১৬ লাখ লাইসেন্সবিহীন চালক ৫ লাখ ফিটনেসহীন গাড়ি

10

যুগবার্তা ডেস্কঃ নিরাপদ সড়কের জন্য তথা সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা আনতে কঠোর আইন করার দাবি জোরালো হচ্ছে। সাত বছর ঝুলে থাকার পর প্রস্তাবিত পরিবহন আইনের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজ সোমবার মন্ত্রিসভায় উঠছে বলে জানা গেছে।

৭৮ বছরের পুরনো আইনের ভিত্তিতে তৈরি বিদ্যমান মোটরযান অধ্যাদেশের চেয়ে নতুন আইনের খসড়ায় লাইসেন্স ও ফিটনেসসংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধের সাজা বেশি রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে গত বছর মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদিত খসড়ায় সড়কে বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু ঘটালে তার শাস্তি তিন বছর রাখার প্রস্তাব ছিল। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা যায়, ওই প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো পরিবর্তন এখনো হয়নি।
কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শাস্তি হয় দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারা অনুযায়ী। ওই ধারায় বলা আছে, যদি কোনো ব্যক্তি রাস্তায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, তবে তার তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা দুই-ই হবে।

একসময় এ সাজার মেয়াদ ছিল সাত বছর। পরে তা সংশোধন করে তিন বছর করা হয়। ২০১৪ সালে হাইকোর্টের এক রায়ে ওই সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে সাজা তিন বছর থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়।

আইনজ্ঞরা বলেছেন, এই ধারার অপরাধ জামিনযোগ্য। ফলে একজন গাড়িচালক ঠিকই জানে যে তাকে এ আইনের আওতায় আটকে রাখা যায় না।

জানা যায়, নতুন আইনের খসড়ায় বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটানোর শাস্তি কম রাখার প্রস্তাব থাকলেও অপরাধের সাজা বেশি থাকায় ধর্মঘটসহ বিভিন্ন কর্মসূচি ও চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সেটি ধামাচাপা দিয়ে রাখার চেষ্টা করে আসছিল পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। শিক্ষার্থীদের চলমান আন্দোলনের মুখে আইনটি চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেওয়ায় আবার অঘোষিত ধর্মঘট পালন করছে তারা।

দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট বিধান সংশোধন করে শাস্তির পরিমাণ বাড়িয়ে তা কার্যকর করা এবং ক্ষতিপূরণ দিতে চালক-মালিকদের প্রতি আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা গেলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মনে করেন আইনজ্ঞ ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে জড়িত বিশিষ্টজনরা।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক গত এপ্রিলে বলেছিলেন, ‘এখন সড়কে যা তা অবস্থা। সড়কে আইনের কোনো প্রয়োগ আছে বলে মনে হয় না। আবার যুগোপযোগী আইনও নেই। যুগোপযোগী আইন করতে হবে, সেই আইনের যথাযথ প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সড়কে যে পরিমাণ গাড়ি চলাচল করে, তার বেশির ভাগ চালকের লাইসেন্স নেই। নেই কোনো অভিজ্ঞতা। ফলে যেখানে-সেখানে দুর্ঘটনা ঘটছে। ’

হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি ও বিশিষ্ট আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গতকাল বলেন, ‘বেপরোয়া গাড়ি চালনা করে সড়কে কোনো মানুষকে হত্যার শাস্তি তিন বছর রাখার প্রস্তাব প্রত্যাশিত নয়। ১৯৮৫ সাল থেকেই তো এ শাস্তি আছে। আদালত এ জন্য একটি রায়ে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন। এটা বহাল আছে। কাজেই এ অপরাধের শাস্তি সাত বছরের কম হওয়া সমীচীন নয়। আদালত আরো একটি মামলার রায়ে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, নতুন কোনো আইনে যেন বেশি শাস্তির বিধান রাখা হয়। আমি মনে করি, বেপরোয়া গাড়ি চালনায় মৃত্যুর শাস্তি তিন বছরের জেল হলে তা প্রত্যাশা পূরণ করবে না। বেপরোয়া গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হলে শাস্তি বাড়ানো উচিত, এটা মানুষও চায়। চালকদের লাইসেন্স না থাকলে যে বিধান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা আধুনিক ব্যবস্থা। এটা ভালো দিক। ’

আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এর আগে এপ্রিল মাসে বলেছিলেন, আইনে দোষী ব্যক্তির সাজার পরিমাণ কম থাকায় চালকরা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায়। ফলে দিন দিন সড়ক দুর্ঘটনার হার বেড়ে যাচ্ছে। তিনি আরো বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় দোষী প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন ১০ বছর সাজার বিধান আছে। অনেক দেশে এ সাজার পরিমাণ আরো বেশি। ২০১৪ সালে হাইকোর্টের আদেশের ফলে সাজার পরিমাণ এখন সর্বোচ্চ সাত বছর হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে এ সাজা আদৌ কার্যকর হচ্ছে কি না, তা নিয়ে কোনো ভালো খবর নেই। সাত বছর সাজা যে খুব একটা বেশি, তা নয়।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন গতকাল বলেন, ‘বেপরোয়া গাড়ি চালানোয় মানুষের মৃত্যু হলে শাস্তি ১০ বছর হতে পারে। আদালত এ যাবৎ মামলার রায়ে সাত বছরের সাজা দিয়েছেন। প্রস্তাবিত আইনে এটা বাড়ানো দরকার। সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনালে বিচার নিশ্চিত করতে হবে, ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। যাত্রীদের অভিযোগ থাকার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আইন থাকলেই হবে না, অংশীজনদের নিয়ে ও সমাজের মানুষদের নিয়ে আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। ’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক গত এপ্রিলে বলেছিলেন, ‘দণ্ডবিধিতে সড়ক দুর্ঘটনার দায়ে চালককে যে পরিমাণ শাস্তির বিধান দেওয়া আছে, সেটি কোনোভাবেই উপযুক্ত বলে মনে হয় না। এটি বেশ পুরনো আইন। প্রায় ১৫০ বছর আগের বিধান এটি। ’ তিনি বলেন, ‘দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় চালকের অবহেলার কারণে দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে তাকে তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। হাইকোর্টের আদেশের ফলে সাত বছর পর্যন্ত এ সাজা দিতে পারেন আদালত। আবার চালক ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হত্যা করলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রযোজ্য। কিন্তু আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মামলায় সাধারণত ৩০৪ (খ)-এর প্রয়োগটাই বেশি। ৩০২ ধারা আনলেও তা কোনোভাবেই প্রমাণ করা সম্ভব হয় না। এসব মামলায় বছরের পর বছর বিচার চলে। সাক্ষী আদালতে আসে না, মামলার তদন্তে বিলম্বসহ নানা কারণে বিচার শেষ করতে দেরি হয়। ফলে অনেক দেরিতে মামলার বিচারকাজ শেষ হয়। বিচারে দোষীকে সঠিকভাবে প্রমাণিত না করতে পারায় খালাস পায় বা অনুল্লেখযোগ্য শাস্তি হয়। ’

শাহদীন মালিক আরো বলেন, ৩০৪ (খ) ধারায় যে শাস্তি তা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এটি বাড়ানো উচিত। এ শাস্তি যাবজ্জীবন করা উচিত। এসব ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। আবার শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই হবে না। আইন প্রয়োগের আগে চালক ও পরিবহন মালিকদের প্রতি সরকারের কিছু দায়িত্ব আছে। সেগুলোও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।

জানা যায়, নতুন আইনের প্রথম খসড়াটি প্রণয়ন করা হয়েছিল ২০১১ সালে। তাতে সড়ক দুর্ঘটনা অপরাধের জন্য অপরাধীর শাস্তি ১০ বছর রাখার প্রস্তাব করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। একপর্যায়ে তা সাত বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়। গত বছর মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়ায় এ শাস্তি তিন বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত স্পর্শকাতর এই অপরাধের শাস্তি কী রাখা হচ্ছে, সে নিয়ে বিশেষজ্ঞরাও উদ্বিগ্ন। কারণ মন্ত্রিসভার বৈঠকে এবং পরে সংসদে আইনের বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত হবে।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) সাবেক নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম সালেহউদ্দিন বলেন, ‘প্রথম খসড়ায় দণ্ড ও বিভিন্ন শাস্তি যা প্রস্তাব করা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত তা আরো কমানো হয়। এর পেছনে আছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকের চাপ। আমরা মনে করি, সড়কে দুর্ঘটনায় হত্যা হলে প্রাণদণ্ডের বিধান রাখা উচিত। ফিটনেস না থাকলে মালিক যেন ১০ বছরের জন্য গাড়ি রাস্তায় বের না করতে পারে, তা নতুন আইনে থাকা উচিত। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে পয়েন্ট কাটার বিষয়টি রেখে তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ’

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান, অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনের খসড়ায় চিহ্নিত ঘাটতি ও দুর্বলতা আছে। আমি বলব, এটি আনাড়িভাবে তৈরি করা হয়েছে। খসড়া আইনে কিছু টেকনিক্যাল টার্ম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। যেমন ধারা ৪৪-এ মহাসড়কের ও ধারা ২৬(৫) এ রংচটা, বিবর্ণ, জরাজীর্ণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ইত্যাদির আইনগত ব্যাখ্যা দেওয়া জরুরি। সরকার ও যাত্রীসাধারণের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠনের বিষয়টি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। ’

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘আমরা কঠোর আইন চাই, যাতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় বের না হয়। এ অপরাধ ধরা পড়লে গাড়ি যেন নির্দিষ্ট সময় রাস্তায় বের না করা হয়। ’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘সড়ক খাতে বিশৃঙ্খলার কারণ এখানে মালিক ও শ্রমিক নেতাদের প্রাধাণ্য দেয় সরকার। কিন্তু কোনো যাত্রী প্রতিনিধি রাখা হয় না। আমি বলব, যাত্রী ছাউনি, ওভারপাস, আন্ডারপাস, জেব্রাক্রসিং, বাসস্টপেজ, ফুটপাত, বাস টার্মিনালের স্থান নির্ধারণ, স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ কমিটিতে যাত্রী প্রতিনিধি রাখা উচিত। ’

প্রসঙ্গত, দেশে গত জুন মাস পর্যন্ত বিআরটিএতে নিবন্ধিত গাড়ির মধ্যে প্রায় ১৬ লাখ গাড়ি চলছে লাইসেন্সবিহীন চালক দিয়ে। এ ছাড়া সারা দেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে প্রায় পাঁচ লাখ।-কালেরকন্ঠ