রাজনীতির ইতিকথা!!

3

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার এক বন্ধু। একেবারে বাল্যকালের বালিকাবন্ধু। বিচ্ছেদও সেই শিশুকালেই। বাবা-মায়ের চাকুরীর সুবাদে এখানে সেখানে সবাই ছিটকে পড়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশের নানাবিধ সুযোগের কল্যাণে ৪০ বছর পর সেদিন আবার দেখা। যাকে বলে পুণর্মিলন। এসবে পূরো কৃতিত্বটা ওরই। ছেলেবেলার কয়েক বন্ধু মিলে মিলনমেলার পূরোটা দিন কাটিয়েছি ওর বাসাতেই। আত্মার আত্মীয়কে কাছে পেলে যেমন লাগে, আমাদের প্রত্যেকের সেদিন ঠিক তেমন লেগেছে। আর দিনটিকে মনে হয়েছে নিকট অতীতের সবচেয়ে ছোটদিন। সেদিন অশান্ত মন অনেক কিছু চেয়েছে। কেবল সবাইকে ফেলে ফিরে আসতে মন চায়নি এতটুকুও।
পূণঃযোগাযোগের ফলে আজকাল মাঝেমধ্যে কথাও হয়। ফোনেই কথা হয়। খুব সিরিয়াস কোন কথা নয়। সাংসারিক সুখদুঃখের হালকাপাতলা এলেবেলে কথা। ছেলেমেয়েদের কথা, নিজেদের অসুখ-বিসুখের কথা। টুকটাক ব্যবসার কথাও হয়। ব্যবসায় ওরা খুব সফল। চুটিয়ে ব্যবসা করছে এখন। বড় ফ্যাক্টরী করেছে ঢাকাতেই। ফুড প্রডাক্ট নিয়ে কাজ। সারাদেশেই ওদের প্রডাক্ট বাজারজাত হচ্ছে। মূলত এসব নিয়েই কথা হয়।
মাঝেমধ্যে আমাদের পত্রিকা নিয়েও কথা হয়। বন্ধু আমার নিয়মিত পাঠিকা ‘সাপ্তাহিক সিমেকে’র। ক্যুরিয়ারে পত্রিকা পৌঁছার প্রথম দিনেই পড়ে সাবাড় করে ফেলে। ভাইজান, মানে ওর সাহেবও পড়েন। তিনি পড়েন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। ভাল না লাগলেও পড়েন। নিজেদের জিনিস হলে যা হয়। ভাল না লাগলেও পড়তে হয়। তবে তিনি কেবল পড়েন না; কমেন্টও করেন। মিটমিট করে হেসে হেসে স্ত্রীকে বলেন, “পত্রিকাডা খারাপ না। ভালাই লাগে। সোজা ভাষায় লেখে, সহজে বুঝা যায়।” এরপর একটু মুচকী হাসি দিয়ে বলেন, “শ্যালক আমার কোন দল করে হেইডাও বোঝা যায়।”
দল বলতে তিনি আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল নয়, বিএনপি-আওয়ামী লীগকেই বুঝিয়েছেন। অবশ্য এই দুই দেশের সাথে আমাদের দেশের দুইদলের মিলও আছে। একদলের পাওয়ার নাই কিন্তু বিশাল সমর্থক আছে। অন্যদলের পাওয়ারও আছে, সমর্থকও আছে। দুঃখজনক হলো, দুইদলের কেউই সমর্থক খোঁজে না; বিশাল সমর্থকদের খোঁজ রাখে না। খোঁজার চেষ্টা করে না। খোঁজে কেবল পাওয়ার। যে যার লেভেল থেকে খোঁজে। দল পাওয়ার খোঁজে, দলের নেতাকর্মীরাও পাওয়ার খোঁজে।
যদি সমর্থকদের খোঁজতোই তাহলে ১৬ বছর দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন বিএনপি নামক দেশের অন্যতম বৃহৎ দলটির আজকে এই অবস্থা হতো না। নিস্তেজ হতে হতে একেবারে নেতিয়ে পড়তো না। এভাবে নেতিয়ে পড়া, ঝিমিয়ে পড়া বিএনপিকে জাগিয়ে তোলার কেউ নেই। কোথায়ও নেই। অথচ দেশজুড়ে বিএনপির সমর্থক। অগণিত সমর্থক। দুঃখজনক হলো এত্ত এত্ত সমর্থকদের উপর বিএনপির সামান্য ভরসা নেই। তারা ভরসা করে অন্যের উপর। অন্য দলের শক্তির উপর; দয়া এবং করুণার উপর। মিছিল-মিটিং এবং আন্দোলনে ভরসা করে; ভোটেও ভরসা করে।
