ভরসা কেবল আওয়ামী বিএনপিতেই!!!

2

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ উপরের শিরোনামটি ঠেলায় পড়ে দেয়া। গেল সপ্তাহে রাজনীতি নিয়ে লিখে ভালই ঠেলা খেয়েছি। ঠেলা মানে, কচন। গাদানী মার্কা কচন। কচন দেয়ার লোকের কমতি ছিল না। আশেপাশের কাছের জনেরাই দিয়েছে। যে যেভাবে পারে দিয়েছে। কেউ কঠিন করে, কেউ বা হালকাপাতলা করে। তবে শুরুটা করে দিয়েছে আমার শোনিম। লেখাটা পড়েই ওর আশ্চর্য্যবোধক জিজ্ঞাসা, তুমি রাজনীতিও বোঝ!
ওর মা এত হালকাপাতলা ভাবে দেয়নি। এমনিতে কচন দেবার চান্স পায় না। এবার পেল। পেলে কি আর ছাড়ে! মুখে ভেঙচী কেটে এবার সেই রকম করে দিয়েছে; “বলেছি না রাজনীতি ফাজনীতি নিয়ে কিচ্ছু লিখবা না! ওসব মাইন্সে লিখে? লেখার আর কিছু নাই!” এতো গেল ঘরের ঠেলা। বাইরেও কম ছিল না। বাইরের দুপক্ষ; মানে আওয়ামী-বিএনপি দু’পক্ষই দিয়েছে। তবে এখানে দু’পক্ষেরই ভাষাগত সাংঘাতিক মিল। অবিকল হুবহু কথায় বলেছে, “মিয়া! ফাইজলামি করেন! নিরপেক্ষতার ভান কইরেন না। নিরপেক্ষতার নামে এইসব ভন্ডামী ছাড়েন।”
দু’পক্ষের এই এক সমস্যা। বিপক্ষ দলের ভাষায় কথা বললে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। আর নিরপেক্ষ দেখলে ফোলে। মুখ ফুলিয়ে ডিজলাইক করে। বলতে পারেন, সহ্যই করতে পারে না। কোন না কোন ভাবে নিজদলের পক্ষে থাকা চাইই চাই। আর তেমনটা না পেলে, হয় ভন্ডামী, না হয় দালালী খুঁজে বেড়ায়। এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টি খুব ভাল। ওদেরকে যাই বলা হোক না কেন, কিচ্ছু বলে না। কেবলই অসহায়ের মত পিটপিট করে এদিক ওদিক তাকায়।
গেল ২৮ বছর ধরেই তাকায়। সেই যে ক্ষমতা গেল নব্বই এ। এরপর থেকেই ওদের করুণ চাহনী। ক্ষমতায় না থাকলেও তাকায়; ক্ষমতায় থাকলেও তাকায়। ৯৬ সালে পাঁচ বছর ক্ষমতায় ছিল। এবার ২০০৯ থেকেও টানা দশ বছর আছে। কিন্তু একটিবারের জন্যেও অসহায় মাখা মুখে তাকানো বন্ধ হয়নি। সারাক্ষণই চেহারায় একটা ভীতি কাজ করে। কখনো হারানোর ভয়; ক্ষমতা কিংবা ভোটে হারানোর ভয়। আবার কখনো ভাঙার ভয়; দল ভাঙা কিংবা ঘর ভাঙার ভয়।
তবে এবার দলপ্রধান সবদিকেই মোটামুটি সিদ্ধহস্তেই সামাল দিতে পেরেছেন। গেল দশবছরে দলও ভাঙেনি কিংবা ঘরও ভাঙেনি। জিএম কাদের ছাড়া মোটামুটি দলের সব প্রধান ব্যক্তির গাড়ীতেই বর্তমানে পতাকা উড়ছে। দোষটা ওনারই। পাঁচ বছর পতাকা উড়িয়ে নিজের ভুলেই উনি পতাকা হারিয়েছেন। অবশ্য মর্যাদার ওই পতাকা ওনাদেরকে মর্যাদা এনে দিলেও সাহস দিতে পারেনি। সব সময় বড় অসহায় মনে হয় তাদের। ক্ষমতায় থেকেও ক্ষমতাহীনের মত এমন অসহায় আচরণ সারাবিশ্বে একমাত্র জাতীয় পার্টির নেতানেত্রী ছাড়া আর কাউকে করতে হয়েছে বলে আমার জানা নেই।
