সমুদ্রপথে আবারো শুরু হয়েছে মানব পাচার

3

তালেব রানাঃ আবারো শুরু হয়েছে কক্সবাজারের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সমুদ্রপথে মানবপাচার। এক্ষেত্রে সক্রিয় রয়েছে দেশি-বিদেশি পাচার চক্র। যারা মাছ ধরা নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের। মালয়েশিয়ায় কাজের আশায় পাচার চক্রের ফাঁদে পা দিচ্ছে অনেক বাংলাদেশিও।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া থেকে সমুদ্রপথে পাচারকালে ৫০ জনকে উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এ নিয়ে চলতি বছরে প্রায় ৭০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন দালালকেও আটক করা হয়। এদিকে ইন্দোনেশিয়ায় উদ্ধার করা হয়েছে ২৫০ বাংলাদেশিকে। যারা সমুদ্রপথে পাচারের শিকার হয়েছেন। মালয়েশিয়ায় কাজ দেওয়ার কথা বলে পাচারকারীরা তাদের সেখানে আটকে রেখেছে বলে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

বর্ষা মৌসুমের শেষেই সমুদ্রপথে মানব পাচার শুরু হয়। ২০১৫ সালে সমুদ্র পথে মানব পাচারের ভয়াবহতা প্রথম প্রকাশ পায়। ওই বছরের মাঝামাঝি মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের কিছু ক্যাম্প ও অভিবাসীদের গণকবর আবিষ্কারের পর পাচারের শিকার মানুষের চরম মানবিক বিপর্যয়ের বিষয়টি সামনে আসে। এরপর পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সরকারকে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়তে হয়। ফলে কিছুটা হলেও নিস্ক্রিয় ছিল আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রগুলো। কিন্তু বাংলাদেশে ব্যাপকহারে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেওয়ার পর আবারো তারা সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

টার্গেটে রোহিঙ্গারা

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার শামলাপুর উপকূল থেকে ১৫ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার করে পুলিশ। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার টেকনাফ ও উখিয়া থেকে ৫০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবির টেকনাফস্থ ব্যাটালিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আছাদুদ-জামান চৌধুরী জানান, কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া ৩০ জন রোহিঙ্গাকে সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করার সময় বিজিবি সদস্যরা উদ্ধার করে। এসময় দু’জন স্থানীয় দালালকেও আটক করে বিজিবি সদস্যরা।

উখিয়ার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পাচারের সময় ২০ জন রোহিঙ্গাকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা রফিক উদ্দিন বাবুল জানান, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত স্বজনদের আহবানে সাড়া দিয়ে সাগর পথে যাওয়ার জন্য আবারো তত্পর হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গারা। ইতিমধ্যে বেশ কিছু রোহিঙ্গা পাচার হয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার আরো একটি ফিশিংবোটে প্রায় শতাধিক যাত্রী পাড়ি জমাতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন খবরের ভিত্তিতে উখিয়া থানা পুলিশের একটি দল উখিয়ার উপকুলীয় ডেইলপাড়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে নারী পুরুষ শিশুসহ ২০ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে।

পাচারের শিকার বাংলাদেশিরাও

গত মঙ্গলবার ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা দ্বীপের মেদান শহরের একটি তালাবদ্ধ দোকান থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯৩ জন বাংলাদেশিকে। এর একদিন পর আরো ৫৯ জন বাংলাদেশিকে আটক করে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। সব মিলিয়ে ২৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি এখন ইন্দোনেশিয়ার বন্দিশিবিরে রয়েছেন। মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের পাচার করা হয়েছে বলে ইন্দোনেশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। কাজের জন্য মালয়েশিয়ায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে টুরিস্ট ভিসায় এই বাংলাদেশিদের বালি ও ইয়োগাকার্তা শহর দিয়ে সুমাত্রায় আনা হয়। মেদানের প্রধান অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, বৈধ কাগজ-পত্র না থাকায় শিগগিরই এসব বাংলাদেশিকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।

বাংলাদেশে নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলো বলছে, সাগরপথে মানব পাচারের ঘটনায় দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে। শ্রমবাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যার সমাধান করতে হলে বৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার পথ সহজ করতে হবে। বিশেষ করে যেসব এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বেশি সেখান থেকে লোক পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। কর্মী প্রেরণ ও মানব পাচার রোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন তারা।-ইত্তেফাক