পিরিয়ড একটি নোংরা রক্তের নাম

19

আয়শান বড়ুয়া আব্রাহিমানিয়াঃ সময়টা ছিল এইচএসসিতে পড়ার সময়। তখন সবে শরীরে কলেজ লাইফ এর ছোঁয়া লেগেছে। তো, আমি কোচিং করতাম শুরুর দিক থেকেই। ছেলে মেয়ে একসাথেই ক্লাস হতো। কোচিং এর একজন স্যার ছিলেন, যার কথাগুলা আমাকে খুব অনুপ্রেরণা দিতো। স্যারের ক্লাস করার জন্যই প্রতিদিন কোচিং এ যেতাম। নইলে খুব একটা ক্লাস করতে ইচ্ছা করত না। ভীষণ ফাঁকিবাজ ছিলাম এবং এখনও আছি। একদিন খেয়াল করলাম, ক্লাসে একটা মেয়ে একটু পর পর ওয়াশরুমে যাচ্ছে। তো আমার সেই পছন্দের স্যারই ক্লাস নিচ্ছিলেন। স্যার হঠাৎ করে মেয়েটিকে বলে উঠলেন, রক্তের আর সময় নাই।

আর নিজের ডেট নিজে মনে রাখতে পার না? নাকি এইটাও বয়ফ্রেন্ড এর দায়িত্ব? কথা শুনে ক্লাসের অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে হেসে উঠল। আর মেয়েটিকে নিয়ে গবেষণা শুরু করল । স্যারও তাদের সঙ্গে সেই বিকৃত খেলায় মেতে উঠলেন। স্যার বললেন, দেখতো বেঞ্চে কিছু লেগে আছে কিনা। মেয়েটি মাথা নত করেই দাঁড়িয়ে ছিল। আমার তখন অসহ্য লাগছিল। ক্লাসটাকে মনে হচ্ছিল নরক। আমি মেয়েটাকে ইশারা দিয়ে বের হতে বললাম। আর আরেকটা মেয়েকে বললাম, ওর সঙ্গে যেতে। নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছিল। মনে মনে ভাবছিলাম, যে মানুষটাকে আমি এত শ্রদ্ধা করি, তিনি কীভাবে এরকম করতে পারলেন! তিনি কীভাবে এত নিচুঁ মনের একজন মানুষ হতে পারেন? আমি হঠাৎ দাঁড়িয়ে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যাবো এমন সময় পেছন থেকে এক ফ্রেন্ড বলল, দোস্ত তোরও কি রক্ত বের হয় নাকিরে ? নাকি ও তোর গার্লফ্রেন্ড? মেজাজটা তখন একদম খারাপ হয়ে গেল।
ঐ স্যার নামক মানুষটার সামনেই আমি ওকে একটা গালি দিলাম। স্যার আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আমাকে ডাকছেন, আমি না শুনার ভান করে বের হয়ে আসলাম ক্লাস থেকে। মেয়েটি তখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কান্না করছিল। আমাকে বলল, এই সময় আমার অনেক কষ্ট হয়, ব্যথা হয়। মেয়েটি হোষ্টেলে থেকে পড়াশুনা করতো। তো, আমি ফার্মাসি থেকে একটি প্যাড এনে দিলাম। সে লজ্জায় নিচ্ছিলো না। আমি বললাম, আমার জন্মও একজন মায়ের গর্ভেই। যে পিরিয়ড নিয়ে সবাই এমন হাসাহাসি করে ঐ বাজে-নোংরা রক্তটার মাধ্যমেই আমাদের জন্ম। এটা মজার ব্যপার না, হাসি-ঠাট্টা বা উপহাসের বিষয় না। আমার এই বিষয়টা সম্পর্কে জ্ঞান হওয়ার পর আমি কখনও হেয় চোখে দেখিনি। সেই স্যার কে আমি আর কখনও সম্মান করতে পারিনি। তবে সেদিন আমার স্যারের থেকেও বেশি রাগ হওয়েছিলো, ক্লাসের কিছু মেয়ের ওপর। কারণ, ওরাও হাসাহাসি করছিলো। বলা হয়, সব সময় পিরিয়ড নিয়ে শুধু ছেলেরা মজা করে, বাজে মন্তব্য করে। কিন্তু সেদিন দেখলাম, শুধু ছেলেরা নয় মেয়েরাও একজন আরেকজনকে হেনস্তা করেছিলো। হ্যাঁ, আমিও অনেক খারাপ কাজ করি। আমিও ভালো ছেলে না। কিন্তু যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমার জন্ম,আমার মা আমাকে জন্ম দেওয়ার জন্য এতদিন কষ্ট করেছে। সেটাকে তো আমি অসম্মান করতে পারি না। তাহলে নিজের জন্মকে অসম্মান করা হবে। আজকে কথাগুলা বলার কারণ, বাসার নিচে একটি মেয়েকে দেখলাম, প্যাড কিনে নিয়ে যাচ্ছে আর কিছু ছেলে মন্তব্য করছে আর হাসাহাসি করছে। তাই যারা এটিকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে, তাদের উদ্দেশ্য করে বলি, এইটা লজ্জার কিছু না। এই জিনিস না হলে আমার আপনার মত কুলাঙ্গারের জন্ম হত না। আর জন্ম না হলে আমরা এইটা নিয়ে এত মজা করতাম কিভাবে?-আমাদের সময়.কম