তবে যত অসহায়ই তারা হোন না কেন, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে সেই ১৯৮২ থেকে জাতীয় পার্টি তথা এর প্রধান এরশাদ সাহেব বাংলাদেশের রাজনীতির বিশেষ একটা ফ্যাক্টর। তাকে বাদ দিয়ে গেল ছত্রিশ বছরে এদেশে রাজনীতি হয় না। কোন না কোন ভাবে তিনি রাজনীতিতে তার অস্তিত্ব জানান দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো ক্ষমতায় থেকে কিংবা ক্ষমতা হারিয়ে। তিনি ক্ষমতা হারিয়েছেন বটে, কিন্তু নিজেকে হারাতে দেননি কোনদিনও। নদীর জলস্র্রোতের মত কলকল ধ্বনীতে এগিয়ে যাচ্ছেন সাগর মোহনায়। গুড়ম গুড়ম গর্জন ছাড়াই এগিয়েছেন।
এটা তার ধাঁচেও নেই। তবে ডঃ কামাল হোসেনের আছে। তিনি কালেভদ্রে একআধটু করেন এবং বলেন। গর্জন করেই বলেন। তাঁর গর্জনে বর্ষণ না হলেও ঘর্ষণ হয়। সচেতন সমাজ সেই ঘর্ষণের শব্দ শোনে। মাঠে ময়দানে শোনে, মিডিয়াতে শোনে; এমনকি কোটকাচারীতেও শোনে। সন্দেহ নেই তিনি জ্ঞানে গুণী, বিদ্যায় বিদ্বান। নিজ অঙনে অবশ্যই তিনি শীর্ষতুল্য। সেটা তিনি নিজেও মনে করেন। নিজেকে অনেক গুণে গুণান্বিত মনে করেন। যে কারণে মাঝে মধ্যে তিনি তাঁর কল্পিত অনেক উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় বসে অনেককেই ছোট দেখেন। হেয় করেন।
রাজনীতিতে নিজের জ্ঞাতি সংগ্রামী ভাইদেরকেও হেয় করেন। ৯১ সালে শেখ হাসিনা সংসদে বিরোধী দলের নেতা। ২৯ মিন্টো রোডে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিং হয় বাইরের লনে। মিটিংয়ে ডঃ কামাল কিছু অপ্রাসঙ্গিক কথা বললে তাঁর জবাব দেবার জন্য দাঁড়ান আব্দুল জলিল। তিনি কথা বলা শুরু করতেই কামাল হোসেন বলে বসেন- “সাট আপ, সিট ডাউন।” আব্দুল জলিল, খুব শান্ত মাথায় বলেন, “বাংলায় বলুন। আপনি যে লন্ডনে পড়াশোনা করেছেন আমিও সেখানে পড়াশোনা করেছি। তাই ইংরেজী নয়, ওয়ার্কিং কমিটিতে শোভা পায় এমন কথা বাংলায় বলুন।”
বিষয়টি মাত্র কয়েক মাস আগেও কলামিস্ট স্বদেশ রায়ের কলামে এসেছে। জাতীয় পত্রিকায় ছাপাও হয়েছে। কিন্তু ওনার পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ হয়েছে বলে শুনিনি। আমার শোনায় ভুল থাকতে পারে। কিন্তু সব সময় সব জায়গায় প্রকৃত গণতন্ত্র অনুশীলনের জন্যে ওনার উদার আহ্বানটা ভুল নয়; বরং দাবীটা খুবই ন্যায্য। তবে ১৯৯১ সালে সেটা ন্যায্য ছিল কিনা জানি না। তিনি দলের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চার দাবি জানিয়ে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে গণফোরাম করেন ১৯৯১ সালেই।
এর আগে এবং পর থেকেও দেখেছি আওয়ামী লীগে দুই একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ৩ বছর অন্তর নিয়মিত কাউন্সিল হয়। সম্মেলন থেকে দলের সভাপতি নির্বাচিত হয়, কমিটি গঠন হয়। কিন্তু গণফোরামে কোনদিন সম্মেলনও হয় না; নির্বাচনও হয় না। সম্মেলন ও নির্বাচন ছাড়াই কামাল হোসেন সভাপতি আছেন। তিনি সভাপতি পদে অন্য কাউকে বসাননি। সবাই জানে তিনি ১৯৯১ সাল থেকেই সভাপতি আছেন; কিন্তু কেউ জানে না, তিনি এভাবে আরো কতকাল সভাপতি থাকবেন।
