দরাদরি, ধরাধরি; দরকার কড়াকড়ি!!!

9

ইঞ্জি: সরদার মোঃ শাহীনঃ যাত্রার প্রথম থেকেই খুব একটা স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। ঠিক বরাবরের মত নয়, কেমন যেন একটু পর পরই দুলে দুলে উঠছিল মাঝারো সাইজের বিমানখানি। ক্যাথে-ড্রাগন এয়ারলাইন্সে তো নতুন নয়; বহুবার, অগণিতবার এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে জার্নি করেছি। কখনো এমনটা হয়নি। এবার ভিন্ন। বলা চলে ভাল রকমেরই ভিন্ন। কেবলই কেঁপে কেঁপে ওঠা আতঙ্ক আর আতঙ্ক। আতঙ্ক ছিল যাত্রার একেবারে শেষ সময় পর্যন্ত। অল্পস্বল্প ঘুমিয়েছি বটে, তবে একটু পর পর ধরফর করে লাফিয়েও উঠেছি। ‘এই বুঝি শেষ’ ভেবেই হন্তদন্ত হয়ে লাফিয়ে উঠেছি।
শোনিমের আম্মুর অবস্থা আরো বেগতিক। সচরাচর জার্নিতে এমনিতেই ভয় পায়। আজ অবস্থা আরো করুণ এবং ভয়াবহ। ভয়ে ঘুমাতেই পারেনি। একটু পর পর একটা করে ঝাকুনী খেয়েছে আর পাশে বসা ছেলের হাত চেপে ধরেছে। মাথা ব্যথায় কাতর মানুষটির সারাটা পথ এমনি করে মহাবিপদের শঙ্কা নিয়েই কেটেছে। শঙ্কাটা বাতাসী ঝড় বা এয়ারটাবুলেন্স নিয়ে। এয়ারটাবুলেন্সের ধকল সইতে না পেরেই তার মাথায় পেইন। চোখ বুজতে পারেনি এতটুকুও।
আমার শোনিমও চোখ বুজেনি। ও চোখ বুজেনি অন্য কারণে; খুশীতে। জার্নিতে শোনিম একেবারেই আলাদা। ভয়ডর নেই, ভাবনা নেই; দিব্বি মুভি দেখে পুরো সময়টা পার করেছে। একরত্তিও ঘুমায়নি। জানালার ফাঁক গলে বারবার বাইরে তাকিয়েছে ভোরের আলোর অপেক্ষায়। খুব পছন্দ করে উপর থেকে সাগরের জলরাশি দেখতে। আকাশ থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের নীলাভ জলরাশি ওকে বিমোহিত করে। এসব দেখতে দেখতে জন্মভূমিতে ফেরার আনন্দে ও এতটাই বিমোহিত থাকে যে কখনো বিপদ আঁচ করতে পারে না।
অবশ্য বিপদ বোঝার বয়সও ওর তেমন হয়নি। এইটুকু কেবল বোঝে, জাপান ওর জন্যে মর্ত্যরে স্বর্গলোক। ওর চোখে ভারী সুন্দর দেশ জাপান। সব দিক দিয়েই সুন্দর। তামাম দুনিয়ার অন্য কোথায়ও গেলে এতটা আপ্লুত হয় না, যতটা হয় জাপানে গেলে। ওর মত এতটা না হলেও কিছুটা আমিও হই। এত দীর্ঘ বছর এই দেশে থাকার পরেও আমি মাঝেমাঝে আপ্লুত হই। এই দেশের নানাবিধ বিধিব্যবস্থা দেখে আপ্লুত হই।
দেশটিকে পলিটিশিয়ানরা সাজিয়েছে পুরোপুরি জনগণের দেশ হিসেবে। সরকারের প্রতিটি কথা, কাজ, সিদ্ধান্ত কিংবা ভূমিকা সব সময় কেবল দেশের জন্য; দেশের জনগণের জন্য। এত গোছালো দেশ, গোছালো রাষ্ট্রযন্ত্র; তবুও সরকারের সারাক্ষণের ভাবনা আরো কতটা অধিকতর গোছালো করা যায়; সহজতর করা যায় জনগণের জীবনযাত্রা। জনগণের সামনে পড়লে পলিটিশিয়ানরা কাঁচুমাঁচু করে। ঘাড় বাঁকিয়ে মাতা নুইয়ে কেবল স্বেচ্ছাসেবক নয়, সাচ্চা সেবক সেজেই কথা বলে। কোনভাবেই ‘আমি কী হনুরে’ মার্কা ভাবসাব নেই। আর সরকারী আমলারা? জনগণের সার্ভেন্ট হিসেবে ঠিক সার্ভেন্টের মতই আচরণ। কথা এবং কাজে আমলারা জনগণের কামলার মতই।
