অতএব; সাধু সাবধান!!!

17

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ এই পৃথিবীতে যত জটিল বিষয় আছে তার মধ্যে সময় জিনিসটিকে আমার সবচেয়ে জটিল এবং অদ্ভুত মনে হয়। মাথা খাটিয়েও এর আগামাথা বের করতে পারিনা। অবশ্য আমার মাথার যে অবস্থা, তা দিয়ে বের করা সম্ভবও না। এসবে আমার গোবরে মাথা না; দরকার হকিংসের বিজ্ঞানী মাথা। কেননা সময় কেবল জটিল নয়, খুব গতিশীলও। ওকে নিয়ে ভাবার আগেই ও এগিয়ে যায়। খুবই তাড়াতাড়ি এসে অতীব তাড়াতাড়িই চলে যায়। বলতে না বলতেই কিভাবে কত দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায়, বোঝাও যায় না।
আবার বিষয়টা সময় নিজেই কাউকে বুঝতে দেয়না। সবাইকে নানান ব্যস্ততায় ব্যস্ত রেখে সর্বদা নিজের মত করেই সময় চলে। বলে কয়ে যায় না। কারো ধার ধারে না। কাউকে কেয়ারও করে না। যা করার তার মত করেই করে। তবে চলার পথে মানুষের জীবনকে ওলটপালট করে দিয়ে যায়। আশা নিরাশার দোলাচালে রেখে ফুরুৎ করে এসে ফুরুৎ করেই চলে যায়। মানুষ সর্বদা এই নিষ্ঠুর সময়ের অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু সময় কোনদিনও মানুষের অপেক্ষায় থাকে না। তাইতো আমার দুষ্ট শোনিম বেশ মজা করেই বলে, টাইম এন্ড হাগু ওয়েট ফর নান।
শুধু অপেক্ষা নয়, যায় সময় আর কখনো ফিরেও আসে না। বিষয়টি খুবই জানা জিনিস। তারপরও আমরা অপেক্ষায় ছিলাম; সময় আবার ফিরে আসবে এই অপেক্ষায়। সময়টা ২০১৩ সালের মার্চের মাঝামাঝি। কৈশোরের হাজারো স্মৃতি বিজড়িত বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং পূর্ণমিলনী অনুষ্ঠানের চমৎকার সমাপনীর পর থেকে অপেক্ষায় ছিলাম। আবারো মিলবো সবাই! আবারো গাইবো গান! বলতে দ্বীধা নেই; আজো অপেক্ষায় আছি! দিনটি আবার ফিরে আসার! কিন্তু আসে না!
শুধু ছবি আসে আর মনে ভাসে। অতীতের সব ছবি। মনে পড়লে অদ্ভুত শিহরন জাগে সারা দেহমনে। দুদিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে চমৎকার চমৎকার সব স্মৃতি আছে। মজার স্মৃতি যেমনি অনেক আছে, তিক্ততার স্মৃতিও কম নয়। নিজের স্কুলের প্রোগ্রাম। উদ্যোক্তাদের একজনও আমি। তাই কেমন করে যেন পুরো বিষয়টির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। নিজের অজান্তেই পেছন থেকে নেতৃত্ব দেবার একটা অংশ হয়ে গিয়েছিলাম। যদিও আমার মত অতীব সাধারণ কারো পক্ষে সামনে তো ভাল, পেছন থেকেও নেতৃত্ব দেয়া হাস্যকর ছাড়া আর কিছুই নয়।
হয়ত এজন্যেই বিষয়টি ভালভাবে নেয়নি তাঁরা। সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ গন্ধ খুঁজেছে। নাক টেনে টেনে গন্ধ খুঁজেছে। দাওয়াত কার্ড ছাপাবার আগে কেউকেটা অতিথি হবার মৌখিক সম্মতির জন্যে কর্মীরা যখন বড়বড় মাথাদের কাছে গেছে, চোখ কপালে তুলে সবার একটাই প্রশ্ন কেবলই আমাকে নিয়ে; উনি কেডা? দাওয়াত পত্রে এই বেডার নাম থাকবো কেন? তাও আবার বিশেষ জায়গায়! এত্ত এত্ত বড় বড় মাথা থাকতে এই বেডারে মঞ্চে মন্ত্রী বাহাদুরের পাশে কেন রাখতে হবে?
