দুর্গাপূজা যেভাবে হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলো

1

হিন্দু ধর্মাবলম্বী সবার কাছে দুর্গাপূজা প্রধান ধর্মীয় উৎসব নয়। মূলত বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিম বাংলার বাংলা ভাষাভাষী হিন্দুদের মধ্যেই এটি সবচেয়ে বেশি আনুষ্ঠানিকতা ও আড়ম্বরের সঙ্গে পালিত হয়। এ ছাড়া হিন্দুপ্রধান দেশ নেপালেও এটিই সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু দুর্গাপূজা কীভাবে হয়ে উঠল বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান?

বিশেষজ্ঞরা বলেন, সংস্কৃত ভাষায় রচিত রামায়ণে দুর্গাপূজার কোনো উল্লেখ ছিল না। কিন্তু রামায়ণ যখন বাংলা ভাষায় অনুদিত হলো মূলত তখন থেকেই দেবী হিসেবে দুর্গার মহাত্ম বাংলাভাষী হিন্দুদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

‘ছয় শ বছর আগে কীর্তিবাস ওঝা যখন রামায়ণ বাংলায় অনুবাদ করেন, তখন লোকায়ত গল্পে যেখানে দুর্গার কাহিনী প্রচলিত ছিল, সেটি অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। এরপর যেহেতু বাঙালি বাংলা ভাষায় রামায়ণ পেল এবং সেখানে দেখল দুর্গার সাহায্যে রামচন্দ্র রাবণকে বধ করতে পারে, তাহলে সে আমারো প্রাত্যহিক প্রয়োজনে কাজে আসবে’- বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ।

এভাবেই দুর্গা প্রধানতম দেবী হিসেবে আবির্ভূত হন বাঙালি হিন্দুদের কাছে। কিন্তু এরপরও প্রধান ধর্মীয় উৎসব হয়ে উঠতে দুর্গাপূজার সময় লেগেছে আরো কয়েক শ বছর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান ফারজীন হুদা বলেন, মূলত ব্রিটিশ শাসনের সময় হিন্দু এলিট ও জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দুর্গাপূজা। হিন্দুদের মধ্যে যে শ্রেণিভাগ ছিল, সেটি নিয়ে তখন অনেক সামাজিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এ কারণে তখন হিন্দু ধর্মকে ‘মডিফাই’ করার দরকার হয়েছিল।

ফারজীন হুদা আরো বলে, তখন বাংলার এলিট শ্রেণি দেখল যে এমন একটা শক্তির দরকার, যাকে সবাই মেনে নেবে। সেসময় দুর্গার পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর একটা কারণ ছিল, দুর্গার মাতৃরূপ। তিনি বলেন, দুর্গার পূজা জনপ্রিয় হয়ে ওঠার আরেকটি কারণ বাংলায় তখনো মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের প্রাধান্য ছিল।

ফলে দ্রুত বাঙালি হিন্দুরা সেটি মেনে নেয় এবং ক্রমে অন্য দেবদেবীর পূজাকে ছাপিয়ে বড় হয়ে ওঠে দুর্গারপূজা। আর স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত থাকার কারণেই স্থানীয় জমিদার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রজাকে খুশি করার একটা চেষ্টা ছিল, এ কারণে দুর্গাপূজায় আড়ম্বরের মাত্রা বেড়েছিল।

এ ছাড়া দুর্গাপূজার সময় হিসেবে শরৎ কালকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল, যেহেতু এটি কিছুটা অঞ্চলভিত্তিক পূজা ছিল, এই সময় বৃষ্টি তেমন হয় না। তাছাড়া এটি নবান্নের সময়, এ সময় ধান ও অন্যান্য শস্য উঠত, মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো থাকত। ফলে মানুষ আনন্দ করতে পারতো।-কালেরকন্ঠ