অথচ এতটা না করলেও চলতো। যার নিজের দলে এত সমর্থক তার অন্যের উপর এতটা ভরসার দরকার পড়ে না। সমস্যা হলো এত্ত এত্ত সমর্থক থাকলেও এত্ত এত্ত কর্মী নেই দলে। যাও আছে, তারাও সক্রিয়ভাবে মাঠে নেই। আবার মাঠে যারা আছে তারা ততটা কর্মঠ নয়, বলিষ্ঠ নয়। মাঠে দরকার কর্মঠ এবং বলিষ্ঠ নিবেদিত প্রাণ কর্মী। যারা জীবন বাজি রেখে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। পুলিশের মামলা আর হামলাকে যারা বাঁধা মনে করে তারা আর যাই হোক, বলিষ্ঠ কর্মী হতে পারে না।
হবে কিভাবে! মামলা হামলার ভয়তে মাঠে যদি নেতাই না থাকে, কর্মী থাকবে কোন্ দুঃখে! নেতারা কর্মসূচী ডেকেই হাওয়া হয়ে যান। সারাদিন ঘুমিয়ে কাটান। রাতে উঠে খবর নেন। এভাবে সবাই যে যার জায়গায় সেইফ সাইডে থাকার চেষ্টা করেন। কর্মীরা এদিক ওদিক তাকিয়ে নেতা দেখে না; দেখে মাঠভর্তি পুলিশ। তাই মাঠে নামে না। আবার নেতাদের বয়সও হয়েছে। আশি ছুঁইছুঁই করছে বেশীরভাগ নেতার। রাত দশটা বাজলেই তাদের ঘুম পায়। অথচ গেল ১২টা বছর তাদেরকে গুলশানের অফিসে নীতিনির্ধারনী মিটিং এ ডাকাই হয়েছে রাত দশটার পর। কোনদিনও রাত দুটোর আগে ছাড়া পাননি তাঁরা।
বিষয়টি ভালভাবে নেননি। সাহস করে মুখে কিছু বলতে না পারলেও ভালভাবে নেননি সিনিয়র নেতারা। মনে মনে ফুঁসেছেন কিন্তু প্রকাশ করেননি। শুধু অভিনয় করে গেছেন। মিটিং এ সরব থেকেছেন, আর মাঠে থেকেছেন নীরব। এই রাতজাগা স্বভাবের কারনে সুপ্রীম কমান্ডের সাথে দূরত্ব বেড়েছে। তৈরী হয়েছে পারস্পরিক আস্থাহীনতার সংকট। এভাবে উর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি অধস্তন নেতৃত্বের আস্থাহীনতাই টানা ১২ বছর ক্ষমতায় না থাকা বিএনপিকে ধীরে ধীরে নেতৃত্বহীন করেছে। আর নামিয়ে এনেছে এই অবস্থায়।
একইভাবে একটানা ক্ষমতায় আছে বলেই আওয়ামী লীগকে এ জাতীয় সংকটে পড়তে হয়নি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তারপর থেকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ টানা প্রায় ১০ বছর ক্ষমতায় আছে দলটি। বিএনপির বেহাল অবস্থায় দেশে এখন আওয়ামী লীগের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও দন্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে।
এই বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নিজেই। টানা ক্ষমতায় থাকায় দলের প্রতিটি স্তরে অর্ন্তদ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়েছে। এমনও অনেক লোক আছে, যারা শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০ তলা থেকে লাফিয়ে পড়বে। কিন্তু নিজের এলাকার আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যকে হারানোর জন্য এমন কিছু নাই যে করবে না। প্রয়োজনে আওয়ামী লীগের জন্য পকেটের পয়সা খরচ করে অন্য এলাকায় গিয়ে কাজ করবে। কিন্তু নিজের এলাকার এমপিকে হারাতেই হবে। যত ক্ষোভ কেবল নিজের এলাকার এমপির উপর।
