অতিথি ও অতিথি পাখি

18

মোঃ বেলাল হোসেনঃ গত দশ বছর ধরে জয়নাল হোসেন, জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে রিকশা চালান। একজন আপাদমস্তক সংসারী মানুষ, তার কাছে প্রকৃতির সৌন্দর্য নিছক মনভোলানো গল্প ছাড়া কিছুই নয়। তবুও তার চোখকে জাবি ক্যাম্পাসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিমোহিত করে। সাথে সাথে বিগত কয়েক বছরে এই নয়নভিরাম প্রাকৃতিক পরিবেশের নেতিবাচক পরিবর্তন তার চোখে স্পষ্টতঃ। এসব নিয়েই তার সাথে কথা হচ্ছিল পরিবহন চত্বরের সামনে। সে অকপটে বলে চলল ক্যাম্পাসের পরিবর্তন। বলছিল আগের দিনে অতিথি পাখির কলতানে ক্যাম্পাস মুখরিত থাকত সবসসময়, সে সময় বাইরের মানুষ কম আসত। তখন পাখিদের বিচরণ ছিল সবগুলো জলাশয়ে। কিন্তু এখন অনেক বেশি বহিরাগত দর্শনার্থী আসে, কোলাহল অনেক বেশি হয়। পাখির সংখ্যা জলাশয় গুলোতে কমতে থাকে, ধীরে ধীরে কয়েকটি জলাশয়ে পাখি আসা বন্ধ হয়ে যায়। জলাশয়গুলোতে পানির পরিমান কমতে থাকে ফলে শীতকালে জলাশয় গুলোতে এখন আর আগের মতো নীল ও লাল শাপলার জন্মানোর পরিবেশ পাইনা।
একজন অভাবী রিকশাওয়ালার এই কথা গুলো একদমই সত্য। হয়তো সত্য বলেই কথা গুলো বলে আফসোস করতে করতে রিকশা নিয়ে নতুন যাত্রীর উদ্দেশ্যে রওনা দিল।
তার এই কথার বাস্তবতায় যেন জানান দিচ্ছে লেকগুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ঘেটে অতিথি পাখির ব্যাপারে খুব বেশী তথ্য পাওয়া না গেলেও লোকশ্রুতি ও নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে থেকেই এখানকার জলাশয়গুলোতে অতিথি পাখিদের বিচরন ছিল। সত্তরের দশকে নতুন নতুন কিছু ভবন ও শিক্ষার্থীদের আগমনে অতিথি পাখিদের বিচরনে সমস্যার সৃষ্টি হলেও তারা (অতিথি পাখিরা) প্রকৃতির এই রাণীকে ছেড়ে যায়নি। এর পরে অতিথি পাখিদের সুরক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলে ধীরে ধীরে অতিথি পাখি এই ক্যাম্পাসের অংশ হয়ে যায়। যার ফলে ১৯৮৬ সালে জাহাঙ্গীরনগরে ৯০ প্রজাতির পাখি দেখা গেলেও ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের দিকে প্রায় ১৯৫ প্রজাতির পাখি দেখা যায়। যার মধ্যে প্রায় ১২৫টি দেশীয় প্রজাতি এবং প্রায় ৭০ টি প্রজাতির পাখিরা পরিযায়ী বা অতিথি। এর মধ্যে দেশীয় প্রজাতিগুলোর মধ্যে প্রায় ৭৮টি প্রজাতির পাখিদের ক্যাম্পাসে নিয়মিত বাসা বাঁধতেও দেখা যায় । ইদানীং ক্যাম্পাসে পাখিদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ বেশি বেশি বিঘিœত হওয়ায় ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে ঠিক কত প্রজাতির পাখি ক্যাম্পাসে বিচরন করে তার সঠিক পরিসংখ্যান কর্তৃপক্ষ হতে জানা যায় নি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২ থেকে ১৫ টি জলাশয় রয়েছে। এরমধ্যে সাত থেকে আটটি