রাষ্ট্রপতির সই অবশেষে ডিজিটাল আইন কার্যকর

4

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল ২০১৮’-এ স্বাক্ষর করেছেন। এর ফলে সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন মহলের আপত্তি তোলা বিতর্কিত আইনটি কার্যকর হলো।গতকাল সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রপতির সই করা নথি সংসদ সচিবালয়ে পৌঁছে। দু-এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।

বিভিন্ন মহলের আহ্বানের পর রাষ্ট্রপতি বিলটির বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত দেন, তা দেখার অপেক্ষায় ছিল সবাই। রাষ্ট্রপতি ওই বিলে সম্মতি দিয়েছেন বলে গতকাল দুপুরে নিশ্চিত করেন রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব জয়নাল আবেদীন। বিকেলে সংসদ সচিবালয়ের পরিচালক (গণসংযোগ) মো. তারিক মাহমুদ জানান, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলসহ সাতটি বিলে রাষ্ট্রপতি সই করেছেন। বিলগুলো হলো—ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল, সড়ক পরিবহন বিল, ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি’য়া আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন কওমি মাদরাসাগুলোর দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার ডিগ্রির (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিল, পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরির শর্তাবলি) বিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট বিল এবং কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট বিল।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের জন্য সংসদ সচিবালয়ের আইন শাখা থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলটির নথি গত ৪ অক্টোবর বঙ্গভবনে পাঠানো হয়। এর আগে ২ অক্টোবর ওই নথিতে স্বাক্ষর করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদ অধিবেশনে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বিলটি পাসে জোর আপত্তি জানালেও তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর থেকেই বিতর্ক চলছিল। এটি সংসদে পাস হওয়ার পর থেকে সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের সংগঠন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে বিলে সই না করার জন্য রাষ্ট্রপতির প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

কার্যকর হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বলা হয়েছে, আইনটি কার্যকর হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল হবে। তবে এ আইনে বিতর্কিত ৫৭ ধারার বিষয়গুলো চারটি ধারায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া পুলিশকে পরোয়ানা ও কারো অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি এবং গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ আইনে ঢোকানো হয়েছে ঔপনিবেশিক আমলের সমালোচিত আইন ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’। আর আইনের ১৪টি ধারার অপরাধ হবে অজামিনযোগ্য। বিশ্বের যেকোনো জায়গায় বসে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক এ আইন লঙ্ঘন হয়—এমন অপরাধ করলে তার বিচার করা যাবে।

নতুন এ আইনের অধীনে সংগঠিত অপরাধের বিচার হবে ট্রাইব্যুনালে। অভিযোগ গঠনের ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে সর্বোচ্চ ৯০ কার্যদিবস সময় বাড়ানো যাবে। আর আইনে ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণাত্মক, মিথ্যা বা ভীতি প্রদর্শক তথ্য-উপাত্ত প্রকাশ; মানহানিকর তথ্য প্রকাশ; ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত; আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে অপরাধে জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

গত ৯ এপ্রিল বহুল আলোচিত বিলটি জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পর এটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত জানতে চায়। কমিটির বৈঠকে উপস্থিত হয়ে সংবাদপত্রগুলোর সম্পাদকদের সংগঠন এডিটরস কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং বেসরকারি টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকোসহ অনেকেই উপস্থিত হয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও সংসদীয় কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশে তা রাখা হয়নি। বিশেষ করে তাদের পক্ষ থেকে ব্যাপক সমালোচিত তথ্য-প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাসহ কয়েকটি ধারা আরো বিশদ আকারে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব বাতিলের দাবি জানানো হয়। তারা দাবি করে প্রস্তাবিত ওই আইনের ২১, ২৫, ২৮, ৩১, ৩২ ও ৪৩ ধারা বিদ্যমান থাকলে স্বাধীন সাংবাদিকতায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

একই দাবি জানানো হয়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ (টিআইবি) বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থার পক্ষ থেকে। কিন্তু পাস হওয়া বিলের কয়েকটি ধারায় কিছু পরিবর্তন আনা হলেও ৩২ ধারাসহ বেশির ভাগ ধারা বহাল রয়েছে।

নতুন আইনের ৩২(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টের আওতাভুক্ত অপরাধ কম্পিউটার, ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে সংঘটন করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। ৩২(২) ধরায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি উপধারা-১-এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয়বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অনধিক এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্প ২০২১ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও নিরাপদ ব্যবহার আবশ্যক। বর্তমান বিশ্বে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে এর সুফল ভোগের পাশাপাশি অপপ্রয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে; যার ফলে সাইবার অপরাধের মাত্রাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই জাতীয় ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও ডিজিটাল অপরাধগুলোর প্রতিকার, প্রতিরোধ, দমন, শনাক্তকরণ, তদন্ত এবং বিচারের উদ্দেশ্যে এ আইন প্রণয়ন অপরিহার্য। সাইবার তথা ডিজিটাল অপরাধের কবল থেকে রাষ্ট্র এবং জনগণের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিধান এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য।-কালেরকন্ঠ