ডাকসু নির্বাচনঃ কে ভিপি! কার ভিপি!!!

184

হাসিদুল ইসলাম ইমরানঃসদ্য সমাপ্ত চরম বিতর্কিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেখলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। ডাকসু’র ইতিহাসে এটি একটি জঘন্যতম অর্জন হিসেবে স্বীকৃত হবে যদি এই বিতর্কিত পরিষদ তার কার্যক্রম চালু রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামটি উচ্চারিত হলেই চলে আসে মুক্তবুদ্ধি, প্রগতিশীলতা, দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ এক ঝাক তরুণ বিপ্লবীদের সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি, স্মৃতিতে আসে ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, গনঅভ্যুথান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, সামরিক শাসক বিরোধী ছাত্র-শিক্ষক আন্দোলনের গল্পকথা। এই সব গল্পগুলোই ঐতিহাসিক সব ঘটনার জন্মের জীবন্ত স্বাক্ষী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে ঐতিহ্যবাহী করে তুলেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। আপোষহীনভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার মুখ্য কারিগর হচ্ছে এই ডাকসু। দেশের জাতীয় পর্যায়ের সকল নেতার উত্থান এই ডাকসুকে ঘিরেই। এই ডাকসু জন্মদিয়েছে প্রগতিশীল নেতা রাশেদ খান মেননকে, জন্ম দিয়েছে মতিয়া চৌধুরীর মত অগ্নিকন্যা, তোফায়েল আহমেদ, আসম আব্দুর রব, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মত জাতীয় নেতাকে। ডাকসু’র নির্বাচিত নেতারা অঘোষিতভাবে এদেশের সকল ছাত্র সমাজের নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। দেশের সকল সংকটে কার্যকরী ভুমিকা রেখে ডাকসু তার আস্থার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। কিন্ত নব্বইয়ে স্বৈরাচারবিরোধী সফল আন্দোলনের পর ক্ষমতাশীন দলগুলো অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে এড়িয়ে চলতে ডাকসুকে প্রধান প্রতিপক্ষ মনে করে বন্ধ করে দেয় ডাকসু নির্বাচন। ফলে বন্ধ হয়ে যায় নেতৃত্বের আতুড়ঘর খ্যাত ডাকসুর কার্যক্রম। ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায় দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ। সংকট বাড়তে থাকে ছাত্র রাজনীতি তথা দেশের রাজনীতিতে। মেধা ও সংষ্কৃতি চর্চার রাজনীতির জায়গা দখল করে পেশীশক্তির রাজনীতি। কলম ছেড়ে ছাত্রনেতাদের হাতে চলে আসে অস্ত্র। চালু হয় অস্ত্র দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল ও সাধারন ছাত্রদের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রনে রাখার রাজনীতি। আদর্শচর্চার পরিবর্তে টেন্ডারবাজি, ভর্তিবানিজ্য, হলে সিট বানিজ্যের মাধ্যমে চুড়ান্ত বানিজ্যিক আকার ধারন করে ছাত্র রাজনীতি। পাশাপাশি গড়ে ওঠে বিভিন্ন ধর্মকে পুঁজি করে মৌলবাদী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এবং তৈরি হয় এক ঝাঁক “আই হেট পলিটিক্স” প্রজন্ম। যা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের রাজনীতি চুড়ান্ত পরিনতির পথে হাটতে শুরু করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বিরক্ত হয়ে ঘোষনা শুরু করে রাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস। এমন কঠিনতম সময়ে সর্বজনগৃহীত দাবীর প্রেক্ষিতে ঘোষনা আসে ডাকসু নির্বাচন। ছাত্র রাজনীতি ও দেশের আপাময় মানুষের মাঝে জেগে নতুন উদ্দীপনা। ছাত্রত্ব নেই তবুও আবেগের টানে ছুটে যাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকসু নির্বাচনের কার্যক্রম দেখতে। কে হবে ডাকসুর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৮ বছর পর ছাত্রদের দিকপাল?
ডাকসুকে ঘিরে তাই উৎসাহ, উদ্দীপনা কোন কমতি ছিলো না দেশের নানা প্রান্তের ছাত্র জনতার মাঝে। প্রত্যেকেই আশায় বুক বেধেছিলো ডাকসুরই পরই ছাত্র সংসদ নির্বাচন আসবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। সব আশা, সব স্বপ্নকে ধুলিষ্মাত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষপাতমুলক আচরণে সৃষ্টি হলো ডাকসুর ইতিহাসের নিকৃষ্টতম অধ্যায়। ছাত্র সংসদেও নির্বাচন নামক অদ্ভুদ তামাশায় মেতে উঠলো সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। ভোটকেন্দ্র দখল, কর্তৃপক্ষের সহায়তায় আগের রাতেই ব্যালটপেপারে সিলযুক্ত বাক্স ভর্তি, সাধারন ছাত্রদের ভোট কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া, প্রার্থীকে মারধর-ধাওয়া। অনিয়ম ও অনৈতিকতার সকল উপাদানে পরিপূর্ণ নির্বাচনটি দুপুরবেলাতেই তামাশার আয়োজনে রুপ লাভ করে। শুধুমাত্র ছাত্রলীগ ছাড়া অংশগ্রহনকারী সকল ছাত্র সংগঠন ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করে প্রহসনমূলক নির্বাচন। অংশগ্রহনকার প্যানেলের মধ্যে বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন প্রগতিশীল জোট, ছাত্রলীগ (জাসদ), ছাত্রলীগ (বিসিএল), জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ছাত্র ফেডারেডারেশন, স্বতন্ত্র জোট ২টি সহ শুধু সরকার সমর্থিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগ বাদে সবাই নির্বাচনকে প্রত্যাখান ও পুনঃনির্বাচনের দাবী জানিয়েছে। পাশাপাশি আগামীকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এই কলংক থেকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই প্রহসনের নির্বাচনকে তাদের ঐতিহাসিক অর্জন মনে করে একপক্ষীয় ফলাফল প্রকাশে মেতে উঠেছে। এই প্রহসন ও কারচুপির নির্বাচনে অবৈধভাবে জয়লাভ করা ছাত্রলীগ নেতারা কেমন নেতৃত্ব দেবে, কার নেতৃত্ব দেবে?
এ প্রশ্নটি আজ খুব প্রাসঙ্গিক।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কি প্রহসনমুলক নির্বাচনী কলংকের দায় মাথায় নিয়ে চলবে?
নাকি ছাত্রদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিবে??-লেখকঃ দপ্তর সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।