জলাশয়ে নিয়মিতভাবে অতিথি পাখিরা আশ্রয় নিয়ে থাকে। এগুলো হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনের জলাশয়, পরিবহন চত্বর সংলগ্ন জলাশয়, সুইমিং পুল সংলগ্ন জলাশয় ও ওয়াইল্ড লাইফ রেসকিউ সেন্টার সংলগ্ন জলাশয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনপুরা এলাকায়, জাহানারা ইমাম ও প্রীতিলতা হল সংলগ্ন জলাশয়, বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশের জলাশয়। এগুলোরমধ্যে চার পাঁচটি জলাশয়ে পাখিদের বেশি বিচরণ করতে দেখা যায়। সচারচর এত অল্প জায়গায় প্রচুর পাখি বাংলাদেশের অন্য কোথাও দেখা যায় না। দেশীয় প্রজাতির পাখি গুলোর মধ্যে বেশিরভাগই আসাম, মেঘালয় ও সিলেট অঞ্চল হতে আসে। এবং পরিযায়ী পাখিদের বেশির ভাগ সাধারণত হিমালয়ের উত্তরের দেশ সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া ও নেপাল থেকে সুদীর্ঘ পথ অতিক্রম করে আসে। কারন এ সময়ে ঐ সব অঞ্চলে প্রচুর তুষারপাত ও ঠান্ডা হয়। ফলে এ সময় জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার কারনে তারা সাত সমুদ্র তের নদী পার হয়ে এই উপমহাদেশে আশ্রয় গ্রহন করে থাকে।
এর মধ্যে নদী ও হাওড়ের এই দেশে বেশি আশ্রয় নেয় অতিথি পাখিরা। আবার বাংলাদেশে যত পরিযায়ী পাখি আসে তার চার ভাগের এক ভাগ আমাদের প্রিয় এই সবুজ ক্যাম্পাসে বিচরণ করে। এখানকার জলাশয় গুলোতে সাধারণত খায়রা, চখাচখি, বালিহাঁস, কাদাখোঁচা, হেরণ, কার্লিউ, বুনোহাঁস, ছোটসারস, বড়সারস, সরালী, পিচার্ড, মানিকজোড়, জলপিপি, ফ্লাইপেচার, পিচার্ড, গার্গেনি, মুরগ্যাধি, কলাই, নাকতা, কোম্বডাক, পাতারি, চিতাটুপি, লাল গুড়গুটি প্রজাতির পাখিদের সংখ্যাধিক বেশী।
অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে দেশীয় পাখিরা আসা শুরু করলেও পরিযায়ী পাখিদের সাধারণত নভেম্বর এর ২য় সপ্তাহ থেকে ক্যাম্পাসে দেখা যায়। জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত পাখিদের এই বিচরন লক্ষ্য করা যায়।

এছাড়াও ক্যাম্পাসের জলাশয় গুলোতে তিন ধরনের (সাদা, নীল ও লাল) শাপলা ফুল পাওয়া যায়। এর মধ্যে সাদা শাপলা দেশের সবজায়াগায় দেখা গেলেও নীল ও লাল শাপলা খুজে পাওয়া দুষ্কর। লাল শাপলার অন্য নাম রক্ত কমল। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘নাইমপাইয়া রুবরা’। এটি জলজ উদ্ভিদ, এর পাতা এবং বোঁটা লালচে সবুজ। এর ফুল প্রায় ১০-২০ সেন্টিমিটার চওড়া হয়ে থাকে। যাতে সাধারণ শাপলার চেয়ে অনেক বেশি পাপড়ি থাকে। সাধারনত পাপড়ি গুলোর রঙ হয় লাল। ফুলটি সাধারণত রাতের অন্ধকারে ফোটে। নীল ও লাল শাপলায় ক্যাম্পাসের জলাশয় গুলো একসময় ভরপুর থাকলেও এখন তা অনেক কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ জলাশয় গুলো বাণিজ্যিক হারে লিজ দেওয়া শুরু