টিএসসির গোধূলি

21

মোঃ বেলাল হোসেনঃ গোধূলির মানে রক্তের রঙে রাঙানো গগন ঘন গোধূলির মানে খুব ধিরে ধিরে সন্ধার আগমন গোধূলির মানে গোধূলির রঙে রাঙানো আমার মন ক্লাস থেকে ফিরে হলে বিশ্রাম নিচ্ছি, রুমে বসে ভাবলাম যাই বাইরে থেকে একটু ঘুরে আসি। বিকেলবেলাটা আমার সবসময়ই প্রিয়।
জানালার ছিদ্রদিয়ে যখন সূর্যের শেষ সম্ভাষণটুকু আমার হাতের উপর এসে পড়ে, খুব ভালো লাগা একটা অনুভূতি হয়। একটা অজানা মিষ্টি আবেশে ছেয়ে যায় আমার চারপাশ। হল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামলাম, কেন যেন নিজেকে একটু উদাসী মনে হল। পড়ন্ত বিকেলে উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, ক্যাম্পাসের সবাই কেমন যেন যান্ত্রিক। হতাশাগ্রস্থ শিক্ষিত তরুণেরা যে যার মত ছুটে চলেছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য অবলোকন করার মত অবকাশ কারও নেই। এসব আনমনে ভাবছি আর হেটে চলেছি টিএসসির দিকে। কিছুক্ষনের মধ্যেই ক্যাম্পাস, গোধূলির আলোয় ছেয়ে গেল। গোধুলির এই সময়টা আমার বেশ লাগে। অপরূপ সৌন্দর্য যেন
ভিন্ন এক জগতে নিয়ে যেতে চায়। আকাশে বিভিন্ন রঙের ছটা, কোথাও গাঢ়, কোথাও হালকা, কোথাও একেবারে মিলিয়ে গেছে।
আমার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে গোধূলির অবস্থান অনেক উপরে। এই সময়টা নিয়ে আমার আগ্রহের শেষ নেই। তাই গোধূলি সম্পর্কে জানতে গিয়ে যতটুকু বুঝেছি “সকালে সূর্যওঠার আগে কিছু সময় এবং সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যাওয়ার পর কিছু সময় ধরে যে হালকা আলোর আভা দেখা যায় তা গোধূলিলগ্ন নামে পরিচিত। ‘গোধূলি’ শব্দের সমাসবাক্য হলো ‘গো (গরু)-এর ধূলি হয় যে সময়’, বহুব্রীহি সমাস।
সে সময় (অর্থাৎ সন্ধ্যার সময়) গরুর পাল ধূলি উড়িয়ে ঘরে ফেরে। আসলে ওই সময় যে আবছা আলো থাকে, সেটাই গোধূলি। সকালে সূর্য উঠার আগেও এরকম অবস্থার সৃষ্টি হয়, কিন্তু সকালেরটা আমার কাছে তেমন আবেদনীয় নয়” ব্যাস এটুকুতে আমার তৃপ্তি হয় না। গোধূলির সৌন্দর্য আমি বিভিন্ন স্থানে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে উপভোগ করেছি। কিন্তু আমার প্রানের সবুজ
ক্যাম্পাসে, টিএসসিতে গোধূলির সৌন্দর্যের বিশেøষণ যেন আলাদা ভাবেই করতে হয়। কল্পনা করুন সবুজের মাঝে লাল দালান, তার ওপরে পড়ন্ত বিকেলের ডুবন্ত সূর্যের রশ্মি, এককথায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের
গোধূলির টিএসসি। যেখানে হতাশাগ্রস্থ কোন শিক্ষার্থী নয় দেখা মেলে প্রানবন্ত, উদ্যমী ও সৌন্দর্য অবলোকনকারী অসংখ্য তরুণ তরুণীর। যারা গোধূলির ছায়ায় টিএসসির করিডোরে ও ছাদে আবৃত্তি, বিতর্ক, অভিনয়, ভাষা শিক্ষা, লিখালিখি ও সাংবাদিকতা ছাড়াও আরো অনেক সৃজনশীল বিষয় নিয়ে চর্চা করে। এরা প্রত্যেকেই বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে কাজ করে। রয়েছে বিতর্ক
