পাঠ্যবইয়ে সরকারের গচ্চা ১৪ কোটি টাকা

8

যুগবার্তা ডেস্কঃ বিতর্কিত তথ্য থাকায় বাতিল করতে হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চারটি বই। আর এতে সরকারের গচ্চা গেছে ১৪ কোটি টাকা। এছাড়া এবছরও বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ে বেশ কিছু ভুল দেখা গেছে। মোটা দাগে ভুলগুলো হলো বানান, মুদ্রণ প্রমাদ, কাটিং, নিম্নমানের ছাপা ও বাক্যগঠন। গত বছর বিনামূল্যে বিতরণ করা বইয়ে বানান ভুলের বিতর্কের পর তা আংশিক সংশোধন করা হলেও ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের জন্য দেয়া জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি)বইয়ে চোখে পড়েছে বানান ভুলের ছড়াছড়ি। ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩ ও ৮৯নং পৃষ্ঠায় নকশিকাঁথার জায়গায় নক্সিকাথা, জসীমউদ্দিনের জায়গায় জসীমউদদিন লেখা আছে। এ ধরনের অগণিত বানান ভুল চোখে পড়ে বইটিতে। এছাড়া একই অবস্থা সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা এবং অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য কনিকা বইয়েও। এ বছর দেয়া বোর্ডের বইগুলোতে দেখা যায় প্রচুর মুদ্রণ প্রমাদ। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইগুলোর সূচিপত্রে গল্প, উপন্যাস এবং কবিতার লেখকদের নামের বানানের ক্ষেত্রে বিষয়টা চোখে পড়ে বেশি। বই কাটিং করতে গিয়ে সপ্তম, অষ্টম, নবম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ জ্ঞান বইয়ের পাতাগুলো এমনভাবে কাটা পড়েছে যে প্রতি পৃষ্ঠায় থাকা প্রতীক ও লেখাও কেটে গেছে। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির সাহিত্য কনিকা বইয়ের ১২নং, সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৩৩নং পৃষ্ঠার নিচের দিকে ঠিক প্রশ্নের অংশ কাটিংয়ের ফলে কাটা পড়েছে। ফলে প্রশ্ন পড়া যায় না। এবছরের বইগুলোর মলাট ঝকঝকে হলেও ছাপা খুবই নি¤śমানের। এর ফলে অনেক বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বর, বর্ণ ও অলĽরণগুলো স্পষ্ট বোঝা যায় না। ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৯১নং ও সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৮১, ৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৩, ৯৬নং পৃষ্ঠার লেখা অন্য পৃষ্ঠা থেকে দেখা যায়। ফলে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার পাঠ অষ্পষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া চিত্রের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। অনেক বইয়েরই ছবি বুঝা যায় না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়তে ও বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে। বাংলা সাহিত্যের এক অহংকার আমাদের পল্লীকবি জসিমউদ্দিন। তিনি তার কর্মজীবন ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী হিসেবে শুরু করেন। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে তার কর্মজীবন শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার মাধ্যমে। এই ভুল তথ্যটি চোখে পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩নং পৃষ্ঠার কবি পরিচিতিতে। বানান, মুদ্রণ প্রমাদসহ অনেক ধরনের ভুলের পাশাপাশি এ বছরের পাঠ্যবইয়ে লক্ষ্য করা যায় অগণিত ভুল বাক্যগঠন, দাড়ি, কমা আর সেমিকোলন ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ষষ্ঠ শ্রেণির চারুপাঠ বইয়ের ৭৩নং পৃষ্ঠায় পল্লীকবি জসীম উদ্দীনের কবি পরিচিতিতে, সপ্তম শ্রেণির সপ্তবর্ণা বইয়ের ৮১, ৮৯, ৯৪নং পৃষ্ঠা ও অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৩৯ ও ৪৩নং পৃষ্ঠায় একটু ভালোভাবে চোখ বুলালেই এই ভুলগুলো চোখে পড়বে যে কারো।
এবছর বিতর্কিত তথ্য থাকায় মাদ্রাসা বোর্ডের চারটি বই বাতিল করা হয়েছে। এই বইগুলো হলো ২০১৮ সালের জন্য ছাপানো সপ্তম শ্রেণির আল আকায়েদ ওয়াল ফিক্হ, অষ্টম শ্রেণির আল আকায়েদ ওয়াল ফিক্হ নবম ও দশম শ্রেণির কুরআন মাজিদ ও তাজবিদ ও হাদিস শরিফ। বাতিলের পর বইগুলো সংশোধন করে পাঠানো হচ্ছে সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোয়। এই চারটি বই বাতিল, সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণের ফলে সরকারের মোট ১৪ কোটি টাকা গচ্চা গেছে। এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বরে মাদ্রাসার সব বই জেলা-উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল। এরমধ্যে এই চার শ্রেণির চার বিষয়ের মোট বই সংখ্যা ২৩ লাখ ৮৯ হাজার ৭৭৬ কপি। যার সবই পৌঁছে গিয়েছিল জেলা-উপজেলা পর্যায়ে। পরে বই চারটিতে ইসলামের অবমাননাসহ ব্যাঙ্গাত্মক তথ্য রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন সংশ্লিষ্টরা। এরপর নভেম্বরের মাঝামাঝি সময় জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের মেইল করে বইগুলো ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ফেরত পাওয়ার পর বইগুলো পুনর্মুদ্রণ করে পাঠানো হয় মাদ্রাসাগুলোতে। এর আগে একই শিক্ষাবর্ষের মাদ্রাসার ৮টি পাঠ্যবইয়ে জঙ্গিবাদে উসকানি এবং নারী নেতৃত্ববিরোধী তথ্য খুঁজে পেয়েছিল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষণা বিভাগ। এই বিষয়গুলো বাদ দিয়ে বই ছাপার কথা থাকলেও তা না করে বিতর্কিত বিষয় সংবলিত বই ছেপে পাঠানো হয়, পরে ওই ৮টি পাঠ্যবই বাতিল করা হয় ও নতুন ছাপার ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ থেকে স্পষ্ট হয় কী মানের এবং চিন্তার লোকজন মাদ্রাসার পাঠ্যপুসৃতক প্রণয়নে যুক্ত রয়েছেন। তাদের স্পর্ধা দেখে হতবাক হতে হয়। আবারো একই কান্ড। ছাপার আগে পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্মকর্তারা ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেউ জানেননি মাদ্রাসার পাঠ্য বইয়ে কী ছাপা হচ্ছে- এ ব্যাপারটিও বিস্ময়কর। এসব কর্মকর্তার দায়িত্বহীনতার জবাব কি? কী করে অবাঞ্ছিত বিষয় সংবলিত বইগুলো ছাপা হলো এবং মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেয়া হলো তা খুঁজে বের করে দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও দেখভালে যারা থাকেন তাদের কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা হোক। এ ধরনের অনাকাংক্ষিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি রোধে সব বিভাগ, সর্বস্তরের পাঠ্যপুস্তক উপযুক্ত ব্যক্তিদের দিয়ে প্রণয়ন করানো, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও মুদ্রণ কার্যক্রম যথাযথ পরিমার্জন ও নজরদারির আওতায় আনা খুবই জরুরি।