করলে আস্তে আস্তে অনিন্দ্যসুন্দর শাপলা হারিয়ে যাচ্ছে। কতৃপক্ষের অবহেলার কারনে জলাশয় গুলোতে পলি জমে ভরপুর। তার উপর কচুরিপানা ও মানবসৃষ্ট আবর্জনা পরিষ্কার করা হয় না। ফলস্বরূপ জলাশয় গুলো এইরকম বিচিত্র, বাহারি ও দৃষ্টিনন্দন শাপলাফুলের জন্য বৈরিপরিবেশ ধারন করছে। পাখিরা এই সব শাপলাফুল বেষ্টিত জলাশয় গুলোতে বেশি আশ্রয় নিয়ে থাকে। জলাশয়ে ফুলের সংখ্যা কমে যাওয়াতে অতিথি পাখিদের উপযুক্ত পরিবেশের বিঘœ ঘটছে। যার ফলে পাখিদের সংখ্যাও দিনে দিনে কমছে। এছাড়াও জলাশয় গুলোতে পানির পরিমানও উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে বিগত বছরগুলোর তুলনায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের অধীনে জলাশয়গুলো রক্ষণাবেক্ষণ ও পাখির নিরাপদ আবাস ব্যবস্থাপনার কাজ করে থাকে এস্টেট শাখা। কিন্তু তাদের দায়িত্বে অবহেলার প্রতিফলন জলাশয়গুলোতে প্রতীয়মান হচ্ছে। তবুও কোন দৃশ্যমান কাজ তারা করছে না।
উল্লেখ্য যে প্রত্যেক মৌসুমে অতিথি পাখির জন্য জলাশয়গুলোতে বাঁশ ও জলজ উদ্ভিদ দিয়ে বিশেষ মাঁচা তৈরি করা হয়। যা গতদুয়েক বছর থেকে তৈরি করা হচ্ছেনা। জলাশয়গুলোর আশেপাশে দর্শনার্থীদের কোলাহল, পানিতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা, গাড়ির হর্ন, মাইকিং ও পাখিদের লক্ষ্য করে ঢিল ছোঁড়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রশাসনের নির্দেশনা থাকলেও দর্শনার্থীরা এসব মানছেন না।
আশার খবর হচ্ছে এই যে এরই মধ্যে পাখিদের নিরাপদে বিচরন ও অবস্থানের জন্য বিভিন্ন সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণীবিদ্যা বিভাগ এব্যাপারে বিভিন্ন নীতিমালা ও সচেতনতা মূলক সম্বলিত পোস্টার, প্ল্যাকার্ড লাগিয়েছে। এছাড়াও সেভ দ্যা নেচার নামে একটি গ্রুপ এব্যাপারে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। তারা জলাশয়ের তীর গুলোতে সচেতনতা মূলক প্ল্যার্কাড লাগানোর ব্যবস্থা করেছে।
জলাশয়ে হাজারো পাখির কিচিরমিচির এবং লাল ও নীল শাপলা একসাথে দেখলে পাষাণ হৃদয়ের মানুষেরও মন ভালো হতে বাধ্য। এমনি এক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। এখানে সূর্য উঠে পাখির কলতানে, শিক্ষার্থীদের ঘুম ভাঙ্গে অতিথিদের ডাকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যর কারনে এ ক্যাম্পস প্রকৃতির রানী, সবুজ ক্যাম্পাস,অতিথি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত পেয়েছে। কিন্তু আমরা কি সত্যিই সচেতন আমাদের এই বিশ্লেষন ধরে রাখতে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থী হিসেবে ক্যাম্পাসের এই প্রকৃতি সংরক্ষনের ব্যাপারে আমরা কতটুকু মূল্যবোধের পরিচয় দিতে পেরেছি তা সময়ই বলে দেবে।-লেখক: শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।