শহীদ রাসেলের আত্মদান যেতে হবে আরো বহুদূর…..

18

এম এইচ নাহিদঃ শহীদ রাসেল আহমেদ খান। অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের এক অকুতোভয় সৈনিক। বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোটের অপশাসন, গণতন্ত্র ছিনতাইয়ের হাত থেকে দেশ ও জনগণকে মুক্ত করার লড়াইয়ে ইতিহাসের অমর অধ্যায়ের মহানায়ক শহীদ কমরেড রাসেল। আজকের বাংলাদেশ, অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অগ্রযাত্রা শহীদ রাসেলের আত্মদানের ফসল। আজ ২৮ অক্টোবর সেই ঐতিহাসিক স্মরনীয় দিন। ইতিহাসের এই দিনে জামাত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা পল্টনে গুলি করে হত্যা করেছিলো বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর তৎকালীন নেতা শহীদ রাসেল আহমেদ খান কে। যশোরের বাঘারপাড়ার দরিদ্র পরিবারের মা হারা সন্তান রাসেল সৎ মায়ের সংসারে পারিবারিক সমস্যয় পড়ালেখা ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলেন কর্মের সন্ধানে। কিন্তু বুকে স্বপś ছিলো অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের। স্বপ্ন দেখতেন এই বাংলাদেশ হবে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ মুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ হবে শোষণমুক্ত সমতা ও ন্যায্যতা ভিত্তিক বাংলাদেশ। সেই স্বপ্ন নিয়ে রাসেল লড়াই করতেন ওয়ার্কার্স পার্টি ও যুব মৈত্রীর পতাকাতলে। লড়াই করতেন শ্রমিকের অধিকার আদায়ে।
২০০১ সালের নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতক জামাত ও তাদের প্রধান মিত্র বিএনপি ক্ষমতায় আসে। আবার শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের উল্টোযাত্রা। রাষ্ট্রীয় মদদে চলে উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের রাজত্ব। চলে বাংলাভাই-জেএমবির নারকীয় তান্ডব। সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সিনেমা হল, মসজিদ-মন্দির-গির্জা কোনো জায়গায় বোমা গ্রেনেড হামলা করা বাদ দেয় নি। এক সাথে ৬৩ জেলায় বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষশক্তি আওয়ামী নেতৃত্বশূন্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্যেশ্যে ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশেও বোমা হামলা করেছিলো। হায়েনার দল মেতে উঠেছিলো নারকীয় তান্ডবে। ওদের ভয়ংকর তান্ডবলীলায় আতংকিত হয়েছিলো মানুষ। আতংকিত হয়েছিলো বাংলাদেশ। একই সাথে চলতে থাকে বিএনপি-জামাত চারদলীয় জোটের দু:শাসন-দুবৃত্তায়ন ও লুটপাট। চলে হাওয়া ভবন কেন্দ্রীক তারেক রহমানের দুর্নীতি ও ষড়যন্ত্র। মানুষ এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ খোজেন। ক্ষোভের আগুনে জ্বলে ওঠা মানুষ গর্জে ওঠে। শুরু হয় লড়াই। প্রতিবাদ-প্রতিরোধে রাজপথে মানুষ নামে হাজারে হাজার।
সে দিন ছিলো ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর। একদিকে বিএনপি-জামাতের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী, অন্যদিকে নিরস্ত্র মানুষের হাতে মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক লগি-বৈঠা। স্বঃস্ফূর্ত জনমত। জামাত-শিবির ক্যাডারদের উস্কানিমূলক বক্তব্য। মাইকে বলতে থাকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ কর। হায়েনার দল গুলি আর মহুর্মুহু বোমা বর্ষণ করতে থাকে। ওদের গুলিতে শহীদ হন অসাম্প্রদায়িক চেতনার সংগ্রামী নেতা শহীদ রাসেল। তার পর বহু সংগ্রামের বিনিময়ে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর ক্ষমতায় আসে অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-মুক্তিযুদ্ধের চেতনার জোট ১৪ দল। পরাজিত হয় স্বাধীনতাবিরোধী অপমক্তি। বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। স্বাধীন বাংলার স্থপতি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার হয়েছে। শীর্ষ জঙ্গি সন্ত্রাসী বাংলা ভাই, শায়েখ আব্দুর রহমান, মুফতি আব্দুল হান্নানসহ অনেকের ফাঁসি হয়েছে। শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদেরও ফাঁসি হয়েছে। অনেকে সাজা ভোগ করছে। এখনো বিচার চলছে। ২১ আগস্টের হামলার বিচারের রায়ও হয়েছে। এসব সম্ভব হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকার কারণে।
এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। আগুন সন্ত্রাসীদের সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে। আরো বহুদুর যেতে হবে। এখনো বহু জঙ্গি হামলার বিচার হয় নি। পল্টন ময়দান, রমনা বটমূলসহ বহু হত্যাকান্ডের বিচার হয় নি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও শেষ হয় নি। সমূলে উৎখাত করা যায় নি জঙ্গি অপশক্তিকে। ৭১-এর ঘাতক জামাতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয় নি। বন্ধ করা যায় নি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। বরং সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে পরোক্ষভাবে পোষা হচ্ছে। ভোটের অংকের হিসাব মেলাতে আপোষকামিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ওরা বিষধর সাপ। দুধ-কলা দিয়ে পুষলেও সুযোগ পেলেই ছোবল মারবে। ফিরতে হবে ৭২-এর সংবিধানে। রাষ্ট্রকে পরিচালিত করতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতিতে। উনśয়ন হয়েছে, সমতা আসে নি। প্রবৃদ্ধি-মাথাপিছু আয় বাড়ছে। বাড়ছে ধনীর সংখ্যা। কিন্তু কমছে না গবির। অর্থমন্ত্রীর হিসাব মতে এখনো বাংলাদেশে গরিব ৩ কোটি। তার মানে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ছে। এই ব্যবধান কমাতে হবে। সমতা ও ন্যায্যতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই শহীদ রাসেলের আত্মদান স্বার্থক হবে। শহীদ রাসেল বেঁচে থাকবেন অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ও ন্যায্যতা আর সমতা ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র বির্নিমাণের চেতনায় বিশ^াসী মানুষের সংগ্রামে- দ্বাদশ মৃত্যুবার্ষিকীতে এটাই প্রত্যাশা।-সাবেক সাধারন সম্পাদক, ছাত্র মৈত্রী।