ক্রেডিট কার্ড গলার কাঁটা

5

যুগবার্তা ডেস্কঃ নগদ অর্থ বহনের ঝামেলা এড়ানো, কেনাকাটায় একটি নির্দিষ্ট সময়ে সুদবিহীন ঋণ পাওয়াসহ নানান সুবিধার কারণে এক শ্রেণির গ্রাহকদের মাঝে বাড়ছে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার। আর তাই কয়েক বছর ধরে দেশে কেনাকাটায় কার্ডে লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে কয়েকগুণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসেবে বর্তমানে দেশে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সরবরাহ করা কার্ডের সেবার আওতায় রয়েছে প্রায় ১০ লাখ গ্রাহক। তবে নানান সুবিধা বিবেচনা করে গ্রাহকরা ক্রেডিট কার্ড নিলেও অসুবিধা কম নয়। অনেকের কাছে এটি এখন আতঙ্কের বিষয়। বিভিন্ন ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে নানান সুবিধা দিলেও দেশের প্রথম বেসরকারি ব্যাংক ‘ন্যাশনাল ব্যাংক’ এখানে অনেকটা পিছিয়ে। সুদের উচ্চ হার, নামে-বেনামে অদৃশ্য ফি আদায়সহ নানা কারণে ব্যাংকটির গ্রাহকের কাছে এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেডিট কার্ড। বছরের পর বছর তারা প্রতারণার শিকার। দেশের প্রথম ব্যাংক হিসেবে চালু করা ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডেও তাই খুব একটা আগ্রহ নেই গ্রাহকের।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী মাহমুদ ফারুক জানান, বিক্রয় প্রতিনিধিদের মিষ্টভাষার ফাঁদে পড়ে ক্রেডিট কার্ড নিলেও অন্যান্য ব্যাংকের মতো সুযোগ-সুবিধা নেই। বিশ্বের বড় বড় বিমানবন্দরেও এই কার্ডের সুযোগ-সুবিধা নেই। অথচ অন্যান্য ব্যাংকের গ্রাহকরা যে কোন বিমানবন্দরে পাচ্ছেন নানান সুবিধা। মোঃ শফিক গাজী নামের আরেক গ্রাহক জানান, অন্যান্য ব্যাংক থেকে বিভিন্ন উৎসবে ক্যাশব্যাকসহ নানা অফার মিললেও ন্যাশনাল ব্যাংকে এই ধরনের কোন সুযোগ নেই। একই সঙ্গে খরচ করার পর অন্যান্য ব্যাংকে ১৮টি কিস্তিতে কোন ধরণের ফি ছাড়া পরিশোধ করতে পারলেও এখানে সে সুযোগ নেই। অথচ কেটে নিচ্ছে নামে-বেনামে অদৃশ্য ফি।

মাহমুদ ফারুক ও শফিক গাজীর মতো একাধিক গ্রাহকেরই অভিযোগ ‘ক্রেডিট কার্ড’ নামীয় ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে আটকে ফেলা হয়েছে তাদেরকে। এভাবে প্রতিটি গ্রাহকেরই গল্প রয়েছে প্রতারিত হওয়ার বিষয়। আর এ কারণে যারাই পারছে, ব্যাংকের টাকা দিয়ে কার্ড জমা দিয়ে দিচ্ছেন। যারা আর নতুন করে কার্ড নিচ্ছেন না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ব্যবস্থাপনা দুর্বলতায় প্রথম ব্যাংক হিসেবে ক্রেডিট কার্ড সেবা চালু করলেও নানা প্রতিবন্ধকতা এবং সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় গ্রাহক ধরে রাখতে পারছেন না তারা। বিশেষ করে স্থানীয় কার্ডের চাহিদা একেবারেই নেই।’ ওই কর্মকর্তা জানান, অন্যান্য ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডে নানা ধরণের ফি নিলেও বিভিন্ন ক্যাম্পেইন (ছাড়) এর মাধ্যমে গ্রাহককে আবার তা ফিরিয়ে দেয়। একই সঙ্গে কার্ড ব্যবহারকারীরা এক বছর ফ্রি সেবা পায়। যা ন্যাশনাল ব্যাংকে নেই। তিনি ক্ষোভের সাথে জানান, সেবার মানসিকতার পরিবর্তে অতি মুনাফার প্রবণতাই ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম।

