রাজনীতি হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো

1

সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে অবসরের পর রাজনীতিতে যোগ দেওয়া নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের পথে এটিকে বাধা হিসেবে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকেও চিন্তা-ভাবনা করতে বলেছেন। তাঁর মতে, ছাত্র বয়স থেকে যাঁরা রাজনীতি করে আসছেন, তাঁদের হাতে নেতৃত্ব থাকা উচিত। রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে প্রবাদ আছে, গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ (ভাবি)। রাজনীতিও হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। যে কেউ যেকোনো সময় ঢুকে পড়তে পারে, বাধা নাই। ’
গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে অংশ নিয়ে লিখিত বক্তব্যের বাইরে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্র মাঠে গতকাল সকালে ওই অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন তিনি। এবার সমাবর্তন বক্তা ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।

রাষ্ট্রপতি আরো বলেন, ‘আমি যদি বলি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিকসের লেকচারার হইতাম চাই, নিশ্চয়ই ভিসি সাহেব আমারে নেবেন না। বা কোনো হাসপাতালে গিয়া বলি, এত দিন রাজনীতি করছি, হাসপাতালে ডাক্তারি করতে দেন; বোঝেন অবস্থাটা কী হবে! এগুলো বললে হাসির পাত্র হওয়া ছাড়া আর কিছু হবে না। যদি বলি এত বছর রাজনীতি করছি, ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে সুপারিনটেনডেন্টের পদ দিতে পার। সেখানে আমাকে দেবে? কিন্তু রাজনীতি গরিবের ভাউজ। ’ তিনি বলেন, “যারা সরকারি চাকরি করেন, জজ সাহেব যাঁরা আছেন ৬৭ বছর চাকরি করবেন, রিটায়ারের পর বলবেন, ‘আমিও রাজনীতিবিদ। ’ আর্মির জেনারেল হওয়া, সেনাপ্রধান হওয়া, সরকারি সচিব, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি, ক্যাবিনেট সেক্রেটারি রিটায়ার কইরা বলেন, ‘আমি রাজনীতি করব। ’ কোনো রাখঢাক নাই। যার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা তখনই রাজনীতিতে ঢোকে…। চাকরি করে যা করার করছে, এরপর বলছে, ‘রাজনীতি করব’। আমার মনে হয় সকল রাজনৈতিক দলকে এটা চিন্তা করা উচিত। ”

রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘পুলিশের ঊর্ধ্বতন ডিআইজি, আইজিরাও রাজনীতি করবেন। মনে মনে কই, রাজনীতি করার সময় এই পুলিশ তোমার বাহিনী দিয়ে পাছার মধ্যে বাড়ি দিছ। তুমি আবার আমার লগে আইছো রাজনীতি করতে। কই যামু। রাজনৈতিক দলগুলোকে এসব ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। এই যে রাজনীতিবিদদের সমস্যা, এই সমস্যার কারণও এটা। বিজনেসম্যানরা তো আছেই…শিল্পপতি-ভগ্নিপতিদের আগমন এভাবে হয়ে যায়। এগুলো থামানো দরকার। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের উদ্যোগ চলমান রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তৎপর থাকার নির্দেশ দেন রাষ্ট্রপতি ও আচার্য আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আশার আলো দেখা গেছে। তফসিল ঘোষণা হলে জটিলতা দেখা দেবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া যেন বাধাগ্রস্ত না হয় সে জন্য কর্তৃপক্ষকে তৎপর থাকতে হবে। শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা অনুচিত হবে। ডাকসু নির্বাচন হলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয়ে যাবে। ছাত্ররাজনীতি থেকেই জাতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব আসবে। ’

এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম সমাবর্তনেও দ্রুত ডাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি।

সান্ধ্যকালীন পাঠদানে স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না তা ভাবতে হবে : গতকাল উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে উচ্চশিক্ষা নিছক চাকরির জন্যই নয়, মূল উদ্দেশ্য মানবিক ও উদার হওয়া। উচ্চশিক্ষা নিয়ে সবাই প্রতিষ্ঠিত হবে, বিত্ত-বৈভবের মালিক হবে—এমনটা নয়, মনুষ্যত্ব বিকাশই শিক্ষার লক্ষ্য। ’ তিনি বলেন, ‘গুণগত মান সমুন্নত রেখে দেশের চাহিদা ও বিশ্বের জনশক্তি বাজারের কথা বিবেচনা করে গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের সম্প্রসারণ করতে হবে। কিছু লোকের স্বার্থে নয়, দেশ ও জাতির স্বার্থে অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোকে যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজাতে হবে। ডিপ্লোমা ও সান্ধ্যকালীন কোর্সের নামে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের পাশাপাশি স্বাভাবিক লেখাপড়ার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে কি না তা ভাবতে হবে। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ছাত্র, শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই বিষয়টি ভেবে দেখবেন। ’

