইলো না।
নিঃসন্দেহে তারা প্রত্যেকেই শিক্ষিত সমাজের প্রতিভু। অন্তত পোষাক পরিচ্ছদ আর চেহারা তাই বলে। তাদের একুশকে চেনার কথা। জানার কথা। কিন্তু তাদের মাঝে কি একজন মানুষও ছিল না যিনি একুশকে লালন করেন! ধারণ করেন! একবারও তারা ভাবলেন না প্রতিকী এই বেদীর কথা। যেখানে মাতৃরূপী বাংলা মা রক্ত দেয়া সন্তানদের আগলে ধরে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন।
কে জানে হয়ত আশায় আশায় কানও পেতে আছেন! হয়ত আসবে জীবন দেয়া তার সেই শহীদ সন্তানেরা। আর মনভরে দেখবে তাদের জন্যে সম্মান আর শ্রদ্ধাঞ্জলীর ডালা নিয়ে নতুন প্রজন্ম ভীড় জমিয়েছে শহীদ মিনারে। বাঙালী জাতিসত্বা বাঁচিয়ে রাখার অন্যতম এই মিনার জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। কোন ভাবেই ভুলতে দেয়নি রক্তে রাঙানো ৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারীকে। মুছতে দেয়নি প্রতিটি বাঙালীর মনের গহীনে লেগে থাকা শহীদদের রক্তের ছোপ ছোপ দাগ।
এসব ভেবে বড় অসহায় মনে হয়েছিল নিজেকে। আর ফেরার পথে মনে হয়েছিল সময় হয়েছে। বাঙালীর মনকে খুব করে পরখ করার সময় হয়েছে। ইত্যবসরে কতটা বদলেছি তা পরখ করা এখন খুবই প্রয়োজন। আর প্রয়োজন এখনই সব ক’টা মনের জানালা খুলে দেয়ার। সময় তো তেমন নেই। সামনেই যে স্বাধীনতা দিবস! বদলে যাওয়া এই আমাদের দেখতে নিশ্চয়ই আবার ওরা আসবে! চুপি চুপি!! যারা এই দেশটাকে ভালবেড দিয়ে গেছে প্রাণ!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।