ন্যাশনাল ব্যাংকের ধানমিন্ডর সীমান্ত স্কয়ারের কার্ড ডিভিশনে গিয়ে একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে ক্রেডিট কার্ড সেবার যাত্রা শুরু হলেও অন্যান্য ব্যাংক থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে ব্যাংকটি। এখন পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৫২ হাজার হলেও অধিকাংশ গ্রাহকই বিপাকে।

কার্ড ডিভিশন থেকে জানা যায়, ব্যাংকটির বিপণন ব্যাবস্থা খুবই দুর্বল। বর্তমানে আলাদা বিক্রয় প্রতিনিধি নেই। মাত্র দু’জন বিক্রয় প্রতিনিধি দিয়েই চলছে ক্রেডিট কার্ড ডিভিশন। অন্যান্য ব্যাংকের মতো চুক্তিভিত্তিক কর্মীও নেই। এমনকি ২০ হাজার টাকার কার্ড অনুমোদন দিতেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পর্যন্ত যেতে হয়। একটি ক্রেডিট কার্ড পেতেও অনেক সময় ব্যয় হয় গ্রাহকের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রতিবেদকে জানান, ‘ভাই ক্রেডিট কার্ড নিয়ে কিছু বলার নেই। গ্রাহকরা আমাদের কার্ড ব্যবহার করে চরম বিরক্ত’।

সূত্র আরও জানায়, ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা পাচ্ছেন না ইএমআই সুবিধা। ইএমআই হলো- গ্রাহক টাকা খরচ করে যাতে কয়েকটা কিস্তিতে আবার তা পরিশোধ করতে পারে। যা কোন কোন ব্যাংকে ১৮টি কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কোন ধরণের চার্জ নেয়া হয় না। অথচ ন্যাশনাল ব্যাংকের এই সুবিধাই নেই। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংক এখন চীফ কার্ড ব্যবহার করে। যা নেই ন্যাশনাল ব্যাংকের। চীফ কার্ডের সুবিধা সম্পর্কে জানা যায়, গ্রাহক ছাড়া অন্য কেউ এই কার্ড ব্যবহার করতে পারবে না। তাই এই ব্যাংকের প্রতি মানুষের আগ্রহ দিন দিন কমছে বলে জানান একাধিক কর্মকর্তা।

সূত্র মতে, দেশের বাইরে বিভিন্ন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ভিআইপি লাউঞ্জে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীরা নানা ধরণের সুযোগ-সুবিধা পান। স্বাভাবিক এই সেবাটিও নেই ন্যাশনাল ব্যাংকের। ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকরা শুধুমাত্র বাংলাদেশে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই সেবা ভোগ করতে পারেন। এমনকি এটা ছাড়া দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরেও এই সেবা দিতে পারেনি ন্যাশনাল ব্যাংক। ব্যাংকের বিক্রয় প্রতিনিধিদের মিষ্টভাষার ফাঁদে পড়ে সঙ্কটে ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রায় ৫২ হাজার গ্রাহক। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের একঘুয়েমিতে দীর্ঘদিন থেকে চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এসব গ্রাহক।

ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলছেন, ব্যাংকের অতি মুনাফার প্রবণতা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদাসীনতা এর জন্য দায়ী। তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের মুনাফা লাভ করার টেন্ডেন্সি একটু কমাতে হবে। আমার মনে হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের খুব গভীরভাবে এবং শক্তহাতে এগুলো ডিল করা উচিৎ।’

সার্বিক বিষয়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) চৌধুরী মোশতাক আহমেদের সাথে একাধিকবার মুঠো ফোনে কল ও এসএমএস দিলেও কোন সাড়া পাওয়া যায়নি।-ইনকিলান