তারা মনেপ্রাণে চান, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসুক; সব আসন জিতুক; শুধু নিজের আসনটি ছাড়া। ৩০০ আসনেই এমন ঘরের শত্র“রা সক্রিয়। তারা সরকারের সাফল্য প্রচারের চেয়ে দলীয় প্রতিপক্ষের বদনামে বেশি সময় দেন। আর সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন। শুধু নিজের এলাকায় কিভাবে নৌকাকে ডোবানো যায়, তা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।
আবার সমস্যাটি যে শুধু দলীয় অর্ন্তদ্বন্দ্ব, তাই নয়; দলীয় লোকদের বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও রয়েছে। টেন্ডারবাজী, চাঁদাবাজি, মাস্তানির অভিযোগ তো রয়েছেই; রয়েছে দুর্নীতি ও টাকার বিনিময়ে কাজ করার অভিযোগও। এসব কারণে জনগণও বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলে জনগণ ক্ষিপ্ত হবে, অভিযোগের পাহাড় জমবে এটাই স্বাভাবিক। এসব অভিযোগ শেখ হাসিনারও অজানা নয়। তিনি ইতিমধ্যেই দলীয় মিটিং এ এটা প্রকাশ করেছেন এবং কঠোরভাবে হুঁশিয়ার করেছেন এমপিদের।
কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। এ ব্যাপারে তাঁকে আরো কঠোর হতে হবে। ভীষন কঠোর হতে হবে। সব অভিযুক্তের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জনগণের কাছে অধিকতর গ্রহনযোগ্য এবং ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিদের প্রার্থী করতে হবে। না হলে প্রত্যাখ্যান নিশ্চিত। সন্দেহ নেই, জনগণ নিশ্চিত প্রত্যাখ্যান করবে। কিন্তু এই বোধটুকু নেতাকর্মীদের আছে বলে মনে হয় না। তাদের কোন আচরণেই মনে হয় না। তারা এ ব্যাপারে খুবই উদাসীন। এবং এসব ব্যাপারে প্রধাননেত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছেন। তীর্থের কাকের মতই তাকিয়ে আছেন। তাঁর ওপর নির্ভর করে আছেন। সবার ধারণা, তাদের নিজেদের কিছু করতে হবে না; তারা নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকবেন। শেখ হাসিনা যাদু জানেন। সেই জাদু দিয়ে তিনি আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় এনে দেবেন। আর তারা আরামে ক্ষমতা ব্যবহার করবেন।
এভাবে একদলের নেতাকর্মীরা যদি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে প্রধাননেত্রীর উপর ভরসা করেন, আর অন্যদলের প্রধাননেত্রী যদি নিজে ঘুমিয়ে থেকে নেতাকর্মীদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে অবস্থা হবে ভয়াবহ। গণেশ উল্টে যেতে বাধ্য হবে। এবং বলা মুশকিল হবে কার বিজয় নিশ্চিত কিংবা শেষ হাসি কে হাসবে। তবে শেষ হাসি যেই হাসুক, জনগণের হাসি যেন অমলিন না হয়, জনগণ সকল সময় সেই আশা করে। আর এই প্রত্যাশা করেই রোজ রাতে ঘুমুতে যায়। ঘুমুতে যায় একটা সুন্দর সকালের প্রত্যাশায়। যে সকালে রৌদ্রের চিকচিক আলোতে সোনার বাংলাকে আরো বেশী আলোকিত মনে হবে।-লেখকঃউপদেষ্টা সম্পাদক,যুগবার্তা।