জয় এল বিশ্বনাথের হাত ছুঁয়ে তপুর মাথায় চড়ে

3

যুগবার্তা ডেস্কঃ জার্সিটা কোথায় গেলো?
তপু বর্মণ দৌড়াচ্ছেন। গায়ে জার্সি নেই। থাকার কথাও না। তিনি যে তখন সাধারণ কেউ নন, বাংলাদেশের ‘মুক্তি দাতা।’

মাথা ছুঁয়ে বলটা জালে জড়ানোর পড়ে সেই যে জার্সিটা ছুড়ে মেরে সতীর্থদের ভিড়ে হারিয়ে গেলেন, সে ভিড় থেকে তপু ফিরে আসতে পেরেছেন, এ-ই তো বেশি। সেখানে আবার জার্সি! ভাগ্যিস মাঠে তাঁকে ছায়া দিয়ে রাখা আরেক সেন্টারব্যাক টুটুল হোসেন বাদশা জার্সিটা এনে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। না হলে পুনরায় খেলাই শুরু হয় না!

ততক্ষণে বাংলাদেশের সেন্টারব্যাকের নামের পাশে যোগ হয়েছে হলুদ কার্ড। তপুর তাতে কীই যা যায় আসে! নামের পাশে গোল এসেছে, আর তাঁর একমাত্র গোলেই জয় নিয়ে প্রায় নয় বছর পর সাফে বাংলাদেশ চলে গেল আরেকটি সেমিফাইনালের খুব কাছে। এটাই এ ম্যাচের শেষ কথা, তপুর হলুদ কার্ড নয়।

ইতিহাস পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের নায়ক হিসেবে তপুকেই স্মরণ করবে। তবে তপুর মাথায় বল এল যার হাত থেকে, তাঁর কথা না বললেই নয়—রাইটব্যাক বিশ্বনাথ ঘোষ।

লম্বা থ্রো নেওয়ার জন্য ইতমধ্যেই বাড়তি নজর কেড়ে নিয়েছেন ছেলেটি। প্রতিটা থ্রো নেওয়ার আগে তোয়ালে দিয়ে এমন আলতো করে বলটি মুছে নেন, যেন বল নয়, সাইড লাইন থেকে সতীর্থদের উদ্দেশে ‘ভালোবাসা’ ছুড়ে মারতে যাচ্ছেন। এমনই এক ভালোবাসা জড়ানো থ্রোতে জটলা থেকে দূরের পোস্টে মাথা ছুঁয়ে বল জালে জড়িয়েছেন তপু।

বল জালে জড়ানোর আগ পর্যন্ত বিশ্বনাথের কতটা অবদান ম্যাচ শেষে তা নিজেই জানিয়েছেন গোলদাতা তপু, ‘আমাদের পরিকল্পনাটাই ছিল এমন । বিশ্বনাথ লম্বা থ্রো করবে। সে বলে বাদশা “ফ্লিক” নেবে। আর আমি পেছন থেকে “কানেক্ট” করার চেষ্টা করব।’ বোঝাই যাচ্ছে গোলের এই চিত্রনাট্যে বিশ্বনাথের চরিত্র কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তপু শুধু বিশ্বনাথ আর গোলটি ছাড়া নিজের কথা কিছুই বলেননি। পাকিস্তানের বিপক্ষে পুরো ম্যাচে পারফরমেন্সের বিচারেই তপু উজ্জ্বল। সুন্দর ফুটবল বলতে যা বোঝায়, তা বাংলাদেশ খেলতে পারেনি। কিন্তু আক্রমণই যে শুধু সুন্দর ফুটবলের সংজ্ঞা, তা কে বলেছে?

পাকিস্তানের লম্বা এরিয়াল থ্রু বিপদমুক্ত করতে তপুকে কতবার প্রায় দেড় ফুট উঁচুতে উঠে হেড করতে হয়েছে! প্রায় ছয় ফুট উচ্চতা ও শারীরিকভাবে শক্তিশালি স্ট্রাইকার মুহাম্মদ আলির পা থেকে কতবার বল কেড়ে নিয়েছেন, ‘ডার্টি ওয়ার্ক’-এর আড়ালে সে সৌন্দর্যগুলোও চোখ এড়ায় কীভাবে! দু’পায়ে সব নিখুঁত ট্যাকল, সঙ্গে দুর্দান্ত কভারিং। আর দু’প্রান্ত থেকে ভয় ধরানো সব ক্রস যখন ভেসে এসেছে বক্সে, তখন চোখে পড়েছে তাঁর দূরদর্শিতা। সঙ্গে লড়াকু মনোভাব এবং প্রচণ্ড সাহস তো ছিলই। ডিফেন্ডারদের খেলার মধ্যেও যে একটু সৌন্দর্য থাকে তা তপুর প্রতিটা ট্যাকল ও ইন্টারসেপশনে ফুটে উঠেছে।

নারায়ণগঞ্জের ছেলেটির খেলায় এগুলোই সম্পদ। এসব পুঁজি করেই আজ পুরো নব্বই মিনিট নির্বিষ রাখলেন পাকিস্তানের লম্বা লম্বা ফরোয়ার্ডদের।

মনে আছে, বাংলাদেশের সাবেক মেসিডোনিয়ান কোচ নিকোলা ইলিয়েভস্কির কথা। ২০১১ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন এই কোচ বলেছিলেন, বাংলাদেশের এক ফুটবলার ইউরোপে খেলার যোগ্যতা রাখে। ইলিয়েভিস্কির অধীনে যুব দলে খেলা তপু-ই সেই যোগ্যতাসম্পন্ন খেলোয়াড়।

কুঁড়ি থেকে তপু এখন ফুটন্ত ফুল। ২০১৪ সালে দেশের মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচে অভিষিক্ত এই ডিফেন্ডার আগের ম্যাচে ভুটানের বিপক্ষেও পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন। আর আজ এমন সময়ে গোল করে দলকে উদ্ধার করলেন যখন ম্যাচের আয়ু আছে মাত্র কয়েক মিনিট। গোলের মাহাত্ম্য যাতে আরও বেড়েছে।

গোলের পর দর্শকদের উচ্ছ্বাস দেখে মনে হচ্ছিল পুরো বাংলাদেশই নেমে এসেছে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। রাতে তাঁরা বাড়ির পথ ধরেছেন রোমাঞ্চকর এক জয়ের অনুভূতি নিয়ে।

তপু সেই রোমাঞ্চের নায়ক হয়েই থাকবেন।-প্রথমআলো