আমজনতার দুঃখকষ্ট কোনকালেই যে যাবার নয়!!!!

14

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ বাৎসরিক হানাবী। শুরু হবে ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায় ঠিক সন্ধ্যে ৭টা ১৫ মিনিটে। আর চলবে টানা সোয়া একঘন্টা। দেখার মত একটা ইভেন্ট। প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় এই হানাবী আয়োজনে। শোনিম বেশ একসাইটেট। দু’দিন আগ থেকেই আমাকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে। এসময়ে অন্য কোথায়ও কোন সিডিউল রাখা যাবে না। ভুলে গেলেও চলবে না। আরো কত কথা! যদিও প্রতিবছরই এই সময়টায় হানাবী দেখে। তারপরও একসাইটেশন ওর থাকেই। কেবল আমার শোনিমের নয়, আমাদেরও থাকে; সব জাপানীজদের থাকে।
জাপানী ভাষায় হানাবী শব্দের অর্থ হলো ফায়ার ওয়ার্কস বা আতশবাজী। এই আতশবাজী বিষয়টি যুগ যুগ ধরেই জাপানী কালচারের একটি অংশ হয়ে আছে এবং অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে অধিকাংশ শহরবাসীর উপস্থিতিতে আড়ম্বরপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর প্রতিটি শহর কতৃপক্ষের উদ্যোগেই হানাবীর আয়োজন হয়। আর একেকটি হানাবীতে ব্যয় হয় লক্ষ লক্ষ টাকা। আয়োজক হিসেবে সকল সিটি কর্পোরেশন কিংবা পৌরসভা অথবা নিদেনপক্ষে ইউনিয়ন পর্যায়ে এই হানাবীর আয়োজন হয়। এভাবে দু’মাস ব্যাপী এই হানাবী চলতে থাকে একের পর এক শহরে এবং দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। বলা যায় গ্রীষ্মের জাপানের জুলাই এবং আগস্ট মাস আতশবাজীর মাস।
এই মাসে টোকিও শহরে ভীষন জমজমাট আতশবাজি হয়। মোট ২৩ টি ওয়ার্ড বা সিটি মিলে টোকিও মেগাসিটি। আর তাই কেবল টোকিওতেই ২৩ টি হানাবী হয়। আমার বসবাস টোকিওর এদোগাওয়া সিটিতে; সিটির নামেই পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীরও নাম এদোগাওয়া নদী। টোকিও শহরে বয়ে যাওয়া অনেকগুলো নদীর একটি। আর এর ঠিক মাঝামাঝি হানাবীর আয়োজন। প্রায় দশ লক্ষাধিক দর্শক এদোগাওয়া নদীর দু’পাড়ে বসে উপভোগ করে বাৎসরিক এই ইভেন্ট। এখান থেকে মহাসমুদ্রের মোহনা বড় জোড় চার কিলোমিটার পরেই। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মহাসাগর। প্রশান্ত মহাসাগর।
সাগরের হালকা মিষ্টি বাতাস লাগছিল গায়ে। মাগরেবের নামাজের পর মিষ্টি বাতাসে হাঁটতে মন্দ লাগে না। বাসা থেকে দশ মিনিটের হাঁটার পথ। পৌঁছার আগেই আকাশ রঙিন করে আতশবাজীর ঝলকানি দেখা গেল। সাথে ধুরুম ধুরুম শব্দ। বুঝলাম শুরু হয়ে গেছে। হবারই কথা। ঘড়িতে ঠিক ৭টা ১৫ মিনিট। আমাদেরই বরং লেট হলো। এদেশে সময়ের ব্যাপারে কোন ছাড় নেই। এক সেকেন্ডও নেই। কেবল এ কাজ নয়, কোন কাজেই জাপানে এক মিনিটও এদিক সেদিক হয় না। শুরুতেও হয় না, আবার শেষেও হয় না। সব যেন ছকে বাঁধা। জাপানে বিয়ের অনুষ্ঠানও ঘড়ি দেখে শুরু, ঘড়ি দেখে শেষ। গেল তেইশ বছরে কোনদিনও এক মিনিট এদিক সেদিক হতে দেখিনি। দুই ঘন্টার বিয়ের অনুষ্ঠান; দুই ঘন্টাতেই শেষ হয়।
আজকের হানাবীও শেষ হলো কাঁটায় কাঁটায় ৮টা ত্রিশ এ। লক্ষ লক্ষ মানুষের সারিবদ্ধ সুশৃঙ্খল লাইন। বেরিয়ে যাচ্ছেন যে যার গন্তব্যে। কোন হুড়াহুড়ি নেই, ধাক্কাধাক্কি নেই। একটু শব্দ নেই, কলরব নেই। এমনকি পদদলিত হয়ে চাপা পড়ার সম্ভাবনাও নেই। আছে শুধু পলিথিন; হাতে হাতে পলিথিনের ব্যাগ। বেলা তিনটে থেকে দলবদ্ধ হয়ে এখানে সময় কাটিয়েছে। খাদ্য এবং পানীয় খেয়েছে। তাই ফেরার সময় পলিথিনে উচ্ছিষ্ট আবর্জনা ভরে নিয়ে ফিরছে যথাস্থানে ফেলার জন্যে।