কোনভাবেই বাংলাদেশের আমলাদের মত নয়। বাংলাদেশের আমলাগণ ব্যতিক্রম। পুরো বিশ্ব থেকেই ব্যতিক্রম। তারা জনগণকে স্যার ডাকেন না; উল্টো জনগণের স্যার ডাক শোনার অপেক্ষায় থাকেন। কেবল চাকুরীকালীন সময়ই নয়, অবসরকালীন জীবনের পুরোটা সময়ও স্যার ডাক শুনতে চান। শুনে কী মজা পান কে জানে! নিজের অভিজ্ঞতায় বলছি, জীবনে একজন আমলাও পাইনি যিনি বাংলার জনগণকে স্যার ডাকার উদার মানসিকতা রাখেন।
মানসিকতা বড় জটিল জিনিস। এটা জন্মগত। এসবে বাংলার পলিটিশিয়ানরা আরো একধাপ এগিয়ে। স্যার ডাক শুনতে না চাইলেও ‘ভাই’ ডাক তাদের খুব প্রিয়। তাদেরকে ‘ভাই’ ডাকতেই হয়। বয়সে ছোট হলেও ডাকতে হয়। নাহলে তাদের মূর্তি উজ্জ্বল হয় না; ভাবের মূর্তি। তাদের কাছে ‘ভাব’ একখান জিনিসই! এ নিয়ে তারা সদা তটস্থ। অবশ্য এখন সময় খারাপ। এখন ভোটের সময়। একমাত্র ভোটের সময় ছাড়া বাকী পুরোটা সময় পলিটিশিয়ানদের ভাবসাব থাকে রাজাবাদশাহ্দের মত।
তাদের কাছে সাধারণকে যেতে হলে ধরাধরি করতে হয়। একে ধরতে হয়, ওকে ধরতে হয়। আবার তারাও ধরেন। দলীয় কমিটিতে থাকার জন্যে কিংবা নমিনেশন পাবার জন্যে উপর মহলে তারাও ধরাধরি করেন। সাংঘাতিক ভাবে ধরেন। তবে ধরাধরি যেমনি করেন, শুনেছি দরাদরিও করেন। দরাদরি না করলে রেট কমে না। তবে সবই লোকমুখে শোনা। চাক্ষুস শুনিওনি; দেখিওনি। চাক্ষুস আমি কোন কিছুই দেখিনি। দরাদরিও দেখিনি, ধরাধরিও দেখিনি। ধরাধরি জাপানেও দেখিনি। ধরাধরি বিষয়টা জাপানে থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু দরাদরি আছে বলে কখনো শুনিনি। এখানে দরাদরি কোথায়ও নেই। রাজনীতিতে নেই, বানিজ্যেও নেই। ২৪টা বছর কাটিয়ে দিলাম এইদেশে। দরাদরি করার কোন জায়গা, কোন দোকান আজো খুঁজে পাইনি। ফিক্সট প্রাইজের দোকান ছাড়া কোন দোকান নেই এই দেশে। ভদ্র সমাজের দাবীদার হলে তো তাই হওয়া উচিত।
আমরা নিজেদেরকে অভদ্র বলবো না; তবে অদ্ভুত তো বলা যায়। এইদেশে জিনিসপত্রের দামের কোন ঠিকঠিকানা আছে! কোন ফিক্সট প্রাইজ নেই। যে যার ইচ্ছে মত দাম চায়। কাষ্টমারের চেহারা দেখে একেকজনার কাছে একেক দাম হাকায়। দরাদরি ছাড়া কেনার উপায় নেই। যে কেনাকাটা মোটামুটি বোঝে, সে কোন রকমে পার পায়। আর যে বোঝে না, সে পার পায় না। ধরা খেতেই হয়। এটা সয়ে গেছে। এটা সিদ্ধ এবং এটাই বৈধ এদেশে! কিন্তু এটাও যে প্রকাশ্যে একধরণের জঘন্য প্রতারণা, তা কারো চিন্তায়ই আসে না।