আরো কত কথা! বিষয়ডা বুঝতাছি না। রহস্যডা কি? নামবো নাকি মাঠে? আইচ্ছা, নামবার দাও; নাচবার দাও। অত্ত সোজা না, বুচছো! কত্ত দেখলাম। কত্ত আইলো আর গেল। টেহার গরম কয়দিন? কাঁচা টেহা ভাঙবার দাও। যত্ত টেহাই ভাঙুক, আমরার কাছে না আইলে, পাছ পাছ না ঘুরলে কাম অইতো না। এ প্রশ্ন সবার। ছোটবড় সব নেতার। এলাকার এমপি সাহেব তো ঢাকায় লোক পাঠিয়েছেন গোপনে আমার সব খবরাখবর জানার জন্যে। তাদের পেরেশানির শেষ নাই। ঘুমও গেছে; ইজ্জতও যায় যায় করছে। ঢাল তলোয়ার বিহীন এই নিধিরাম সরদারকে কেউই মেনে নিতে পারছে না।
অনুষ্ঠানের দিনটা ছিল আরো মজার। আমি তো সাত সকালে গিয়েই হাজির। পারলে ফজরের পরপর গিয়ে উঠি। কলেজের বিশাল মাঠে লোকজন তখনও ততটা এসে পৌঁছায়নি। তবে পুলিশে ভরে গেছে। জেলার বড় নেতা আসবে, এমপি আসবে; আসবে স্বয়ং মন্ত্রী বাহাদুরও। তাই প্রশাসনসহ পুলিশের উর্ধ্বতনেরাও হাজির। বলা যায় মাঠ গিজগিজ করছে। তাদের এসকর্টে থাকা মঞ্চের সামনে চারটি বিশেষ সোফা নির্ধারিত চারজনার জন্যে। মন্ত্রীকে মাঝে রেখে দু’পাশে দু’জন বসেছেন। একজন লোকাল এমপি আর অন্যজন জেলার দলীয় প্রধান নেতা। যাদেরকে দেখলেই কর্মীরা গলা ফাটিয়ে ফেলে। শ্লোগানে কাঁপিয়ে মুখরিত করে তোলে আশপাশ। এই দুইজন বিশিষ্ট নেতা বিশেষভাবে ঘিরে বসেছেন মন্ত্রী মহোদয়কে যেন চতুর্থ চেয়ারে বসা অভাগা এই আমি ভুলেও মন্ত্রীর কাছে যেতে না পারি। যেন তাকালেও মন্ত্রী বাহাদুরকে দেখতে না পারি। আফটার অল মন্ত্রী বলে কথা। টাঙ্গাইলের সিদ্দিক পরিবারের মন্ত্রী। আমার পরের চেয়ারেই এমপি সাহেব। তিনি সোফায় বসেছেন কাত হয়ে। মানে, আমার দিকে পাছা দিয়ে। মনে হলো বাসা থেকেই মনে মনে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছেন। সামান্য ভদ্রতার খাতিরে হলেও প্রথম দেখার সময় হ্যান্ডশেকটুকুও করেন নাই; পাছে হাত নষ্ট হয়, ইজ্জত যায়। এত বড় ইজ্জতওয়ালা মানুষ তো আর যারতার সাথে হ্যান্ডশেক করতে পারেন না। সারাক্ষণ মুখটা ঘুরিয়ে রেখেছেন মন্ত্রীর দিকে ফিরিয়ে যেন আমার মত অতীব সাধারণের মুখটি পর্যন্ত তাঁকে দেখতে না হয়।
তাঁর চোখেমুখে একটা বিরক্তির ভাব। তবে জেলার নেতার অবস্থা আরো জটিল। আরো একধাপ উপরে। তাঁর চাহনীতে কড়া কড়া ভাব। হ্যান্ডশেক তিনিও করেন নাই। কেবল ঠোঁট নাড়িয়ে বিড়বিড় করেছেন। পলকখানা আমার উপর পরতেই ভাবখানা এমন করেছেন, যেন তিনি আমায় বলছেন, এইনো কি? তুই বেডা পিছে গিয়া বস্। মন্ত্রী পেীঁছার আগ পযন্ত কিছু সময় আমার পাশেই বসা ছিলেন। তাকিয়ে ছিলেনও একবার। সুযোগ পেয়ে জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? বিরক্তির চোখে একনজর দেখলেন আমায়। তারপর ঘুরিয়ে নিলেন। সেই যে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন আর ফিরলেন না।
