৯ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে ৬৬ শতাংশ

1

গত ৯ বছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় বলছে, গত ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল দুই লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টন, যা গত ৯ বছরে বেড়ে প্রায় ৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। এর বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা।

তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ সালে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৪ হাজার মেট্রিক টন ইলিশ বেশি উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৭-১৮ সালে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে। পাশাপাশি এ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪২ দশমিক ৭৭ লাখ মেট্রিক টন হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল একলাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর দেশে ইলিশ উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল দুই লাখ ৯৮ হাজার মেট্রিক টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে এর পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা চার লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭ সালের শেষদিকে ইলিশের উৎপাদন প্রায় ৫ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এ সফলতা এসেছে। এ অর্জন ধরে রাখতে হবে।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দেশের প্রায় ৩১ শতাংশ মানুষ প্রতক্ষভাবে মৎস্যখাতে জড়িত এবং ১১ শতাংশের বেশি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে শুধু ইলিশ থেকে। দেশের জিডিপিতে ইলিশের অবদান এক দশমিক ১৫ শতাংশের অধিক। জিডিপিতে একক প্রজাতি হিসেবে ইলিশের অবদান সর্বোচ্চ। এসব কারণেই ইতোমধ্যে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইনানুগ কার্যক্রম শেষে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ হিসেবে ইলিশের ভৌগোলিক নিন্ধন (জিআই সনদ) প্রদান করেছে। সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে এ অর্জন সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেন, ‘বিশ্বে উৎপাদিত ইলিশের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশ উৎপাদন করে। ২০১৮ সাল শেষে ইলিশ উৎপাদন যেমন পাঁচ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে, একইভাবে সার্বিক মাছ উৎপাদন বেড়ে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টনে উন্নীত হবে।’

মৎস্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে মোট উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে শুধু ইলিশ থেকে। মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদফতর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইনানুগ কার্যক্রম শেষে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের ভৌগোলিক নিবন্ধন (জিআই সনদ) প্রদান করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের ভৌগোলিক নিবন্ধন সম্পন্নের ফলে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও গুণগত মানসম্পন্ন ইলিশ বাজারজাতের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বাণিজ্যিকসহ অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে।’

জানা গেছে, ইলিশ রক্ষায় সরকার ২০০৪-০৫ থেকে ২০০৭-০৮ অর্থবছর পর্যন্ত জাটকা শিকার নিষিদ্ধ থাকাকালে জেলেদের পরিবার প্রতি মাসিক ১০ কেজি হারে খাদ্য সহায়তা দিয়েছে। বর্তমানে ৪০ কেজি হারে এ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে একলাখ ৪৫ হাজার ৩৩৫টি জেলে পরিবার এ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা দুই লাখ ৪৮ হাজার ৬৭৪টিতে উন্নীত করা হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাগ্রহণের আগের সাত বছরে জেলেদের জন্য খাদ্যশস্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬ হাজার ৯০৬ টন। কিন্তু পরবর্তী ৯ বছরে (২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত) এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৫ টন।

সূত্র আরও জানায়, বর্তমান সরকারের আমলে প্রকৃত জেলেদের শনাক্ত করে নিবন্ধনকরণ ও পরিচয়পত্র প্রদানের লক্ষ্যে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত ১৬ লাখ ২০ হাজার মৎস্যজীবী-জেলেদের নিবন্ধন ও ডাটাবেজ প্রস্তুত এবং ১৪ লাখ ২০ হাজার জেলের পরিচয়পত্র বিতরণ সম্পন্ন করে সরকার ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন বাড়াতে বাস্তবমুখী উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ইলিশ আহরণে জড়িত প্রায় সাত লাখ জেলে এবং মা-ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধকালে ২২ দিনের জন্য ৩ লাখ ৯৫ হাজার জেলে পরিবার প্রতি ২০ কেজি হারে প্রায় সাত হাজার টন খাদ্য সহায়তা পায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৩০৫ দশমিক ৬৮ টন মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় পণ্য রফতানি করে ৪ হাজার ২৮৭ দশমিক ৬৪ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল মাত্র ৩ হাজার ২৪৩ দশমিক ৪১ কোটি টাকা।

মৎস্য মন্ত্রণালয় সূত্র আরও জানায়, মা ইলিশ রক্ষা ও জাটকা বড় হওয়ার সুযোগ দিতে বছরে দুই বার ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ২০১১ সালে সংশোধিত আইন অনুযায়ী ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুম আশ্বিন মাসের প্রথম চাঁদ উদয় হওয়ার আগে তিন দিন ও চাঁদ উদয় হওয়ার পরের সাত দিন মোট ১১দিন উপকূলীয় এলাকাসহ সারাদেশে ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫ দিন।

এ ছাড়া, জাটকা সংরক্ষণে এবং প্রজননের সুযোগ দিয়ে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই মাসও নদীতে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ। এ সময়ে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় নিবন্ধিত জেলেদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। দেশের ১৬টি জেলার প্রায় দুই লাখ ২৪ হাজার ১০২টি জেলে পরিবার এ খাদ্য সহায়তা পায় বলে জানায় মৎস্যসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র।-বাংলা ট্রিবিউন