এসব সয়ে যাওয়া প্রতারণায় জনগণ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে। ১৭ কোটি লোক সারাদেশ জুড়ে প্রতারিত হচ্ছে। যেন পুরো দেশটাই একটি প্রতারণা কেন্দ্র। যেখানে প্রতিমূহুর্তে প্রতারিত হচ্ছে পুরো দেশের মানুষ। অথচ এসব দেখার কেউ নেই। এটা যে অন্যায়, এটা যে অবিচার তা নিয়ে সরকারের ভাবনা নেই; সামান্য মাথা ব্যথাও নেই। যেন এটাই সিষ্টেম, এটাই কালচার। এটাই নিয়ম, এটাই বিধান। অথচ সভ্যতার মানদন্ডে এই বিধান কোনভাবেই যায় না। এসব অসভ্যতামি। সভ্য দেশে এটা কোনভাবেই ভাবা যায় না।
অথচ আমাদের দেশে ভাবতে হয়, মানতে হয়। এসব দেখার মত কেউ নেই তাই মানতে হয়। একটা দেশের সার্বিক কেনাকাটা দরাদরির উপর নির্ভর করে হচ্ছে। সরকার জনগণকে হালকা প্রতারক টাইপের ব্যবসায়ীদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে। জনগণ মার্কেটে গেলেই প্রতারিত হয়। আর প্রতারিত হয় বলেই মাঝেমধ্যেই বাদানুবাদ হয়, কথা কাটাকাটি হয়। এরপর হয় হাতাহাতি, এবং শেষমেষ মারামারি আর ধরাধরি।
আবার দাম বাড়ার কারনেও ধরাধরি হয়। বলা নেই, কওয়া নেই, যখন তখন জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। প্রতি জুনের বাজেটে ট্যাক্স বাড়ে; তাই জিনিসপত্রের দরও বাড়ে। দাম বেড়ে গেলেই প্রথম প্রথম ধরাধরি হয়। মজার ব্যাপার হলো, জাপানে দাম বাড়ে না। ২৪ বছর আগে এদেশে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন, চাল-ডাল, তরিতরকারী, দুধ, ডিম কিংবা মাছ-মাংশের দাম যা ছিল, এখনো ঠিক তাই আছে। রেলের টিকিট ছাড়া কোন পণ্যের দাম একরত্তিও বাড়তে দেখিনি গত দুই যুগে। কয়েক বছর আগে রেলের ভাড়া অতি সামান্য বাড়িয়েছে সরকার; সেটাও মাসের পর মাস ধরে ভাবনা চিন্তা করে। অতি নগন্য মাত্রায় ভাড়া বাড়ানোর জন্যে দেশের জনগণকে বুঝিয়েছে টানা ছত্রিশ মাস।
মাসে মাসে কিংবা কথায় কথায় দাম বাড়ার বিষয়টি যেমনি সামাজিক স্থিতিশীলতার সাথে খাপ খায় না; ঠিক তেমনি দরাদরির বিষয়টি মানব সভ্যতার সাথে একেবারেই যায় না। এখন সময় হয়েছে ভাবার। কঠিনভাবে ভাবার। দরাদরির সিষ্টেমের ফলে উদ্ভুত ধরাধরির এই পরিস্থিতির কারনে সরকার এখনই কড়াকড়ি আরোপ না করলে জনগণকে নিত্যদিন গড়াগড়ি করতে হবে; মাটিতে গড়াগড়ি করেই মারামারি করতে হবে।
মারামারি করতে হবে অন্যায়ের সংগে ন্যায়ের আর বাস্তবের সংগে অবাস্তবের। সত্যের সংগে মিথ্যার আর ভালোর সংগে মন্দের। দোহাই লাগে, আসন্ন নির্বাচনে জয়লাভ করে আর ঘুমিয়ে থাকবেন না কেউ। এর একটা বিহিত করুন। যারাই জয়ী হোন, জনগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। এ থেকে মুক্তি দিন; বাঁচতে দিন! উন্নত না হোক, অন্তত একটি সভ্য এবং ভদ্র জাতি হিসেবে বাঁচার অধিকার তো আমাদের আছে!! প্লিজ, আমাদেরকে এই অধিকারটুকু থেকে আর বঞ্চিত করবেন না!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।