ভেঙে পড়ছে জনতা ব্যাংক

2

আর্থিক সূচকে বড় ধরনের পতন ঘটেছে জনতা ব্যাংকের। কয়েক বছর আগেও রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল ব্যাংকটি। এরপর অন্য ব্যাংকগুলো দ্রুত উন্নতি ঘটালেও উল্টোপথে গেছে জনতা ব্যাংক। ব্যাংকটির পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপনা পর্ষদ সদস্যরা নীতিবহির্ভূতভাবে কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে দিয়েছেন। সেসব ঋণ আটকে যাওয়ায় ক্রমেই বিপদ বাড়ছে ব্যাংকটির; বেড়ে চলছে খেলাপি ও লোকসান, কমে যাচ্ছে আমানতের পরিমান। উপরন্তু মূলধনের টাকাও গচ্চা গেছে ব্যাংকটির। প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে দুই পরিচালককে ইতোমধ্যে অপসারণ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিককালে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির একটি হচ্ছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারি। ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম কাদের ও তার ভাই জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আবদুল আজিজ বিভিন্ন কোম্পানি খুলে ঋণের নামে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে সরকারের তহবিল থেকে তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে তুলে নেওয়া হয়েছে আরও ৪০৭ কোটি টাকা। দুই সহোদরের কাছে ৩ হাজার ৪৪৬ কোটি টাকা আদায়ে জনতা ব্যাংক বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে তাদের সম্পত্তি নিলামের। আর এননটেক্স গ্রুপের ২২টি প্রতিষ্ঠান ঋণ নিয়েছে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংক কোম্পানি আইনই শুধু নয়, প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব আইন লঙ্ঘন করে এই গ্রুপকে ঋণ দিয়েছে জনতা ব্যাংক। এই ঋণ বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম পেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এক্ষেত্রে তৎকালীন একাধিক পরিচালক, বর্তমান ও সাবেক এমডিসহ জনতা ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন

কর্মকর্তাদের যোগসাজশ পাওয়া গেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুসন্ধানে। ঋণ বিতরণসহ বিভিন্ন অন্যায় তদবিরের সঙ্গে সম্পৃক্তের অভিযোগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আবদুল হককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে অপসারণ করেছে সরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, মালিক হিসেবে সরকার তাদের নিয়োগ দিয়েছিল, সরকারই অপসারণ করেছে। আমাদের কাছে জনতা ব্যাংক তাদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে অনাপত্তি চেয়েছে। আমরা তা দিয়ে দিয়েছি।

জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদ নিয়োগ পান গত ডিসেম্বরে। আর চেয়ারম্যান হিসেবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পান লুনা সামসুদ্দোহা। যদিও এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি সাবেক সিনিয়র সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিতে আদেশ জারি করে সরকার। মাত্র দুদিনের ব্যবধানে সেই আদেশ পাল্টানো হয়।

চলতি বছরের শুরু থেকেই জনতা ব্যাংকের দুর্নীতি প্রকাশ হতে থাকে। ক্রমেই আর্থিক সূচকগুলোর অবনতির চিত্র প্রকাশ্যে আসে। গত বছরের ডিসেম্বরে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা; কিন্তু ব্যাপক অনিয়মের কারণে তা বাড়তে থাকে। পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিলÑ এমন সব ধরনের সুবিধাই গ্রাহকদের দিয়েছে ব্যাংকটি। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় বাংকের কাছে তদবির করে গ্রাহককে বাড়তি সুবিধাও আদায় করে দিয়েছে ব্যাংকটি। এর পরও চলতি বছরের জুনে খেলাপি ঋণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ২২ শতাংশ। মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার কোটি টাকা।

খেলাপি ঋণ মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যাংকটির আয় কমে গেছে। যেটুকু আয় হয়েছে তা খেলাপি ঋণের পেটে চলে গেছে। নিয়মানুসারে খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। ব্যাংকটিকে জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা প্রভিশন রাখতে হয়েছে। বিপুল পরিমাণ প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকটি পড়েছে লোকসানে। জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির লোকসান দাঁড়ায় ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে জনতা ব্যাংকের নিট মুনাফা হয়েছিল ৯৭ কোটি টাকা। এর আগের বছর ২৫১ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটির। ২০১৫ সালে ব্যাংকটির ৪৬২ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল, যা ছিল সরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

নিয়ম মেনে ঋণ না দিলে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যায়। ব্যাংক যে ঋণ বিতরণ করে, তা ব্যাংকের সম্পদ। ঋণের ধরনভেদে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ নির্ধারণ করা হয়। এই সম্পদের ১০ শতাংশ হারে সংরক্ষণ করতে হয়, যাকে মূলধন বলা হয়; কিন্তু ব্যাংকটি তা করতে পারেনি। ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। অথচ এক বছর আগেও ব্যাংকটির মূলধন উদ্বৃত্ত ছিল।

আমানত তুলে নিচ্ছেন গ্রাহক

এদিকে জনতা ব্যাংক থেকে গ্রাহকরা আমানত তুলে নিচ্ছেন। এতে বিপাকে পড়েছে ব্যাংকটি। জুলাই ও আগস্টে জনতা ব্যাংকের আমানত ২ হাজার ৬১২ কোটি টাকা কমে গেছে। আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে এক সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী জনতা ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়েছে। কলমানি, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নেওয়া ধারের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সিআরআর সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।

তবে ব্যাংকটির খারাপ পরিস্থিতি এখন চোখে পড়লেও এর কারণগুলো সংঘটিত হয়েছে কয়েক বছর আগ থেকে। ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল বারকাত। তার সময়ে দেওয়া ঋণগুলোই এখন খেলাপি হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে এননটেক্সের ঋণ। এই ঋণ দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন বর্তমান এমডি আবদুছ ছালাম আজাদ। তিনি ব্যাংকটিতে এমডি হিসেবে নিয়োগ পান গত বছরের ডিসেম্বরে। ব্যাংকটিতে প্রভাবশালী একটি চক্র গড়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই চক্র ঋণসহ নানা অনিয়ম করে আসছে। বড় ঋণগ্রহীতারা এ চক্রের মূল নিয়ন্ত্রক। এই ব্যাংকে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন। কিন্তু নিয়োগ পাওয়ার আগেই তার নিয়োগ বাতিল করে চেয়ারম্যান হয়েছেন লুনা সামসুদ্দোহা। কথিত আছে- প্রভাবশালী ঋণগ্রহীতাদের চাপে এটি করা হয়েছে।-আমাদের সময়