ডেঙ্গুর মধ্যেই উদ্বেগ বাড়াল ভারতের জিকা

2

সরকারের নানা পদক্ষেপের পরও ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন সাফল্য নেই। চলতি মাসে এ পর্যন্ত তিনজনসহ এবারের মৌসুমে ডেঙ্গুতে মারা গেছে ২০ জন।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ভারতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে জিকা ভাইরাস। উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, ডেঙ্গু ও জিকা দুটিই এডিস মশা বাহিত। সরকারি কর্তৃপক্ষ ভারতের জিকাকে বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগজনক নয় বলে জানালেও এরই মধ্যে সতর্কতামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত ভারতে ১২৩ জন জিকায় আক্রান্ত হওয়ার খবর দেশটির গণমাধ্যমে জানা গেছে। প্রাথমিকভাবে পাওয়া সূত্র মতে, ভারতে এর আগে জিকা হয়নি।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহামুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে দেশের সব বন্দরে স্বাস্থ্য বিভাগের লোকদের সতর্ক থাকা, আগের স্থাপিত স্ক্যানারগুলোর সঠিক ব্যবহার, কোনো মানুষ যাতে স্ক্যান ছাড়া আসা-যাওয়া করতে না পারে—এসব বিষয়ে নজর রাখতে বলেছি। এমনকি আজ (গতকাল) বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে আমরা বৈঠক করে এসব ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক করেছি। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও সতর্ক করা হয়েছে। ’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ডেঙ্গু আর জিকার লক্ষণ প্রায় একই।

তাই পার্শ্ববর্তী দেশে জিকা দেখা দিলে আমাদেরও সতর্ক বা সচেতন থাকা জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে আতঙ্কিত হওয়া চলবে না। ’ তিনি জানান, সাধারণত জ্বর, লালচে র‌্যাশ, শরীরে গিঁটে গিঁটে ব্যথা, চোখ লাল ধরনের লক্ষণ দেখা দেয়। তবে গর্ভবতী জিকা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে উপসর্গ সাধারণত আগে দেখা যায় না। আর এই ভাইরাসে আক্রান্ত শিশুদের মাঝে ‘মাইক্রোসেফালি’ রোগ দেখা দেয়। তবে আমেরিকায় যৌন মিলনের মাধ্যমেও জিকা ছড়ানোর প্রমাণ মিলেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে গতকাল বুধবার বিকেলে পাওয়া তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে ডেঙ্গুতে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে মোট আট হাজার ৭৯ জন। মারা গেছে ২০ জন। এর মধ্যে চলতি অক্টোবরেই আক্রান্ত হয়েছে এক হাজার ৮২২ জন। পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪২। এ পরিসংখ্যানের বেশির ভাগই ঢাকা মহানগরীর; ঢাকার বাইরে আছে মাত্র কয়েকটি এলাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘এবার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এবং মানুষকে সতর্ক ও সচেতন করার ক্ষেত্রে আমরা কোনো ঘাটতি রাখিনি। তবু আক্রান্ত ও মৃত্যু হয়েছে বেশি। আমরা এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেছি, মানুষ এডিস মশা কিংবা ডেঙ্গুর ব্যাপারে জানলেও সবাই সতর্ক নয়। জ্বর হলে অনেকেই বিষয়টিকে অবহেলা করে। ’

ডেঙ্গুতে এবার বেশি মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ডা. সানিয়া তহমিনা বলেন, ‘আমাদের পরীক্ষায় দেখেছি এবার যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের বেশির ভাগই এর আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। ডেঙ্গুর মোট চারটি ধরন। তখন হয়তো কারো ডেঙ্গু ভাইরাসের একটি টাইপ (ডেন ১) ছিল, এবার তারা ডেন ৩-এ আক্রান্ত হয়েছে। বারবার আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করলেও দ্বিতীয়বারে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে কেউ কেউ অধিকতর সতর্ক ছিল না। ফলে তাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু ঘটেছে। দেখা গেছে, যখন এসব রোগীকে হাসপাতালে আনা হয় তখন অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ’ ডেঙ্গুর চারটি ধরনের মধ্যে ডেন-৩ হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ।

ড. মাহামুদুর রহমান আরো বলেন, দেশে এডিস মশার বিস্তার ও ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকায় মানুষের মধ্যে জিকা নিয়ে উদ্বেগ থাকাও স্বাভাবিক। কারণ জিকা ও ডেঙ্গুর বাহক একই। তিনি সব সময়ই সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে গিয়ে বলেন, ‘বাহক বাহিত রোগ-ব্যাধির বাউন্ডারি নেই। যেকোনো ভাইরাস বা জীবাণু যখন-তখন যেকোনোভাবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে যেতে পারে। ’ এই রোগবিজ্ঞানী বলেন, জিকা আক্রান্ত হলেই সঙ্গে সঙ্গে তা ধরা মুশকিল। এটা মানুষের শরীরে দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমিত হয়। আর প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রেই এটা সময়মতো ধরা যায় না। তবে যদি এই ভাইরাসের কারণে কারো জ্বর হয় তবে পরীক্ষায় তা ধরা পড়ে। তিনি আরো বলেন, ডেঙ্গু আর জিকার মধ্যে পার্থক্য হলো ডেঙ্গুতে মৃত্যু ঘটলেও জিকায় মৃত্যুর ভয় নেই। এ ক্ষেত্রে বেশি ভয় গর্ভবতী নারীদের গর্ভের সন্তান নিয়ে। বিশেষ করে এ ভাইরাসে আক্রান্ত নারীদের ভ্রূণ থেকে জন্ম নেওয়া শিশুদের মাথা ছোট হয় বা বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম নেয়।

তবে আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মোশতাক হোসেন মনে করেন, ভারতের জিকা নিয়ে এখন খুব একটা উদ্বেগের কারণ নেই। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু আর জিকা নিয়ন্ত্রণে একই ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন হওয়ায় এগুলো আমাদের এখানে কার্যকর আছে। আলাদা করে জিকার জন্য বাড়তি কিছু ব্যবস্থাপনার খুব একটা দরকার পড়ে না। এ ছাড়া এবার ডেঙ্গু মৌসুম প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভিলেন্স অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহম্মেদ বলেন, ‘সাধারণত জুন-জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর-নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার থাকে। ফলে আগামী মাস পর্যন্ত আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ’

২০১৩ ও ২০১৬ সালে দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ৩০টি দেশসহ ইউরোপ ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে জিকা ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব দেশকে সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ সরকারও বিভিন্ন পযদক্ষেপ নেয়। দেশে এডিস মশায় জিকা ভাইরাসের সংক্রমণ রয়েছে কি না তা পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার কীটতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে এডিস মশার নমুনা সংগ্রহ ও সংরক্ষণকাজ শুরু হয়। জিকা আক্রান্ত দেশগুলো থেকে আগত সন্দেহজনক জিকারোগী শনাক্ত করতে সব আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে মেডিক্যাল টিমও সক্রিয় রাখা হয়। রাজধানীর কুর্মিটোলা হাসপাতালে সংরক্ষিত রাখা হয় ২০টি শয্যা। তবে পরে উদ্যোগ অনেকটাই চাপা পড়ে যায় চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গুর আড়ালে।-কালেরকন্ঠ