আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ই কেন টার্গেট

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ গুজব ছড়িয়ে শনিবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছিল। শিক্ষার্থীদের নাম করে বেশ কিছু বহিরাগতও অংশ নিয়েছিল এই হামলায়। সেখানে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। গতকাল রবিবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিল জিগাতলা মোড় পর্যন্ত যাওয়ার অনুমতি দেয় পুলিশ। কিন্তু শিক্ষার্থীদের একাংশ যখন আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের দিকেই যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে তখনই বাঁধে বিপত্তি। পুলিশ ব্যারিকেড দিলে তারা ব্যারিকেড ভেঙে অগ্রসর হতে উদ্যত ঠিক তখনই দু’পক্ষে সংঘর্ষ বেঁধে যায়। এ সময় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বেশ কিছু কর্মী ছাত্রদের ধাওয়া করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীতে সব জায়গায়ই শিক্ষার্থীরা মিছিল সমাবেশ করছে। সরকারের তরফ থেকে তাদের সহযোগিতাই করা হচ্ছে। কোথাও পুলিশ তাদের উপর চড়াও হয়নি। ছাত্রলীগ নেতারাও চকলেট দিয়ে শাহবাগে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। তাহলে কেন আওয়ামী লীগ অফিস তাদের টার্গেট হবে? প্রধানমন্ত্রী তো শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন। কিছু দাবি ইতিমধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। বাকীগুলোও পর্যায়ক্রমে করা হচ্ছে। তাহলে নিশ্চয় এর পেছনে কোন অসৎ উদ্দেশ্য আছে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল গণভবনে বলেছেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিতে ‘তৃতীয় পক্ষ’ নেমেছে। তাই আন্দোলনরতদের এখন ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।

শনিবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুজব ছড়ানো হয় আওয়ামী লীগ অফিসে কয়েকজনকে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি ধর্ষণ ও মৃত্যুর গুজবও ছড়ানো হয়। এরপর আওয়ামী লীগ নেতারা শিক্ষার্থীদের পার্টি অফিসে নিয়ে যান। সেখানে পুরো অফিস তাদের ঘুরিয়ে দেখানো হয়। পরে তারা সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন, আসলে সেখানে কিছুই হয়নি। গুজব ছড়িয়ে তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, তাহলে গতকালও কেন মিছিল নিয়ে ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কার্যালয়ের দিকে যেতে হলো? রাজধানীতে কি মিছিল বা সমাবেশ করার আর কোন জায়গা নেই? এই অফিসই কেন টার্গেট?

শিক্ষার্থীরা বলছে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে শনিবার ছাত্রলীগ-যুবলীগের মারাত্মক হামলার প্রতিবাদে গতকাল দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করে জিগাতলা এলাকায় গেলে তাদের ওপর আবারও একই ধরনের হামলা করা হয়। এসময় সন্ত্রাসীদের হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত চার শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়াও সন্ত্রাসীদের লাঠিসোটার আঘাতে আরও অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে আন্দোলনরতরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতা-কর্মী। এ ঘটনার তথ্য সংগ্রহের সময় দুর্বৃত্তদের হাতে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও মারধরের শিকার হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল সকাল ১১টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, বারডেমসহ বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর শাহবাগ এলাকায় জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। ফলে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের আন্দোলন হঠাৎই তীব্র গতি পায়। শিক্ষার্থীরা শাহবাগ এলাকা থেকে বিক্ষোভ করতে করতে সায়েন্স ল্যাবরেটরি হয়ে জিগাতলা এলাকার দিকে রওনা দেয়। আগের দিন জিগাতলা ও ধানমণ্ডি এলাকায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটায় ওই এলাকায় আগে থেকেই সতর্ক অবস্থান নেয় পুলিশ। এর মধ্যে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে পিলখানা পার হয়ে জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলে পুলিশ তাদের সেখান থেকে ঘুরে চলে যেতে বলে। কিন্তু, তারা পুলিশের অনুরোধ উপেক্ষা করে ধানমণ্ডি ৩/এ সড়কে অবস্থিত আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দিলে শিক্ষার্থীদের একাংশ সেখান থেকে ঘুরে সায়েন্স ল্যাবরেটরির পথ ধরে। কিন্তু, অপর অংশ সেখানেই অবস্থান করে আওয়ামী লীগ অফিসের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে হঠাৎই ধানমণ্ডি লেকের দিক থেকে একদল মানুষ লাঠিসোটা, রামদা, কিরিচ ইত্যাদি নিয়ে এসে তাদের ওপর চড়াও হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মী। সংঘর্ষ চলাকালে বহু শিক্ষার্থী ধানমণ্ডি লেকের মধ্যে পড়ে যান। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এই সুযোগে দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলে পড়ে। তাদের হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থী মারধরের শিকার ও অন্তত চার শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তারা আরও অভিযোগ করেন, হামলাকারীদের অনেকেই হেলমেট পরে তাদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