এরা ময়লা যেখানে সেখানে ফেলে না। বিয়ে বলি আর হানাবী বলি, কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবলের গ্যালারী বলি, কোন পাবলিক অনুষ্ঠান শেষে কোথায়ও একটু ময়লা খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিজেরা দলবেঁধে পরিস্কার করবে। এবারে রাশিয়া বিশ্বকাপে তার নমুনা সারা বিশ্ব দেখেছে। দেখেছে জাতীয় দলের সকল খেলোয়ার এবং কর্মকর্তাগণ কিভাবে ব্যবহৃত সবকিছু ধূয়েমুছে পরিস্কার করে গেছে। এটা এদের পক্ষেই সম্ভব। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা জাপানী জীবনের অন্যতম অঙ্গ। সাময়িক যে কোন জমায়েতের জায়গায় মোবাইল টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে। যারা আয়োজক তারা পর্যাপ্ত পরিমানে ব্যবস্থা করেন। এটা বাধ্যতামূলক। না হলে জমায়েতের অনুমতি বাতিল। আর থাকবে বড় বড় অস্থায়ী ডাস্টবিন। একটাই লক্ষ্য; পরিবেশকে শুদ্ধ রাখা। কোনভাবেই পরিবেশকে দূষিত করা যাবে না।
বিষয়টি আমাদের দেশে কল্পনাও করা যায় না। বিদেশীরা বাংলাদেশে এলে সবার প্রথমেই দেখিয়ে দেয় যত্রতত্র ময়লার স্তুপ। ঢাকায় আমার বাসার পাশের মোড়টার নামও ময়লার মোড়। উত্তরার সবচেয়ে বড় এভিনিউতে কর্পোরেশনের ময়লা ফেলতে ফেলতে নামটা এমনি এমনি হয়ে গেছে। এটা বাংলাদেশেই সম্ভব। কপাল ভাল গু‘য়ের মোড় হয়নি। হলেও কিছু করার ছিল না। ইদানীং একটা নতুন আপদ তৈরী হয়েছে শহরের মসজিদগুলোকে কেন্দ্র করে। জুম্মার দিনে নামাজ শেষে মূহুর্তের মাঝে মসজিদের আশপাশের রাস্তা পাম্পপ্লেট আর হ্যান্ডবিলে ছেয়ে যায়। পূরো রাস্তা কেবল কাগজ আর কাগজ। মসজিদে মুসুল্লী যত বেশী, বাইরে কাগজও তত বেশী।
এক গ্রুপ দাঁড়িয়ে থাকে মসজিদের গেটের সামনে পাম্পপ্লেট নিয়ে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পাম্পপ্লেট। মুসুল্লীরা বের হবার সময়টাতেই হাতে ধরিয়ে দেয়। এসব পাম্পপ্লেট কদাচিৎ কেউ সামান্য পড়ে এবং একটু চোখ বুলিয়েই আস্তে করে হাত থেকে নীচে ফেলে দেয়। ঠিকমত ময়লা আর্বজনা ফেলার কালচার জানি না বলেই আমরা এভাবে ফেলি। এই ময়লাই বাতাসে উড়ে উড়ে আস্তে আস্তে জমা হয় আশেপাশের ড্রেনে। সাথে পলিথিন সহ দুনিয়ার সব ময়লা তো আছেই। এভাবে ড্রেনেজ সিস্টেম এক সময়
ব্লক হয়ে যায়। ফলাফল যা হবার তাই হয়; অল্প বৃষ্টিতে জনসমুদ্রের ঢাকা শহর জলসমুদ্রে পরিণত হয়।
সন্দেহ নেই এসবে সিটি কর্পোরেশনের ব্যর্থতাই মুখ্য। কিন্তু তাদেরকে এসব কথা বলা যাবে না। এসব তো ভাল, কোন কথাই বলা যায় না। বললেই কেমন করে করে যেন ছ্যাৎ করে ওঠে। কিছুদিন আগে কর্পোরেশন আয়োজিত বৃক্ষরোপন উপলক্ষে ছোটখাট একটি জমায়েতে গিয়েছিলাম। পাশে দাঁড়ানো একজন সহজ সরল মানুষের টয়লেট চেপেছে। চেপে রাখতে পারছে না। শেষে আয়োজকের স্টিকার লাগানো একজনকে বললেন, ভাই টয়লেট কোথায় করা যায় বলেন তো! সেই রকম চাপ দিয়েছে। লোকটি তাজ্জব বনে গেল এই কথায়। আর কি করবেন? আমার মুখে করেন! জিপার খুইল্যা ছাইড়া দেন।। এরপর একটু থেমে আবার বললেন, আবাল নাকি আপনে? এইডা একটা বিষয় হইলো? আশেপাশে কত চিপা! দেইখ্যা একটায় খাড়াইয়া পড়বেন!!!
