বৈদেশিক শ্রমবাজারে আস্থার সংকট

17

যুগবার্তা ডেস্কঃ বাংলাদেশের ˆবৈদেশিক শ্রমবাজারে আস্থার সংকট চরমে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের প্রধান ˆবৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এই শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল হলেও আস্থার সংকটের কারণে এই খাতে কোনো শৃঙ্খলা ফেরানো যাচ্ছে না। বিদেশগামী কর্মীদের জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ লুটের মহোৎসব চলছে। অতি মুনাফার লক্ষ্যে গড়ে উঠছে নতুন নতুন সিন্ডিকেট। আইনের তোয়াক্কা না করে কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা হচ্ছে অহরহ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেরও বাইরে কাজ করছে সিন্ডিকেটের রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। মন্ত্রণালয়ের তালিকায় দেশে নিবন্ধিত রিক্রুটিং এজেন্সি রয়েছে দেড় হাজারের বেশি। এর মধ্যে জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠনোর লক্ষ্যে মাত্র ১০ রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেট গড়ে তোলে। জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে এ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গত দেড় বছরে মালয়েশিয়ায় গেছেন প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মী। তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে এ সিন্ডিকেট সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের অতিরিক্ত গড়ে ৩ লাখ টাকা আদায় করেছে। এ হিসাবে গত দেড় বছরে এ সিন্ডিকেট মালয়েশিয়াগামী কর্মীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এসব জানার পরও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে এ সিন্ডিকেটের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে ১ সেপ্টেম্বর থেকে জিটুজি পদ্ধতিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নেয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়ার মাহাথিরের নতুন সরকার। মূলত জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত ছিল মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ে গড়া একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বাংলাদেশ অংশে কাজ করেছে এ ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট। জানা গেছে, গত ৭ বছর ধরে বন্ধ থাকা আরব আমিরাতের শ্রমবাজারটি খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হলে, সেখানেও নতুন সিন্ডিকেট করার চেষ্টা হয়। এদিকে সিন্ডিকেট ও কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির দৌরাত্ব্যের কারণে অভিবাসন ব্যয় কমানো যাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতির বড় অংশই প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্সনির্ভর হলেও তাদের অত্যাধিক অভিবাসন ব্যয় কমাতে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগও কোনো কাজে আসেনি। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও ˆবদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় গত এক যুগ ধরে বহু চেষ্টা ও নিয়ম-কানুন করেও ব্যর্থ হয়েছে। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সি অতিরিক্ত অভিবাসন ফি নিচ্ছে সে ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে জনশক্তি রফতানি খাত। বিদেশগামী কর্মীদের কাছ থেকে বছরের পর বছর তিন থেকে পাঁচগুণ অভিবাসন ফি নেয়া হলেও যেন দেখার কেউ নেই। এ ব্যাপারে কোনো নীতিমালাই কাজে আসছে না। অন্যদিকে বিদেশগামী কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় বাড়লেও বিদেশে বেতন সেভাবে বাড়েনি। ফলে অতিরিক্ত অভিবাসন খরচের চাহিদা মেটাতে বিদেশগামী কর্মীরা হিমশিম খাচ্ছে। এরপরও সোনার হরিণের পেছনে ছুটতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। সহায়-সম্বল বিক্রি করে বিদেশ গিয়ে খরচই তুলতে পারছে না তারা। বিদেশে কর্মস্থানের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত খরচ নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে এই খাতে আরো সমস্যার সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশিøষ্টরা। তাদের মতে, ১৯৭৯-৮১ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকরা বেতন পেতেন ১৫০০ রিয়াল, এখন পান ৮০০ রিয়াল। আগে সৌদি আরবে যেতে একজন শ্রমিকের ১ লাখের কম টাকা খরচ পড়লেও এখন ৪ থেকে থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ হয়। বিদেশে ২ বছরের চুক্তিতে গিয়ে টাকা তুলতে না পেরে অতিরিক্ত সময় থাকার জন্য অবৈধ হয়ে যায় কর্মীরা। এরপর সেখানে প্রবাসী কর্মীদের আয়ের বেশিরভাগ অংশ উৎকোচ হিসেবে স্থানীয় পুলিশ ও এক ধরনের দালালদের হাতে তুলে দিতে হয়।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় জনশক্তি রফতানিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিভিনś দেশে অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন দেয়। তাতে বিদেশে কর্মী পাঠাতে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সার্ভিস চার্জ, বিমান ভাড়া, পাসপোর্ট, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা ফি ও অন্যান্য খরচসহ অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। প্রজ্ঞাপনের শর্তাবলিতে বলা হয়, কর্মীর কাছ থেকে সার্ভিস চার্জসহ সব অর্থই চেক বা ব্যাংক ড্রাফট বা পে অর্ডারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির অফিসিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করতে হবে এবং চেক ব্যাংক ড্রাফট গ্রহণের সময় কর্মীকে প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া বহির্গমন ছাড়পত্র গ্রহণের সময় ওই অর্থ গ্রহণের বিবরণ ও প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে দাখিল করতে হবে।
উল্লেখ্য, গত এক যুগ ধরে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ ধরনের চিঠি একাধিকবার ইস্যু করা হয়েছে। অভিবাসন ব্যয় কমানো নিয়ে বিভিন্ন সময় রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সঙ্গে ˆবঠকও করা হয়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চিঠি ইস্যু করা পর্যন্তই দায়িত্ব শেষ। ফলে এই সেক্টরে অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন যে ˆনরাজ্য চলছে তার রাশ টেনে ধরার কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এতে ভুক্তভোগী হচ্ছে বিদেশগামী গ্রামের সাধারণ মানুষ।