২১ আগষ্ট গ্রেনেড হামলার রায়: বাবরসহ ১৯ জনে মৃত্যুদন্ড, তারেকসহ ১৭ জনের যাবজ্জীবন

66

যুগবার্তা ডেস্কঃ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর ও সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীসহ ১৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয় আরও ১১ আসামীকে। আজ দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দীন এ রায় ঘোষণা করেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় আনা দুই মামলায় আসামির সংখ্যা ৪৯ জন। এদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জঙ্গি মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। কারাগারে রয়েছেন, বিএনপি নেতা সাবেক স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ৩১ জন।

রায়কে ঘিরে যাতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে জন্য আদালত এলাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নাজিমউদ্দিন রোডের বিশেষ আদালতের চারপাশের সড়কে কয়েকস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন এলাকা চিহ্নিত করে সেখানে পুলিশ সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালন করবে। শহরজুড়ে থাকবে গোয়েন্দা নজরদারি। সব মিলে রাজধানীতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রায় পাঁচ হাজার সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবে।

দেশব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী ও বোমা হামলার প্রতিবাদে ১৪ বছর ৪৯ দিন আগে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ সমাবেশের আয়োজন করেছিল। এই সমাবেশ শেষ হওয়ার মুহূর্তে চালানো হয় পৈশাচিক গ্রেনেড হামলা। এ হামলায় নিহত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী বেগম আইভী রহমানসহ ২৪ জন। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তত্কালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। আহত হন প্রায় ৪শ’ নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষ। এদের অনেকেই এখনও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লি­ন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন কাটাচ্ছেন।

ঘটনার পর দিন ২২ আগস্ট বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের নির্দেশে তরিঘড়ি করে মতিঝিল থানায় (বর্তমানে পল্টন থানা) উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলা (মামলা নম্বর ৯৭) করেন। তবে আওয়ামী লীগ নেতা (প্রয়াত) আব্দুল জলিল ও সাবের হোসেন চৌধুরী থানায় মামলা করতে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। এরপরই ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা শুরু করে চারদলীয় জোট সরকার। হামলার দায় চাপানোর চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের ওপর। এখানেই শেষ নয় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ঘটনা তদন্তে ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট বিচারপতি জয়নুল আবেদীনকে চেয়ারম্যান করে এক সদস্যের বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে। এক মাস ১০ দিনের মাথায় ১৬২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন দিয়ে কমিশন বলে সংগৃহীত তথ্য প্রমাণে সন্দেহাতীতভাবে ইঙ্গিত করে এ হামলার পেছনে একটি শক্তিশালী বিদেশি শক্তি জড়িত। তবে ওই প্রতিবেদন বিদেশি শক্তির নাম নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া সে সময়ের জোট সরকার যুক্তরাজ্যের তদন্ত সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে তদন্তের জন্য আমন্ত্রণ জানালেও তারা সরকারের অসহযোগিতায় বিরক্তি প্রকাশ করে চলে যায়।

অপরদিকে হামলার পর তত্কালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় এবং এতে জজ মিয়া নামে এক ভবঘুরে, একজন ছাত্র, একজন আওয়ামী লীগ কর্মীসহ ২০ জনকে গ্রেফতার করা হয়। সাজানো হয় জজ মিয়া নাটক। অথচ পরবর্তী তদন্তে তাদের কারো বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়ায় মামলার কার্যক্রম থেমে যায়।

২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় মামলার কার্যক্রম নতুন করে শুরু হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ফজলুল কবির। কিন্তু মামলার তদন্ত করতে গিয়ে তাকে বার বার হোঁচট খেতে হয়। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তার (যিনি মামলার পলাতক আসামি) রোষানলে পড়তে হয় তাকে। মামলার অন্যতম আসামি হামলার গ্রেনেড সরবরাহকারীর বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুকে গ্রেফতার করার সময় সরাসরি তাকে হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু তারপরও মামলার তদন্ত কর্তকর্তা ছিলেন অনড়

ঘটনার তিন বছর ৯ মাস ২১ দিন পর ২০০৮ সালের ১১ জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির সিনিয়র এএসপি ফজলুল কবির চার দলীয় জোট সরকারের উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে সিএমএম আদালতে দু’টি অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। ওই বছরই মামলা দু’টির কার্যক্রম দ্রুত বিচার আদালত-১-এ স্থানান্তর করা হয়। এ আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনের ২৯/১১ (হত্যা) ও ৩০/১১ (বিস্ফোরক) মামলা দু’টির বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক শাহেদ নূর উদ্দিন এর আদালতে এ মামলার বিচার শুরু হয়।

২০০৮ সালের ২৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৯ জুন পর্যন্ত ৬১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করে ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু প্রথম অভিযোগপত্রে গ্রেনেড সংগ্রহ, সরবরাহকারী, আক্রমণের পরিকল্পনাকারী আসামিরা শনাক্ত এবং অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় ২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনক্রমে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এবার মামলাটি অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই প্রথম অভিযোগপত্রের ২২ জন ছাড়াও তারেক রহমানসহ আরো ৩০ জনের (মোট আসামি ৫২ জন) বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ সম্পূরক চার্জশিটের ৩০ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ফের বিচার শুরু হয়। তবে এর মধ্যে তিনজন আসামির অন্য মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের মামলা থেকে বাদ দেয়া হয়। এরা হলেন— জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নান ও শহিদুল আলম বিপুল।

অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পর রাষ্ট্রপক্ষের ৪৯১ জন সাক্ষীর মধ্যে ২২৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। আসামিপক্ষে ২০ জন সাফাই সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। মামলায় ১৪৪টি আলামত ও ৫৫টি বস্তু প্রদর্শন করা হয়েছে। গত বছরের ৩০ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আব্দুল কাহার আকন্দের জেরা শেষের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয়।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর এ মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয়। মামলার যুক্তিতর্কের ১১৯ কার্যদিবসের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষ নিয়েছে ২৯ কার্যদিবস আর আসামি পক্ষ নিয়েছে ৯০ কার্যদিবস। শুনানি শেষে গত ১৮ সেপ্টেম্বর আদালত জামিনে থাকা ৮ আসামির জামিন বাতিল করে ও রায়ের দিন ঘোষণা করে।