গতকাল সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমাদ, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সামাদ, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দীনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের ডিন ও পরিচালক, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্যরা।

প্রাথমিক শিক্ষার অনেক ভাগ থাকা দুর্ভাগ্যের : শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধের ওপর জোর দিয়ে সমাবর্তন বক্তা জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘উচ্চশিক্ষা লাভ করে ভালো-মন্দ বিচার করতে হবে। ভালোর পক্ষে দাঁড়িয়ে মন্দকে প্রতিরোধ করতে হবে, আর এটা করতে না পারলে উচ্চশিক্ষা বৃথা। জীবনে আহরিত মূল্যবোধ সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ নাও হতে পারে। শিক্ষার্থীরা যদি মানুষের কল্যাণের লক্ষ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মূল্যবোধের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সর্বাগ্রে আমি তাকেই স্বাগত জানাব। ’

ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘শিক্ষাব্যবস্থা হওয়া উচিত পিরামিডের মতো। এর ভিত্তি হবে চওড়া, উচ্চশিক্ষা হবে তার চূড়া। সকলে যাতে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করতে পারে, তা সর্বাগ্রে দেখা দরকার। ’ তিনি আরো বলেন, ইংরেজিতে উচ্চশিক্ষার একটি সমার্থ হলো টারশিয়ারি এডুকেশন বা তৃতীয় স্তরের শিক্ষা। তার মানে, দুটি স্তর (প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা—আমাদের দেশে প্রচলিত উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাও এর অন্তর্গত) অতিক্রম করে এই তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করতে হয়। উচ্চশিক্ষা স্বয়ম্ভূ নয়। এর ভিত্তি আগের দুই স্তরের শিক্ষা। ’

ড. আনিসুজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশে নিম্নস্তরের শিক্ষার যে অনেক ভাগ রয়েছে তা আমাদের দুর্ভাগ্য। বাংলাদেশ রাষ্ট্রই একাধিক ধরনের শিক্ষার পৃষ্ঠপোষকতা করে চলেছে। নির্ধন শিশু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় প্রবেশ করার কথা কল্পনা করতে পারে না। অন্যদিকে ধনী পরিবারের সন্তান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ার কথা ভাবতেই পারে না। যদিও সরকারিভাবে ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাধারাও পাশাপাশি চলছে। তারপর রয়েছে দুই ধরনের মাদরাসা শিক্ষা। সাধারণত গরিব ছেলে-মেয়েই সেখানে যায়। এমনকি যারা সওয়াব হাসিল করতে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে, তারাও নিজেদের সন্তানকে সেখানে পাঠায় না। ’

সমাবর্তন উপলক্ষে গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করে। সকাল থেকেই সমাবর্তনস্থলে সমবেত হতে শুরু করে গ্র্যাজুয়েটরা। কেউ কেউ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দল বেঁধে ছবি তোলে।

দুপুর ১২টার দিকে রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদের নেতৃত্বে শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। শোভাযাত্রা শেষে রাষ্ট্রপতি অতিথিদের নিয়ে মঞ্চে ওঠেন। এরপর জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয়। ১২টা ৫ মিনিটের দিকে পাঠ করা হয় বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নৃত্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা স্বাগত সংগীত ও নৃত্য পরিবেশন করে। সাংস্কৃতিক পরিবেশনা শেষে পিএইচডি, এমফিল, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের নাম রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্যের কাছে উপস্থাপন করেন বিভিন্ন অনুষদের ডিন ও কোষাধ্যক্ষ। রাষ্ট্রপতি ৮১ জনকে পিএইচডি, ২৭ জনকে এমফিল এবং ২১ হাজার ১১১ জনকে গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রির সনদ প্রদান করেন। পরে তিনি কৃতী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৯৬টি স্বর্ণপদক প্রদান করেন।-কালেরকন্ঠ