বিষয়ক সংগঠন জুডো, আবৃত্তি বিষয়ক সংগঠন ধ্বনি, অভিনয় নিয়ে থিয়েটার, জলসিড়ি। এছাড়াও রয়েছে চিরকুট, সাংবাদিক সমিতি, প্রেস ক্লাব। যারা সবাই একই ছাদের নিচে তাদের স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে নিজ নিজ বিষয়ের চর্চা অব্যাহত রাখে। গোধূলির হালকা
কিরণে যখন ক্যাম্পাসের সবাই ব্য¯Íনিজ নিজ কাজ নিয়ে। তখন টিএসসি হয়ে উঠে প্রানবন্ত এই সব সামাজিক সংগঠনের তরুণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহনে। যারা সবাই জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের কার্যক্রমে দেশের অন্যতম সেরা। শুধুই যে ছাত্র ছাত্রীরাই এই সৌন্দর্য উপভোগ করে তা নয়, এখানে শিক্ষক শিক্ষার্থীর মিলনমেলাও দারুনভাবে জমে উঠে। শিক্ষকেরা আসে শিক্ষার্থীদের সাথে কিছু
অসাধারন সময় কাটাতে ও বিভিন্ন সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে। বিবৃতি যোগ করা যেতে পারে।
গোধূলির সৌন্দর্য নিয়ে কত কবি কত কবিতা লিখলেন, কত গল্পকার কত গল্প লিখলেন। কিন্তু টিএসসিতে এরকম প্রানবন্ত তরুনদের কবি, লেখক একসাথে দেখলে ভাবতেন দেশ বদলাতে বেশি দিন আর নেয়। যে দেশের বুকে এমন তরুনেরা ভিন্ন ভিন্ন প্রচেষ্টায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে তাদের ভাগ্য বদলাতে শুধু সময়ের ব্যাপার। সে আশায় হয়তো এই সব উদ্যোমী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের অন্য ছাত্রছাত্রীদের মত নয়। তারা হতাশাগ্রস্থনা হয়ে, নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে একসাথে গোধূলির ছায়ায় টিএসসির করিডোরে ও ছাদে সৌন্দর্য উপভোগের সাথে সাথে নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট।
যাদের আড্ডার বিষয়বস্তুহয়ে উঠে ইতিবাচক ও সৃজনশীল, তারাই গড়তে পারে এক নতুন বৈষম্যহীন সমাজ, রাষ্ট্র। এরা অন্য দশ জনের মতো স্বাভাবিক ও আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় মগ্ন থাকেনা। হেমন্তের গোধূলিতে হালকা শীতের রেশ লাগতেই তারা চিন্তা করে শীতকালে উত্তরবঙ্গের শীতার্তদের কথা।
পড়ন্ত বিকেল থেকে সন্ধ্যা সম¯Í সময়টুকু যেন প্রানের মেলায় ছেয়ে যায় টিএসসি। এই সময় সৌন্দর্য পিপাসু ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের হল থেকে বেরিয়ে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রেমিলিত হয়। এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চর্চা, আলাপ আলোচনা করে নিজেদের ব্যক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি করে। এভাবেই তারা গোধূলির সময়টুকুকে একান্তই নিজের করে নেয় প্রানের ও জ্ঞানের সাগরে।
ভুলে গেলে চলবেনা আমি কখন বের হয়েছিলাম হল থেকে, ফিরে যেতে হবে দ্রুত কারন সকাল থেকে আবার শুরুহবে ক্লাশ পরীক্ষা, কিন্তু তার আগে ………..ওহ, গোধূলিকে জানানো হয়নি, আমি অর্পিত হয়ে ধন্য! আমি সব অহংকার বিসর্জন দিয়ে ধন্য!
উজাড় হয়ে ধন্য! আমি গোধূলির কোলে লুটিয়ে পরে ধন্য! এই গোধূলি আমারিৃ শুধুই আমার! হোক সে দূর রক্তিম আকাশে একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য!-লেখক: শিক্ষার্থী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।