আহতদের মধ্যে অন্তত তিনজনের মাথায় জখম হয়েছে বলে ঢাকা মেডিকেল সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও একজনের গাল ধারালো অস্ত্রের আঘাতে কেটে গেছে। রক্তক্ষরণ ঠেকাতে ও প্রাথমিক চিকিত্সার জন্য তাত্ক্ষণিক তাদের পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলে জানিয়েছে। এদের একজনের পরিচয় জানা গেছে। তার নাম মাহমুদুর রহমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র।

এদিকে, ঘটনাস্থল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চলে যাওয়ার পর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মোটরসাইকেল বহর নিয়ে সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকায় মহড়া দিতে দেখা গেছে। অন্যদিকে, পিলখানা-জিগাতলা এলাকায় বিজিবি প্রহরা দেওয়া শুরু করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) সূত্রে জানা গেছে, আহত ৮ শিক্ষার্থী সেখানে ভর্তি হয়েছেন। তারা হলেন ঢাবির শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান (২১), সুসমিতা রয়েল লিসা (২৩), তুষার (২৪), মারুফ (২৫) ও শিমন্তী (২৬), বুয়েটের রাকিন (২৩) আইইউবি’র ছাত্র এনামুল হক (২৪) ও তামিম (২৩)।

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার মারুফ হোসেন সরদারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘কারা হামলা চালিয়েছে তা আমরা জানি না। আমাদের কাছে কোনও অভিযোগ আসেনি।’

সাংবাদিকদের মারধর: নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় গতকাল সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগকর্মীরা হামলা চালিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন আহত সংবাদকর্মী ও শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, এ সময় সাংবাদিকদের বেধড়ক পেটানো হয়েছে, ক্যামেরা ছিনিয়ে নিয়ে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। হামলায় অন্তত ৫ সাংবাদিক ও ফটোগ্রাফার গুরুতর আহত হয়েছেন। এরা হলেন এপি’র এম এ আহাদ, দৈনিক বনিক বার্তার পলাশ শিকদার, নিউজ পোর্টাল বিডিমর্নিং-এর আবু সুফিয়ান জুয়েল, দৈনিক জনকণ্ঠের জাওয়াদ ও দৈনিক প্রথম আলোর ফটোগ্রাফার সাজিদ হোসেন ও প্রতিবেদক আহম্মেদ দীপ্ত। এছাড়া কয়েকজন ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফারের ওপরও হামলা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহতরা হলেন রাহাত করীম, এনামুল হাসান, মারজুক হাসান, হাসান জুবায়ের ও এন কায়ের হাসিন। তারা সবাই পাঠশালার শিক্ষার্থী।

মিরপুর, উত্তরা পরিস্থিতি যেমন ছিল: রাজধানীর মিরপুরের ১, ২, ১০ নম্বর থেকে ভাসানটেক এলাকা পর্যন্ত শাসক দল ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে অবস্থান নেয়। গত সাতদিনে শিক্ষার্থীরা যেসব এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল সেসব এলাকায় তারা কিছুক্ষণ পর পর মহড়া দেয়। বাঙলা কলেজ এবং মিরপুর থানা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের রাজপথে মিছিল করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে দেখা গেছে। বেলা ১১টার দিকে মিরপুর ১০ নম্বর এলাকায় ফায়ারসার্ভিস অফিসের কাছে ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলে ছাত্রলীগ তাদের ধাওয়া দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও মিরপুর ১০ নম্বর ও ২ নম্বর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তবে মিরপুর এলাকায় বিআরটিসি ছাড়া বেসরকারি মালিকদের পরিচালিত গণপরিবহন দেখা যায়নি। উত্তরায়ও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী গতকাল রাস্তায় নেমেছিল। এ সময় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী মোটরসাইকেল নিয়ে সেখানে ঢুকে পড়েন। পরে তারা মোটরসাইকেল ফেলেই সেখান থেকে পালিয়ে যান। শিক্ষার্থীরা তিনটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে।-ইত্তেফাক