ডঃ কামাল হোসেন জীবনে কখনও ভোটে নির্বাচিত হতে পারেননি। তিনি ৭৩ এ বঙ্গবন্ধুর ছেড়ে দেয়া তেজগাঁও আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীও হয়েছিলেন। অদ্ভুত বিষয় হলো, নিজে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে চলমান সরকারকে বলেন অনির্বাচিত। বিষয়টি আসলে বোঝা খুব কঠিন। এবং এত কঠিন বিষয় আমি বুঝিও না। কেবল বুঝি, জীবনে আরও দুটো নির্বাচন তিনি করেছেন। একটি ৮১ তে আর অন্যটি ৯১ এ। দুটোতেই হেরেছেন। ৯১ সালে দুই হাজার ভোটে হেরেছেন একেবারেই অপরিচিত মিরপুরের হারুন মোলার কাছে।
তাঁর হারার রেকর্ড আছে। কিন্তু গড়ার আছে কিনা জানি না। বাংলাদেশ গঠনে তাঁর ভূমিকা নিয়ে নিন্দুকেরা কথা বলেন। বা বলার চেষ্টা করেন। এটা হয়ত বড় বড় মানুষদের কাজ। জ্ঞানে কিংবা গরিমায় যারা বড় তাদের কাজ। আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের কাজও নয়; জানার বিষয়ও নয়। হয়ত নিন্দুকদের গবেষণার বিষয়। তবে গবেষণার ফলাফল যাই বলুক, একথা কেউই কোনদিন বলতে পারবে না যে, বঙ্গবন্ধু তাঁকে পছন্দ করতেন না। মূলত বঙ্গবন্ধু তাঁকে ভীষন পছন্দ করতেন। এবং খুবই স্নেহ করতেন। একথাও অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে তিনিই প্রধান ব্যক্তি।
চাইলে তিনি অনেক জায়গাতেই প্রধান ব্যক্তি হতে পারতেন। অন্তত ১৯৮১ সালের ১৫ই নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আওয়ামী প্রার্থী হবার পরে সেই সুযোগটা তিনি নিতেই পারতেন। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু কণ্যা তাঁকে হাতে ধরে সারা দেশ চষে বেড়িয়েছেন। নির্বাচনী প্রচারে ট্রেনে করে ঘুরে বেড়াননি এমন একটি জায়গাও নেই। তাঁকে সারা দেশবাসী চেনার এবং দেখার অন্যতম কারণও এটি। সেই সময়ে অজপাড়াগাঁয়ের রেলস্টেশনে গভীর রাতে তাঁকে দেখার সুযোগ নিয়েছিলাম আমি।
কিন্তু তিনি সেই সুযোগটি নিতে পারেননি। হয়ত চাননি, তাই নিতে পারেননি। এবারের নির্বাচনেও পারবেন কিনা জানি না। নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে হলে রাজনীতির মাঠে দৌঁড়াতে হয়। তিনি সাধারণত খুব একটা দৌঁড়ান না। আর বদরুদ্দোজা চোধুরী সাহেব! নাখালপাড়ায় রেলপথ ধরে ছেলেকে সাথে করে জাতি তাঁকে দৌাঁড়াতে দেখেছে বটে। কিন্তু রাজনীতির মাঠে সেভাবে দেখেছে বলে মনে পড়ে না। তাই নতুন শক্তি কিংবা নতুন ফ্রন্ট, যে নামেই চেষ্টা চলুক না কেন, অতীত রেকর্ড ততটা আশা দেখায় না।
আর এরশাদ সাহেব! উনি নিজেই তো কোন আশা দেখেন না। আমাদের দেখাবেন কি! সব সময় তাকিয়ে থাকেন দুই দলের দিকে। শেষতক যেদিকের পাল্লা ভারী মনে হবে, পট করে সেদিকেই ঝাঁপ দেবেন। ঝাঁপাঝাপিতে ওনার মুন্সিয়ানা আছে বলেই আওয়ামী-বিএনপি ছাড়া বাঙালীর গতি নেই। যে যতই বলুক, এই দুটি দলই এখনও বাংলাদেশের আশাআকাঙ্খার প্রতিক। বাঙালীর ভাগ্য বাঙালী এদের হাতেই সপে দেবে। তারা ভালো রাখলে ভাল, খারাপ রাখলে খারাপ। এই দু’য়ের বাইরে বাঙালীর যাবার আর কোন জায়গা নেই। আশ্রয় বলি, আর আশ্রম বলি; সবই কেবল আওয়ামী বিএনপিতেই!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।