মঞ্চে ওঠে বসার পর প্রথম মুখ খুললেন এমপি মহোদয়। কিছুটা নির্দেশের সুরেই আমায় বললেন, বক্তৃতা যেন লম্বা না করি। এরপরই মন্ত্রীর সাথে তাঁর নানান কথা। এই কথা, সেই কথা। কত্ত কথা! একটাও আমার স্কুল বিষয়ক কথা না। আসার পর থেকে এতক্ষন মন্ত্রী মহোদয় বেশ ভালই ছিলেন। চুপচাপ ছিলেন। যেই না বক্তৃতা শুরু করলেন অমনি তার মুখ থেকে কথা নয়, গন্ধ বের হওয়া শুরু হলো। প্রথমে তিনি এক হাত নিলেন শিক্ষকদের। শিক্ষক তো ভাল, দর্শকরাও অবাক। এরপর দিলেন জ্ঞান। পরে দিলেন গালি। হালকা পাতলা ধরনের গালি। এভাবে শিক্ষকদের নানাভাবে অম্লমিঠা মন্ডামিঠাই দিয়ে শেষ করলেন বক্তৃতা।
তিনজনে কেবল বক্তৃতাই করলেন। স্কুলকে দিলেন না কিছুই। শিক্ষার্থীদের মিষ্টি খাওয়ানোর নামে মন্ত্রী মহোদয়ের দেয়া একলক্ষ টাকা ছাড়া তিনজনে মিলে স্কুলকে কিছুই দিলেন না। এমনকি পরামর্শও না। করেছেন কেবল দলীয় কীর্তণ। এত কষ্ট করে তাঁদের জন্যে দূপুরের খাবারের ব্যবস্থা করার পরেও না খেয়েই বিদায় নিলেন অতি ব্যস্ততার কথা বলে। স্কুলকে কিছু না দিলেও দেখিয়ে দিয়ে গেলেন কিছু স্পর্শকাতর বিষয়। দেখালেন ক্ষমতার অহংকার আর শক্তির দাম্ভিকতা।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এসব বেশীদিন টিকেনি। সেদিন আমার স্কুলের শিক্ষকদের চাপা কষ্টের নিঃশ্বাস আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হয়ে কোথায় গিয়ে পৌঁছেছিল জানি না। তবে সেদিনের পর থেকে সর্বমোট দুই বছরের ব্যবধানে এক এক করে তিনজনের ক্ষমতার ভিতই নড়বড়ে হয়ে পড়ে। এক এক করে তিনটি উইকেটেরই পতন হয়। তিনজনই হন গদিচ্যুত। একদা ক্ষমতার যে মসনদ তাদেরকে দাম্ভিক আর বিবেকহারা করেছিল, সেই মসনদহারা হয়ে তাঁরা পথে নামেন পথহারা পথিকের মতই।
অবশ্য পথই তো তাঁদের আসল ঠিকানা। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে যাঁরা এই ঠিকানা বদল করতে পেরেছেন, তাঁরা আপাত সফল। প্রত্যাশা থাকলো দাম্ভিকতা যেন তাঁদের ছুঁতে না পারে। নাহলে তাঁদের আবার পথেই ফিরে আসতে হবে। তাই দোয়া করছি। আমরা তো আর শে−াগান দিতে পারি না; পারি শুধু বিড়বিড় করে দোয়া করতে। তাই বিড়বিড় করেই বলছি, মানুষকে মানুষ ভাবার দীক্ষায় যেন তাঁরা শিক্ষা নেন। না হলে সময় তাঁদেরকে ক্ষমা করবে না। সময় বড় নিষ্ঠুর; সময় কাউকে ছাড়ে না।
পাশাপাশি শুভ কামনাও করছি। হাজারো শুভেচ্ছা আর অভিনন্দন আপনাদের। মসৃণ হোক আপনাদের পথচলা; মলিন না হোক আপনাদের সাফল্যের এই হাসিমাখা মুখ। সর্বোপরি মঙ্গল হোক দেশের। আপনাদের হাত দিয়েই বাংলাদেশ হয়ে উঠুক স্বপ্নের সোনার বাংলা। শুভ হোক আপনাদের প্রতিটি কর্ম, প্রতিটি পদক্ষেপ। আর মুছে যাক আপামর জনতার সকল আক্ষেপ। শুভ নববর্ষ!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।