দারুন পরামর্শ! তবে কায়দা করে ধরলে তারা এমন করে না। আবার দোষও এক কথায় স্বীকার করে না। ইনিয়ে বিনিয়ে কৌশলে অন্যের ঘাড়ে চাপাবার চেষ্টা করে। সার্বিক চেষ্টা থাকে দোষটি কোন না কোন ভাবে জনগণের উপর চাপিয়ে দেয়ার। এসবের যুক্তি সব সময় ঠোঁটের কোনে রেডী থাকে। বলে, শহরবাসী খাজনা দেয় না। ভান্ডার খালি; টাকা নেই। টয়লেট বানাবো কেমনে? মূলত ভান্ডার নির্বাচনের আগেও খালি থাকে। কিন্তু কর্পোরেশনের চেয়ারে বসার প্রার্থী হবার লোকের কমতি থাকে না।
চেয়ারে বসার জন্যে সে কী চেষ্টা! যারপরনাই চেষ্টা। কোনমতে বসতে পারলে গাইগুই শুরু। ক্ষমতার দায়িত্ব নিয়েই কাজের দায়িত্ব চাপিয়ে দেয় নাগরিকগণের উপর। তাদেরকে সচেতন হতে বলে। কথাটি অযৌক্তিক নয়। কিন্তু নাগরিকগণকে সচেতন বানাবে কে? দায়িত্ব তো ক্ষমতায় থাকা মানুষদের দিকেই যায়। দু’চারটি সেমিনার করলেই জনগন সচেতন হয়ে যাবে? এটি এত সোজা? এরজন্যে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। সামাজিক শিক্ষাকে প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। গরু ছাগলের রচনা শেখালে কাজ হবে? জীবনের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শেখাতে হবে।
শেখাতে হবে স্বপ্ন দেখা। তবে আমরা জাপানের মত বাৎসরিক আতশবাজীর স্বপ্ন দেখি না; ভুলেও দেখি না, আশাও করি না। কিন্তু জনগনকে সচেতন বানানোর আশাটুকু তো করতে পারি! এমন তো না যে বিষয়টা খুব জটিল কিছু। প্রাইমারী শিক্ষাকালীন সময়েই শিশুদেরকে শেখানোর বিষয়টা শুরু করতে পারি। শিশুদেরকে হাতে কলমে সব শেখাতে পারি। যা শেখার ওরা শিশুকালেই শিখবে। আর এই কাজটি করতে হবে দেশের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছেন তাদের। দায়িত্ব তাদেরকেই নিতে হবে। চিন্তা তাদেরকেই করতে হবে।
অবশ্য চিন্তা করার তাদের এত্ত সময় কোথায়! সময় তো চলে যায় রাজনৈতিক পাড়াপাড়িতেই। নির্বাচনে হারাহারি, ক্ষমতায় বাড়াবাড়ি, ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়ি, আর না পেলে মারামারিতেই সময় যায়। মাস যায়, বছর যায়। এক সময় ক্ষমতার পূরো সময় যায়। কিন্তু আমজনতার দুঃখকষ্ট ভুলেও যায় না। অভাগা এই আমজনতার দুঃখ কিংবা কষ্ট কোনকালেই যে যাবার নয়!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা।